নগরীতে কোচিং বানিজ্য বন্ধের নীতিমালা নিষ্ক্রিয়

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ নগরীসহ সকল জেলা উপজেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্য বন্ধের নীতিমালা ফাইলের নিচে চাপা পড়ে গেছে। কোচিং বানিজ্যে জড়িত শিক্ষকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের রক্ষায় দুই বছর পূর্বে শুধু মহানগরী নয়, জেলা ও উপজেলায় পর্যবেক্ষন কমিটি গঠন হয়নি।  এ সুযোগে অধিকাংশ স্কুল কলেজের শিক্ষকগন  তাদের কোচিং বানিজ্য অব্যাহত রেখেছেন।
২০১২ সালের ২০ জুন শিক্ষা মন্ত্রনালয় প্রণীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্য বন্ধ নীতিমালা সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে পাঠিয়ে দেয়।
নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জিম্মি হয়ে পড়েছে।  শিক্ষকরা পাঠদানে মনযোগী না হয়ে কোচিং বানিজ্যে বেশি সময় ব্যয় করে। এতে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা এবং তাদের অভিভাবকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই কারণে সার্বিক পরিস্থিতি ও উচ্চাদালতের নির্দেশণার প্রেক্ষিতে শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্য বন্ধে  নীতিমালা করা হয়েছে।
নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য মহানগরী এলাকায় ১১ সদস্য বিশিষ্ট এবং জেলা ও উপজেলায় ১০ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি পর্যবেক্ষন কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রনালয়।
মহানগরীতে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে (সার্বিক) সভাপতি করে গঠিত কমিটিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা দপ্তরের উপ-পরিচালক সদস্য সচিব হিসেবে থাকবেন। এছাড়া কমিটির অপর নয়জন হলো- জেলা প্রশাসকের মনোনীত একজন, বিভাগীয় কমিশনারের মনোনীত সরকারি ও বেসরকারি কলেজের এবং মাদ্রাসার একজন করে তিনজন অধ্যক্ষ, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের একজন করে দুই প্রধান শিক্ষক এবং তিনজন শিক্ষানুরাগী।
জেলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (সার্বিক/ শিক্ষা ও উন্নয়ন) সভাপতি এবং জেলা শিক্ষা অফিসার সদস্য সচিব থাকবেন। কমিটির অপর ৮ জন হলো-জেলা প্রশাসকের চাহিদা মতো সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের মনোনীত প্রতিনিধি, বেসরকারি মাদ্রাসা ও কলেজের অধ্যক্ষ, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের দুই প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষানুরাগী তিনজন।
উপজেলার ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভাপতি ও সদস্য সচিব উপজেলা শিক্ষা অফিসার। অপর ৮ জন হলেন-উপজেলা প্রশাসকের চাহিদা মতো সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের মনোনীত প্রতিনিধি, বেসরকারি মাদ্রাসা ও কলেজের অধ্যক্ষ দুই জন, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের দুই প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষানুরাগী তিনজন।
জেলার সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও  উন্নয়ন) আবুল কালাম আজাদ বলেন, নীতিমালার পর বিদ্যালয়ের প্রধানদের নিয়ে সভা করে কোচিং বানিজ্য বন্ধে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কোন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোচিং বানিজ্যে জড়িত নয় বলে দাবি করে জানিয়েছেন, প্রতি তিন মাস পর পর কমিটির সভা হয়। কোন শিক্ষক কোচিং বানিজ্যে জড়িত থাকার প্রমান পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে নির্বাহী হাকিম কম থাকায় ভ্রাম্যমান আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তবে অল্প সময়ের মধ্যে ভ্রাম্যমান আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
উপজেলার সভাপতি সদরের নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, শিক্ষকদের কোচিংয়ে সাথে জড়িত থাকার কোন তথ্য নেই। কেউ সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্য বন্ধ করার নীতিমালায় তাদের জন্য বিকল্প পদ্ধতি রাখা হয়েছে। অভিভাবকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ক্লাস শেষে অতিরিক্ত হিসেবে নিতে পারবে। সর্ব নি¤œ ১২ ক্লাসের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি বাবদ মহানগরী এলাকায় ৩০০ টাকা ও জেলা শহরে ২০০ টাকা এবং উপজেলা শহরে ১৫০ টাকা হারে নিতে পারবে। সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে একেকটি ক্লাস নিতে পারবে। তাদের কাছ থেকে ফি বাবদ আদায়কৃত টাকা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের নিয়ন্ত্রনে একটি তহবিলে জমা করতে হবে। সেখান থেকে বিদ্যালয়ে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং সহায়ক কর্মচারীদের ব্যয় বাবদ ১০ ভাগ ব্যবহার করতে হবে। বাকী ৯০ ভাগ অতিরিক্ত হিসেবে ক্লাস নেয়া শিক্ষকদের মাঝে বন্টন করতে হবে।
কিন্তু এই নিয়ম নীতির দোয়াক্কা না করে ও পর্যবেক্ষন কমিটির কার্যক্রম না থাকায় বরিশাল সদর উপজেলার কড়াপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গনিত শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম রিয়াদ, মো. সাইদুল ইসলাম, বিজ্ঞান শিক্ষক মো. মাহমুদুর রহমান ও কম্পিউটার শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন মুন্না জমজমাট কোচিং বানিজ্য করছেন। বিদ্যালয়ের পাশে একটি ভবনে ৫০ শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোচিং পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদউদ্দিন সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, কম্পিউটার শিক্ষক মুন্না অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে ছুটি নিয়েছেন। কিন্তু তিনি নিয়মিত কোচিংয়ে পাঠদান করছেন।
অভিযোগ সম্পর্কে শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম রিয়াদ বলেন, শুধু তো আমরাই কোচিং করাই না। জিলা স্কুলের মধ্যে কোচিং করানো হয়। সেখানে আমার ছেলেও পড়ে। জিলা স্কুলের শিক্ষকরা কোচিং করিয়ে যদি ভুল না করে তবে আমাদেরও কোন ভুল হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
হালিমা খাতুন বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই বিদ্যালয়ে ক্লাসে একাধিক শিক্ষক ১০/১৫ জন ছাত্রীদের নিয়ে ব্যাচ করে কোচিং বানিজ্য করছেন। তার অভিযোগ, কোচিং না করলে শিক্ষার্থীরা বার্ষিক পরীক্ষায় কম নম্বর পাবে এই ভয়ে বাধ্য হয়ে পড়ছে।
নগরীর গোরস্থান রোডের বশির আহমেদ জানান, তার ছেলে উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে পড়ে। ওই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কাছে কোচিং করতে বাধ্য হয়েছে সে। শিক্ষকের কাছে না পড়লে হ্যান্ডনোট থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়েছে দাবি বশির আহম্মেদের।
শুধু হালিমা খাতুন ও উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় নয়, নগরীর সরকারী বালিকা, বরিশাল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, জগদীস স্বারস্বত, মথুরানাথ, অক্সফোর্ড মিশন, ব্যাপটিষ্ট মিশনসহ কম বেশি সকল বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোচিং বানিজ্যে জড়িত।
এই অভিযোগ সম্পর্কে জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, কোচিং বানিজ্য ঘৃনা করি। তাই তার বিদ্যালয়ে কোন শিক্ষককে কোচিং বানিজ্য করতে দেয়া হয় না।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নীতিমালা করে কোচিং বানিজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। এই জন্য সকল বিদ্যালয়ের প্রধানরা দায়ী।
তিনি আরো জানান, নীতিমালা জারির পর নগরীর  আ. সামাদ, রফিকুল ইসলাম, কাদের মোল্লা, রাশিদা পারভীন ও বাবু পরিমলসহ ২০ জন শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছিল। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোন কার্যক্রম না থাকায় নিস্ক্রিয় রয়েছে নীতিমালা ও পর্যবেক্ষক।