নগরীতে কৌশলী পন্থায় চুরি হচ্ছে সরকারি জ্বালানি তেল

জুবায়ের হোসেন নগরীতে নানা কৌশলী পন্থায় প্রতিনিয়ত চুরি হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার লিটার সরকারি জ্বালানি তেল। সরকারি তিন তেলের ডিপোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারিদের সহায়তায় লাইসেন্স ধারী তেল চোরদের মাধ্যমে এই চুরি হচ্ছে। ডিপো থেকে কাগজে কলমে বৈধতা দিয়ে অন্তরালে চলা এই চুরিতে প্রতিনিয়ত সরকারের লাখ লাখ টাকা গচ্ছা গেলেও এতে লাভবান হচ্ছে অসাধুরা। বিষয়গুলো আত্মবিশ্বাসের সাথে খোদ সরকারি ডিপোর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র স্বীকার করলেও তারা বলেছে কাগজে কলমে সঠিক রেখে ডিপোর কর্মকর্তাদের এই চুরি প্রমাণ করতে পারবে না কেউই। আর তাই তাদের সাথে সখ্যতা রেখে চলা জ্বালানী তেল ক্রয়ের যেমন তেমন লাইসেন্স প্রাপ্তরা চক্র তৈরি করে প্রতিনিয়ত করে যাবে সরকারি তেলের চুরির কারবার। অন্যদিকে প্রতি মাসে তিনটি তেলের ডিপোতে জ্বালানী মন্ত্রণালয় এর নিয়োগকৃতরা পর্যবেক্ষনে এলেও তাদের চুরির টাকার ভাগ দিয়ে চলমান থাকবে এই সরকারি তেল চুরির প্রক্রিয়া বলেও জানায় ডিপো সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর তিন তেলের ডিপোতে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি ও তদসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দেয়া বিস্তারিত তথ্যে জানা গেছে, বরিশাল নগরীসহ আশপাশের জ্বালানী তেলের চাহিদা পূরনে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তিনটি তেলের ডিপো রয়েছে। প্রত্যেকটিতে ১৬ লাখ লিটার করে তেল ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন এই তিন তেলের ডিপোর ক্রেতা বা ডিলার হওয়ার জন্য প্রয়োজন জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের বিশেষ লাইসেন্স। তিন ডিপোর মধ্যে পদ্মা এবং মেঘনা ডিজেল, কেরোসিন এবং যমুনা ডিজেল, কেরোসিন ও পেট্রোল বিক্রি করে থাকে। জ্বালানী তেল অকটেন আনা হয় খুলনা থেকে।

নগরীর চাহিদাকৃত তেল বিক্রয়ের সাথে সাথে এই তিন ডিপো থেকে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে প্রয়োজনীয় জ¦ালানী তেল বিক্রি করা হয় নির্দিষ্ট ডিলারের মাধ্যমে। এসকল ডিপোতে বিক্রয়ের তেল সরবরাহ করে থাকে জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্স প্রাপ্ত দেশের বিভিন্ন বড় বড় ডিলার, ক্ষমতাসীন দলের বড় নেতা এমকি মন্ত্রী আমলাদের ঘনিষ্ঠরা। চট্রগ্রাম থেকে জাহাজে আসা এই তেল বিক্রি করা হয় ডিপো থেকে। ডিলাররা ডিপো থেকে ডিজেল ক্রয় করে ৬২.৮১ টাকা, কেরাসিন ক্রয় করে ৬৩.৬১ টাকা এবং পেট্রোল ক্রয় করে ৮২.১৫ টাকা করে।

ক্রয়কৃত তেল ডিপো থেকে বের হয় জাহাজ ও ট্যাংক লরীর মাধ্যমে। ক্রয়কৃত তেলের টাকা ডিলাররা পরিশোধ করে থাকে ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংকে পরিশোধকৃত টাকার জমা রশিদের ডিপোতে দিয়ে সরবরাহ নেয়া হয় তেলের। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ ও স্বচ্ছ মনে হলেও এর অন্তরালে চলে অভিনব পন্থায় চুরি যা ধরা এক রকমের দু:সাধ্য বিষয় বলে জানায় সূত্রগুলো।

এই অভিনব চুরি পদ্ধতির বর্ণনা দিয়ে তারা জানায়, বরিশাল অঞ্চলের সরকারি চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের ব্যবহৃত জ্বালানী তেল এই তিন ডিপো থেকে জাহাজ যোগে যায়। কাজ প্রাপ্ত বা ঐ কাজের জ্বালানী তেল এর সরবরাহের অনুমতি প্রাপ্ত ডিলাররা ব্যাংকে টাকা পরিশোধের পর ডিপোর কর্মকর্তাদের যোগসাজসে করে হাজার লিটার তেল চুরি। প্রক্রিয়াটি এমন যে যার উদাহরন হিসেবে বলা যায়, পায়রা বন্দরে জ্বালানী তেল এর সরবরাহের একটি জাহাজে জ্বালানী মন্ত্রনালয় থেকে ১০ হাজার লিটার তেল এর দাম পরিশোধের চালানের প্রেক্ষিতে তা ডিপো থেকে সরবরাহের নির্দেশনা দেয়া হল। জাহাজ তেল এর সরবরাহ নিতে এসে ডিপো ব্যবস্থাপকদের সাথে মিলে ১০ হাজার লিটার তেল এর স্থানে ৮ হাজার লিটার লোড করে। বাকি ২ হাজার লিটার এর আলোচনা সাপেক্ষে নির্ধারিত মূল্যের একটি অংশ ক্রেতা নিয়ে নেয় এবং বাকি অংশ চলে যায় চুরির মাল হিসেবে ডিপোতে থাকা চোরদের পেটে।

এমন চুরির প্রক্রিয়াগুলো চলে কয়েকদিন সময় নিয়ে। তেল নিতে আসার নির্ধারিত সময়ের আগেই ডিপো জড়িতদের সাথে সব আলোচনা করে ঠিকঠাক করে নেয় ক্রেতারা। চুরি নিখুঁত করতে ডিপোতে তেলের পরিমানটি ঠিক রাখতে আগ থেকেই চোরাই তেলেরও ক্রেতা ঠিক করে রাখে ডিপো সংশ্লিষ্টরা। একই দিনে প্রকৃত তেলের সাথে চোরাই তেলগুলো কিছু অসাধু ডিলারদের মাধ্যমে নগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে বিক্রি করে দেয় তারা। আর চুরির টাকা সমভাগে ভাগ হয়ে যায় চোরদের মধ্যে। এমন চুরি বরিশালের তিন ডিপোতে হরহামেশা চললেও তা অভ্যন্তরে চলে বিধায় এই চুরি ধরা সম্ভব না বলে জানিয়ে সূত্রগুলো আরও জানায়, এই চুরি একমাত্র তখনই প্রকাশ পায় যখন চোরদের মাঝে চুরির টাকা নিয়ে বনিবনা না হয়।

এছাড়া চুরি রোধে প্রতি মাসে তিনটি ডিপোতে জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দল পর্যবেক্ষনে এলেও তাদের হাতে ধরা পরা চুরি ডিপোতেই মিটমাট হয়ে যায়। তেল বিক্রয়ের প্রমানপত্র নিয়ে পর্যবেক্ষনে আসাদের তেল পরিমাপের পর বের হওয়া গরমিলগুলো চাপা পরে তাদরেকে চুরির টাকার অংশিদার বানানোর মাধ্যমে। একইভাবে জলে ও স্থলে চুরির পথে সমস্যা তৈরি করতে পারে এমন সকলকেই ম্যানেজ করা হয় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। আর সরকারি তেল নানা ভাবে বিক্রি হয় তবে তা চুরির কারনে টাকা পৌছায় সরকারের কোষাগারের বদলে তেল চুরি চক্র পরিচালনাকারীদের পকেটে। অন্যদিকে স্থলপথে তেল চুরি হয় ট্যাংক লরি পূর্ন করে নেয়ার আগে ও পরে। এই চুরি করে থাকে ডিপোর সংশ্লিষ্টদের সাথে মিলে ডিলাররা।

ডিপো থেকে স্থল পথে তেল সরবরাহের লরিগুলো ৯, ১২ ও ১৮ হাজার লিটারের ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন। ডিলাররা যখন তেল ক্রয় করে তখন ডিপো থেকে পরিমাপের তুলনায় কম তেল নিয়ে তা বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে ডিলাররা। তেল এর পরিমান কম হলেও ডিপো সংশ্লিষ্টরা চুরির টাকার ভাগ নিয়ে তা যথাযথ করে চালান রশিদ দিয়ে করে চুরি। অনেক সময় পরিমাপের তুলনায় অতিরিক্ত তেল দিয়ে দেয় কোন চালান ছাড়াই। অতিরিক্ত এই তেলগুলো ডিলাররা তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে নামিয়ে বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করে ডিপো সংশ্লিষ্টদের কাছে। ঘটনার উদাহরন হিসেবে গত ৭ আগস্ট এর একটি ঘটনার উদাহরন দেয় তথ্য দাতা সূত্রটি। ঐ দিন বেলা ১২ টায় বান্দরোড হদুয়া জেলারেল স্টোর্সে ট্যাংক লরি থেকে ৩৫০ লিটার ডিজেল তেল নামানোর সময় হাতে নাতে আটক করেন আর্মড পুলিশ এর এসপি আসাদুজ্জামান।

এসময় তেল পাচারের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যমুনা ডিপোর ডিলার গোলাম মোস্তফা লিটন মেসার্স স্বর্ণা এন্টাপ্রাইজ এর যশোর ট-৭৫০ নাম্বারের ট্যাংক লরি ও পাচারে জড়িত রিয়াজ নামের এক ব্যক্তি সহ ৩৫০ লিটার ডিজেল বোঝাই দুটি ব্যারেল আটক করে। পরে কোন এক কারণে আটক তেল, ট্যাংক লরি ও রিয়াজ নামের ঐ ব্যক্তিকে ছেড়ে দেয় হয়। এমনকি আটকের কারণে জবাবদিহি করতে হয় আটক আর্মড পুলিশ ব্যাটিলিয়নের ঐ দলকে। প্রাথমিক অবস্থায় চুরিকৃত ঐ তেলের ব্যাপারে যমুনা ডিপো থেকে কোন প্রমাণপত্র না দেখতে পারলেও আটকের পর তা তাৎক্ষনিক দেখিয়ে ঝামেলা মিট করে ফেলা হয় বলে জানায় সূত্রটি। এমন চুরি মাঝে মধ্যে ধরা পরলেও প্রতিদিন স্থল পথে এমন নানা চুরিতে গায়েব হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার লিটার জ্বালানী তেল।

এছাড়াও টুকটাক ছোটখটো চুরি প্রতিটি ডিপোতে হয়ে থাকে। ট্যাংক লরির চালকদের কিছু চুরি তো রয়েছেই। তাপমাত্রা কম থাকলে জ্বালানী তেল ঠান্ডা থাকে। এসময় তেল ক্রয় করলে তা রোদের তাপে ফুলে ওঠে বা বেড়ে যায় বলে জানায় সূত্রটি। এ ক্ষেত্রে ঐ তেল ক্রয়ের পর সরবরাহের সময় কিছুটা বেড়ে যায়। এটি প্রাকৃতিক কারণেই হয়ে থাকে যার সুবিধা পায় লরির চালকরা। বরিশালের তিন ডিপো থেকে বিশেষ লাইসেন্স প্রাপ্ত ডিলার ব্যাতি তেল বিক্রির বৈধতা না থাকলেও তিনটি ডিপোতেই হরহামেশা সাধারণ বিস্ফোরক দ্রব্যাদি বিক্রয়ের যেমন তেমন লাইসেন্স নিয়ে ব্যারেল এর পর ব্যারেল তেল বিক্রি হয় প্রতিদিন। যা অবৈধ ও এক ধরনের চুরি বলে জানায় সূত্রটি।

যে তেলগুলো খোলা বাজারে মিশ্রনের মাধ্যমে ভেজাল করে খুচরা বিক্রি হয়ে থাকে। এ বিষয়গুলোর সত্যতা একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্বীকার করলেও বিষয়গুলো যাচাইয়ে পদ্মা তেল ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. মারুফ, মেঘনা তেলে ডিপোর ব্যবস্থাপক জালাল আহম্মেদ ও যমুনা তেলে ডিপোর ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমানের সাথে মোবাইল ফোনে আলাপ ও দেখা করার জন্য একাধিক বার ডিপোতে গিয়ে চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে গ্রহণীয় ব্যবস্থার প্রসংগে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জাকির হোসেন এর সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, সরকারি ডিপো থেকে এমন চুরির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেয় হবে। একই সাথে বিষয়টি নিয়ে তারা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন বলেও জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জাকির হোসেন।