নগরীতে “ফুল” বিক্রির রেকর্ড

সাইদ মেমন ॥ ফুল শুধু বসন্ত ঋতুর গুরুত্ব ও প্রকৃতির সৌন্দর্ষ বাড়ায়নি, নগরীর ব্যবসায়ীদেরকেও টাকায় ভরে দিয়েছে। সৌন্দর্যের প্রতিক “ফুল” আকাশচুম্বি চাহিদা নিয়ে গতকাল শনিবারের ‘বসন্ত উৎসব’ ও বিদ্যার দেবীকে সাজিয়েছে আর আজকের ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ পালনের অপরিহার্য করে নেয়ায় দাম রেকর্ড পর্যায় নিয়ে গেছে। ওই রেকর্ড ফুল করেনি, সৌন্দর্য ও চাহিদায় করেছে নগরীর ব্যবসায়ীরা। দুই দিবসের অপরিহার্য চাহিদা “ফুল” এক দিনেই বিক্রয়মুল্যে ১৫ লাখে নিয়ে গেছে নগরীর ব্যবসায়ীরা। একদিনে লাখ লাখ টাকায় “ফুল” বিক্রি হওয়ার মতো কোন উপলক্ষ্য পূর্বে হয়েছে কিনা, তা কোন ব্যবসায়ীরা স্মরনে আনতে পারেনি। তাই জানাতেও পারেনি। “ফুল” ব্যবসায়ীদের দাবি লাখ লাখ টাকা বিক্রি হলেও তাদের লক্ষ্য পূরন হয়নি !
ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত। সেই মন্ত্রের ধারক তরুন, তরুনী, শিশু কিশোর-কিশোরীরা গতকাল শনিবারের সকাল থেকে ছুটে বেড়িয়েছে ফুল’র সন্ধানে। এছাড়াও বিদ্যার বৃদ্ধি ও ভালো ফলাফল পেতে দেবীকেও তো ফুল দিয়ে তুষ্ঠ করতে হবে। তাই কাংখিত দোকানে গিয়ে খুজে নিয়েছে পছন্দের ফুলটি। “দাম” কত দেবে দোকানীর কাছে জানতে চেয়ে ব্যাগ থেকে টাকা বের করা শুরু করে। দোকানীর হাকা “দাম” শুনে তো ক্রেতা কিছু সময় হলেও থমকে ছিল। এত দাম ! বলেছে সবাই। লজ্জায় পড়ে হোক বা দিবসের চাহিদায় বাধ্য হয়েই হোক সবাই নিয়েছে। কেউ ফেরেনি খালিহাতে বা ফুলহীন অঙ্গে। কারন “ফুল” ছাড়া বসন্ত উৎসব বড়ই বেমানান। আজকে তো প্রিয়জনকে “ফুল” দিতেই হবে। তাই কেউ করেছে মুলামুলি, কেউবা হতাশ হয়েই দোকানীর হাকা দাম দিয়েছে।
দাম একটু বেশিই, ক্রেতাদের সাথে বিক্রেতাদের কোন দ্বিমতও নেই। ক্রেতাদের মুলামুলি, হতাশা বা বেশি দাম দেয়ার কষ্টে আবেগ তাড়িত নন বিক্রেতারা। তাই লাখ লাখ টাকার বিক্রিতেও তাদের মন ভরেনি, তাদের আরো চাই। তা আজকের মধ্যে হতে হবে। কেন ? জবাবে বিক্রেতারা বললেন, এই রকম দুই একটি উৎসবের জন্যই “ফুল” ব্যবসায় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন। সারা বছর তো আর এমন বিক্রি হয় না। বছরে এমন দিনও যায়, কোন “ফুল” বিক্রিও হয় না। দোকানেই নষ্ট হয়। দোকানীরা তো “ফুল” তৈরি করে না। কিংবা আগান-বাগান থেকেও নিয়ে আসেন না। নগরীর আশ-পাশ থেকে তো নয়, ৫/৬ ঘন্টার পথপারি দিয়ে যেতে হয়, আবার আসতে হয়। নগদ অর্থ দিয়েও অপেক্ষায় থাকতে হয়। তারপর মেলে “ফুল”। ১০/১২ ঘন্টার যাত্রার কষ্ট, পরিশ্রম এবং সাথে রয়েছে লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে নেয়া দোকানের ভাড়া, নগর ভবনের বিভিন্ন কর, বিদ্যুত বিল, যোগাযোগের জন্য ব্যয়, এরপর তো দুই তিনজন কর্মচারী, শ্রমিকতে পারিশ্রমিকের অর্থ। আয় হোক না হোক ওইসব ব্যয় হবেই। সেই ফুল বিক্রির অভাবে কত যে ময়লার মধ্যে ফেলে দিতে হয়। সেই সময় তো কেউ এসে খোঁজ নেয় না।
বাড়তি দামের কারন প্রমানসহ তুলে ধরার পর তো কোন জবাব দেয়ার সুযোগ খোঁজা মানে তর্কের বেসাতি। তাই কত দামে বিক্রির পর দোকানীরা তৃপ্ত-অতৃপ্তর বিষটির খোঁজ করাই শ্রেয় ও সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া ভালো জানাল মস্তিস্কের যে অংশ বুদ্ধি বিবেচনা দেয় সেই অংশ।
জানতে চাইলাম বরিশাল ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মুজাহার আলী গাজীর কাছে বিক্রি বাট্টা কেমন চলছে। সদা আমোদে থাকতে বিশ্বাসী বয়সে নবীন, কিছুটা ছাপও পড়েছে, কিন্তু মনে নবীন এই ব্যক্তিটি জানালেন, এত “ফুল” প্রেমীর দেখা আর কখনও মেলেনি। তাই যা হওয়ার সেইটাই হয়েছে, অসংখ্য ফুল দোকান থেকে চলে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে কারো খোপায়, হয়েছে গলার মালা, মাথায় মুকুট, হাতের ব্রেসলেট, হাতে।
প্রথমবারের মতো এত ফুল বিক্রি হয়েছে জানানোর সময় মুখের উজ্জলতার আভাটা কেড়ে নিয়েছে কাটা হয়ে চলমান এসএসসি পরীক্ষা। এই কারনে ছাত্রীরা ঘরে বন্দি। তাই লক্ষ্য পূরনেও সৃষ্টি হয়েছে ঘাটতি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী সমিতির এই নেতা।
বিক্রি বাট্টা যা হয়েছে, তার কারন একই সাথে একদিনে দুই উৎসব ও আজকের দিনের “ভালোবাসা”। দিনে তো ক্রেতারা একসাথে না এলেও সন্ধ্যার পর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল বলে যে চিত্র দেখা গেছে, তার সত্যতাও স্বীকার করেছেন সভাপতি মুজাহার আলী গাজী। তখন বললেন, সন্ধ্যার পর থেকেই ফুল বেশি বিক্রি হয়েছে। আশার পারদ শীর্ষে উঠিয়ে বলেন, আজও ফুলের বিক্রি ভালো থাকবে।
সভাপতির দাবী নগরীতে পেশাদার ৯টি ফুলের দোকান রয়েছে। এই দোকানগুলোতে শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে গতকাল রাত পর্যন্ত দুই লক্ষাধিক টাকার ফুল বেচা বিক্রি হয়েছে বলে দাবী করেছেন তিনি। তবে বাস্তব চিত্র এবং দোকান কর্মচারীদের দেয়া তথ্য বলে দিচ্ছে ভিন্নটা। কর্মচারী এবং ক্রেতাদের ভাস্যমতে কম করে হলেও এক দিনেই ১৫ লাখের উপরে বেচা বিক্রি হয়েছে। অবশ্য ব্যবসায়ীদের টার্গেট ছিলো প্রায় ২৫ লাখ টাকা।
সরেজমিনে দেখাগেছে, বসন্ত বরনকে ঘিরে বাসন্তি, হলুদ গাধা এবং ঝারবালা ফুলের বেচা বিক্রি বেশি ছিলো। এর পাশাপাশি গ্যারোডিলাক্স ফুল দিয়ে তৈরী করা গোল চাক্কিও বিক্রি হয়েছে দেখার মতো। ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এর প্রতিটি চাক্কির মূল্য রাখা হয়েছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া গতকাল প্রতিপিচ গোলাপ বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ২০ টাকায়, গ্যারোডিলাক্স ফুলের স্টিক ১৫ টাকা এবং রজনীগন্ধার ইস্টিক বিক্রি হয়েছে ৫টাকা করে। এছাড়া ভিআইপি মেয়র মুঠ নামে পরিচিত ফুলের তোড়া বিক্রি হয়েছে সর্বনি¤œ ৭শ থেকে ৯শ টাকা পর্যন্ত।
ব্যবসায়ীরা ফুলের এমন মূল্য রাখা হচ্ছে বলে জানালেও বাস্তবে দেখাগেছে ভিন্নটা। বরিশাল সরকারী বিএম কলেজের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তানজিলা জান্নাত তুবা জানান, পূর্বে যে গোলাপটি ১০ টাকায় কিনেছি গতকাল বসন্তের প্রথম দিনে একই ধরনের ফুল কিনতে দিতে হয়েছে একদাম ২৫টাকা। তাছাড়া গাধা ফুলের মালা এবং গ্যারাডিলাক্স ফুল দিয়ে তৈরী করা মাথার চাক্কি কিনেছেন সর্বনি¤œ দেড়শ থেকে ২শত টাকায়। তবে এই মূল্য রাতে অনেকটা কমে যেতে দেখাগেছে। সব মিলিয়ে তিনটি বিশেষ দিনকে ঘিরে বরিশালের ফুল ব্যবসায়ীরা ফুল বিক্রিতে বাজিমাত করেছেন।