নগরীতে অনুমোদনহীন কওমি ও হাফেজী মাদ্রাসায় চলছে শিশু শিক্ষার্থী নির্যাতন

জুবায়ের হোসেন ॥ নগরীর অলি-গলিতে অনুমোদন ছাড়া কওমি ও হাফেজী মাদ্রাসার রমরমা বাণিজ্য চলছে। ধর্ম ও হাদিসকে ব্যবহার করে নানা অনিয়মের মাধ্যমে ওইসব মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে এ অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও ওই সব মাদ্রাসা পরিচালনকারীদের বিরুদ্ধে ধর্ম ও হাদিস সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা দেয়াসহ শিশুদের শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। নগরীর বিভিন্ন ভবনে গড়ে উঠা এসব মাদ্রাসা আবাসিক ও অনাবাসিক ব্যবস্থায় পরিচালিত করেন নামধারী কিছু মাওলানা, ওলামা লীগ নেতা ও ইসলামি বিভিন্ন সংগঠন।
এমনই একটি প্রতিষ্ঠান হলো-নগরীর আলেকান্দা আমতলার মোড় এলাকায় খোরশেদ মঞ্জিলে নূরে মদিনা হিফজুল কোরআন মাদ্রাসা। দুটি মাত্র কক্ষে চলে এ মাদ্রাসার কার্যক্রম। মাদ্রাসায় পড়–য়া ১০ বছর বয়সি ছাত্র আসাদুল ইসলাম পরিচালক হাফেজ মাওলানা মুফতি মনিরুল ইসলামের নির্যাতনে সোমবার পালিয়ে যায়।
সন্তানের উপর নির্যাতনের অভিযোগকারী বাবা মান্না ও মাতা মিনারা বেগম জানায়, ক্ষুদ্র বিষয়ে প্রতিনিয়ত এমন শিশুদের ওপর নির্যাতন করা হয়।
নির্যাতনের অভিযোগে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে সেখানে পাওয়া যায় হাফেজ ইশা ও ফেরদৌস নামের দুই যুবককে। তবে তারা মাদ্রাসার শিক্ষক বলে জানান এবং শিশু নির্যাতনের বিষয়ে জানেন না বলে দাবী করেন তারা। কিছুক্ষণ পর পরিচালক মনিরুল ইসলামকে দেখা যায় শিশু আসাদুল ইসলামকে ধরে আনতে। অতঃপর তার কাছে শিশু নির্যাতনের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন হাদিসেই নাকি বেত প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। তারপর শিশুটি এলাকাবাসীর সম্মুখেই তাকে নির্যাতনের অভিযোগ করে। তৎক্ষনাৎ জনতার তোপের মুখ থেকে বাঁচতে পরিচালক হাত জোড় করে ক্ষমা চান এবং শিশুটির পিতা-মাতাকে অর্থের প্রলোভন দেখান। ওই এলাকায় তার আরো একটি মহিলা মাদ্রাসা রয়েছে যার নাম জামিয়া ইসলামিয়া তা’লীমুল কোরআন মহিলা কওমী মাদ্রাসা। সেখান থেকেও এক মাস পূর্বে এক ছাত্রী নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ঘনিষ্টজন হেলালের সহায়তায় পরিচালক প্রতারণার মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষা বাণিজ্য করছে বলে জানিয়েছে অভিযোগকারী এলাকাবাসী।
এমন মাদ্রাসার বৈধ অনুমোদনের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় নি। তবে মাদ্রাসা পরিচালক মনিরুল ইসলাম জানান, তাদের কোন অনুমোদন নেই। এমন প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেয় বেফাক নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে আবেদন করেছেন। বর্তমানে ছাত্র সংখ্যা কম তাই ছাত্র সংখ্যা বাড়লেই নাকি অনুমোদন মিলবে। আর শিশু নির্যাতনের বিষয়টি তিনি মিমাংসার প্রস্তাব দিয়ে ভুল স্বীকার করেন। নগরীজুড়ে এমন শতাধিক প্রতিষ্ঠানের কোন অনুমোদন নেই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সকল প্রতিষ্ঠান একইভাবে পরিচালিত হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকার আড়ালে নির্মিত ভবনগুলো নির্বাচন করে শুরু হয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম। ঠিক একাডেমিক কোচিং সেন্টারগুলোর মতই চলে এদের নানা মাধ্যমের বিজ্ঞাপন। ওলামালীগ নেতা, বড় সব পীরদের মুরিদ ও বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠনের পরিচয় দেয়া কতিপয় মাওলানারা এসব প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করে। শুধুমাত্র নগর জুড়েই এমন মাদ্রাসা রয়েছে প্রায় শতের কাছাকাছি। আবাসিক ও অনাবাসিক সকল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে তাদের নিয়োগকৃত কিছু প্রতিনিধিরা। বিভিন্ন মসজিদের ঈমাম-মুয়াজ্জিন সহ এই পেশার ব্যক্তিরাই তাদের নিয়োগ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে।
মাদ্রাসাগুলো পরিচালনাকারীরা বেশিরভাগ সময়ই প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের কিছুটা সরিয়ে রেখে শিক্ষক হিসেবে ব্যবহার করে অন্য মাদ্রাসার ছাত্রদের। যাদের পাওয়া যায় খুব সামান্য পারিশ্রমিকে। একই ধরণের মহিলা মাদ্রাসাগুলো পরিচালনা করে পুরুষরাই। শালিনতা রক্ষার দোহাই দেয়া পরিচালকদের নিয়ন্ত্রণে ওই মহিলা মাদ্রাসায় মেয়েদের শিক্ষা দেন পুরুষ শিক্ষকরা। তবে অভিযুক্তদের দাবী সেই শিক্ষা দেয়া হয় পর্দার আড়াল থেকে। কিন্তু পুরুষ শিক্ষকদের নির্যাতনে মাদ্রাসাগুলো থেকে একাধিক ছাত্রী পলায়নের অভিযোগ পাওয়া গেছে।