নগরীতে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক বাড়ছে নারী বিক্রেতার সংখ্যা

রুবেল খান ॥ বিষাক্ত মাদকের সাগরে ভাসছে গোটা মহানগরী। এখানে হাত বাড়ালেই মিলছে মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল এবং হেরইন সহ সব ধরনের মাদক দ্রব্য। বিশেষ করে নগরীর বস্তিগুলোতে মাদকের চরম বিস্তার ঘটেছে। সব দিক ম্যানেজ করে ব্যবসা করায় প্রশাসনের নখদর্পনে আসছে না মাদক ব্যবসায়ীরা। অবশ্য গত বৃহস্পতিবার রাতে গাঁজার বিশাল চালান সহ দুই মাদক স¤্রাজ্ঞিকে আটক করেছে কোতয়ালী পুলিশ।
এদিকে মহানগরীর বিভিন্ন স্পটে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চললেও অনেকটা নিরব ভূমিকায় রয়েছে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর ও প্রশাসন। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযানে নাম মাত্র মাদক সহ চুনা পুটিদের আটক করা হলেও ধরা-ছোয়ার বাইরে থাকছে মূল হোতারা। অভিযোগ উঠেছে প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মোটা অংকের মাসোহারা দিয়েই মহানগরীকে মাদক ব্যবসার অঘোষিত হাটে রূপান্তর করেছে অপরাধীরা।
তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, বরিশাল মহানগরীর চার দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মাদক ব্যবসায়। নগরীতে দুটি প্রবেশ দ্বার থেকে শুরু করে ব্যস্ততম সদর রোড এলাকাতেও পৌছে গেছে মাদক ব্যবসার ভয়াবহতা। মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল এবং ইয়াবা সহ সব ধরনের মাদক দ্রব্যই খুব সহজে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ করে নগরীর নি¤œমুখি মানুষের বসবাস স্থল হিসেবে পরিচিত বস্তিগুলোতে এর ভয়াবহতা চরম আকার ধারন করেছে। কেডিসি বস্তি, স্টেডিয়াম বালুর মাঠ বস্তি, ভাটারখাল ঈদগাহ বস্তি, বরফকল বস্তি, পলাশপুর এবং আমানতগঞ্জের বস্তিগুলোতে মাদক ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। বস্তিগুলোর প্রায় ঘরেই এখন মাদক ব্যবসা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, নগরীর বস্তিগুলোর মধ্যে মাদক ব্যবসার অন্যতম স্পট হিসেবে পরিচিত কেডিসি এবং ভাটারখাল বস্তি। এখানে মাদক ব্যবসার ডন হিসেবে রয়েছে বেশ কয়েকজনের নাম। যাদের মধ্যে নারী মাদক বিক্রেতার সংখ্যাই বেশি। আর মাদক সা¤্রাজ্যের স¤্রাজ্ঞি হিসেবে উপাধীও লাভ করেছেন বেশ কয়েকজন।
এরা হলেন, চিহ্নিত হেরোয়িন ও ইয়াবা স¤্রাজ্ঞি তাসলি ও লাবনী। এ দুজনের মধ্যে তাসলির মাদকের নেটওয়ার্ক শুধু বরিশাল মহানগরীতেই নয় গোটা দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে। তাসলি ইয়াবা, গাঁজা ও ফেন্সিডিলের হোলসেলার বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ সূত্র। শুধু তাই নয়, চরম সংকটের মধ্যেও নগরীতে একমাত্র মাদক বিক্রেতা তাসলি যিনি এখনো হেরোয়িন ব্যবসা জমিয়ে রেখেছে। এসব করে তাসলি এখন নগরীর আর দশজন কোটিপতির মধ্যে একজন।
এদিকে তাসলির পাশাপাশি মাদক সা¤্রাজ্যের অধিপতি হয়েছে লাবনী। তাসলি ও লাবনী পৃথক ভাবে ব্যবসা করলেও তাদের মাদক পাঁচার এবং সরবরাহ সবই চলে এক সাথে। এক সময়ে গাঁজার পোটলা তৈরীকারী লাবনী এখন নিজেই গাঁজা এবং ইয়াবার ডিলার। তার প্রেমিকা জেলা ছাত্রলীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদকের ক্ষমতার দাপটে ম্যানেজ করে রেখেছেন পুলিশ প্রশাসনও।
অপরদিকে তাসলি আর লাবনীই নয়, কেডিসিতে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কেডিসি’র বালুর মাঠের মাদক স¤্রাজ্ঞি শাহানা এবং বিএনপি নেতা কামরুলের স্ত্রী গালকাটা ফরিদা। দীর্ঘ বছর এরা দু’জন মাদকের ব্যবসা করে মাদক স¤্রাজ্ঞিদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। অবশ্য গত বৃহস্পতিবার এই দুই মাদক স¤্রাজ্ঞির ২৫ কেজি গাঁজার চালান আটক করেছে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের এসআই সমীরন মন্ডল। সেই সাথে গ্রেফতার করা হয়েছে মাদক স¤্রাজ্ঞি ফরিদা ও শাহানাকে। এরা দু’জন কারাগারের অভ্যন্তরে থাকলেও থেমে নেই তাদের মাদক ব্যবসা। ফরিদার স্বামী কামরুল এবং শাহানার স্বামী সেকান্দার আলী ও তাদের সহযোগিরা মাদক স্পট জমিয়ে রেখেছে বলে জানিয়েছে এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীরা। এছাড়াও রয়েছে মাদক ব্যবসায়ী শিল্পি। যাকে গতকাল দুপুরে মাদক সহ আটক করেছে পুলিশ। তবে এখনো বহাল তবিয়তে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে রহমান, তার স্ত্রী শিল্পি, গাঁজা (ডাক্তার) আলমগীরের স্ত্রী রওশন আরা।
এলাকার একাধিক সূত্র জানায়, মাদক স¤্রাজ্ঞি তাসলি, লাবনী, ফরিদা এবং শাহানা পুলিশ, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর এবং স্থানীয় কাউন্সিলরদের মাসোহারা দিয়েই মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে ১০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জয়নাল আবেদীন প্রতিজন মাদক বিক্রেতার কাছ থেকে তার ওয়ার্ডে মাদক বিক্রির জন্য ২০ হাজার টাকা করে মাসোহারা নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই সাথে কোতয়ালী থানা, ডিবি এবং মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের জন্য মাসোহারার ব্যবস্থা তো রয়েছেই।
অপরদিকে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, নগরীর অপর বৃহত্তর মাদকের হাট নগরীর ৫নং ওয়ার্ডের পলাশপুর এলাকা। এখানকার স্পটগুলোতে বেশিরভাগ ফেন্সিডিল এবং ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া কাউনিয়ার বিসিকে বেশ কয়েকটি স্পট পরিচালনা করছে বিসিক বাবুল, ভাটিখানা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের ৫০ গজের মধ্যেই রয়েছে ফেন্সিডিলের স্পট। কিন্তু তা নজর কাড়ছে না এই অধিদপ্তরের। এর পাশাপাশি নগরীর ব্রাউন কম্পাউন্ড সড়ক ও সদর রোডের বাটার গলিতে প্রভাবশালী দুই ব্যক্তি ফেন্সিডিলের ব্যবসা করছে।
এছাড়া নগরীর প্রবেশ দ্বার গরিয়ারপাড় ও কালিজিরা ব্রিজের ঝালকাঠি প্রান্তে ফেন্সিডিলের বিশাল আড়ৎ বানিয়ে রেখেছে মাদক ব্যবসায়ীরা। অথচ এসব মাদকের স্পট র‌্যাব, পুলিশ কিংবা ডিবি কারোর নজরেই আসছে না। ফলে মরণ নেশা মাদকের আসক্ত হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে কিশোর ও যুবক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ঘটছে সমাজের অবক্ষয়। তাই এ বিষয়ে প্রশাসনের উচ্চ মহলের নজর দেয়া জরুরী বলে মনে করেন সাধারণ নগরবাসী।