নগরবাসীর কাছে মেয়র আহসান হাবিব কামাল’র দুঃখ প্রকাশ আজকের মধ্যে কাজে যোগ না দিলে আন্দোলনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে বকেয়া-বেতনের দাবীতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দৈনিক মজুরী ভিত্তিক শ্রমিকদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন নগর কর্তৃপক্ষ। নগরবাসীকে জিম্মি দশা থেকে মুক্তি দেয়ার পাশাপাশি ময়লার ভাগারে পরিনত করা বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকা আজ রোববারের মধ্যে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন মেয়র আহসান হাবিব কামাল। অন্যথায় দৈনিক মজুরী ভিত্তিক পরিচ্ছন্ন কর্মীদের বরখাস্ত করার পাশাপাশি স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহনের হুশিয়ারী দিয়েছেন তিনি। তাছাড়া কাউন্সিলদের মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকায় নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে সোমবারের মধ্যে নগরী পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সহ নাগরিক সেবা নিশ্চিতের ঘোষনাও দিয়েছেন মেয়র আহসান হাবিব কামাল।
গতকাল শনিবার বিকাল ৩টায় নগরীর কালুশাহ্ সড়ক এলাকায় নিজ বাস ভবনে বিসিসি’র বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা জানিয়েছেন মেয়র আহসান হাবিব কামাল। সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিয়ম সভায় মেয়র আহসান হাবিব কামাল অভিযোগ করে বলেন, বিসিসি’র কতিপয় কর্মকর্তা আমার কাছ থেকে অনৈতিকভাবে পদোন্নতির সুবিধা নিতে চেয়েছিলো। এজন্য রাতের আধারে আমি সহ আমাদের কাউন্সিলরদের সাথে গোপনে যোগাযোগও করেছেন তারা। কিন্তু তাদের সেই সুযোগ সুবিধা না দেয়ায় দৈনিক মজুরী ভিত্তিক কর্মচারীদের ভুল বুঝিয়ে নগরবাসীকে জিম্মি করে নগরজীবনে দূর্ভোগের সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি মেয়র এবং কাউন্সিলরদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য আমাদের করদাতা প্রিয় নগরবাসীকে ভোগান্তিতে ফেলে শ্রমিকদের মাধ্যমে ময়লা পরিস্কার বন্ধ করে দেয় অসাধু কর্মকর্তারা। যারা কাজ করতে চায় তাদেরকে সন্ত্রাসী কায়দায় ভয়ভীতি প্রদশন করা হচ্ছে। আমরা জানি, রাষ্ট্রের জরুরী সেবামূহ কখনও ব্যক্তিগত দাবী আদায়ের কাজে ব্যবহার করা যায় না। এটা রাষ্ট্রীয় অন্যায়। সিটি কর্পোরেশন একটি অত্যাবশ্যকীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী জনগনকে জিম্মি করে কোন ধর্মঘট কিংবা আন্দোলন করতে পারবে না। বিসিসি’র শ্রমিক কর্মচারীদের বর্তমান কর্মকান্ডের বিষয়ে নগরবাসীর কাছে বিচারের দায়ভার তুলে দেন মেয়র আহসান হাবিব কামাল।
এছাড়া বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, অসাধু কর্মকর্তারা নিজেদের সার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সাধারন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের খেপিয়ে তুলে অহেতুক আন্দোলন করাচ্ছে। আমরা বেতন দিতে চাইলেও কর্মচারীরা বেতন নিতে চাচ্ছে না। এর কারন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া কর্মচারীদের চাপসৃষ্টি। বিসিসি’র স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৫ মাসের বেতন এবং ৩২ মাসের প্রফিডেন্ড ফান্ডের টাকা বকেয়া পড়েছে। এর মধ্যে ৩ মাসের বেতন এবং ২২ মাসের প্রভিডেন্ট ফান্ড সাবেক মেয়র এর সময়ের বকেয়া ছিলো। তাছাড়া দৈনিক মজুরী ভিত্তিক শ্রমিকদের ২ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। পূর্বের মেয়র এর রেখে যাওয়া বকেয়া বেতন এর দায়ভার বর্তমান সিটি পরিষদ নিবে না বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১ মাসের বকেয়া বেতন এবং ৪টি প্রভিডেন্ট ফান্ড এর টাকা ব্যাংক হিসাব এর মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু তার পরেও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কর্মচারীরা আন্দোলন অব্যাহত রাখে। আজ রোববার তিনি নগর ভবনে ৬ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ থেকে ধার নিয়ে স্থায়ী কর্মচারীদের আরো এক মাসের বেতন এবং দৈনিক মজুরী ভিত্তিক শ্রমিকদের ২ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করবেন। এই টাকা গ্রহনের জন্য আন্দোলনকারীদের আহ্বান জানিয়েছেন মেয়র।
মেয়র বলেন, আন্দোলনকারীরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে শ্রমিকদের বাতিল করে কাউন্সিলররা তাদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে নতুন শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে নগর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করাবেন। তাছাড়া আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে চাকুরী বিধি অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলেও হুশিয়ার করেছেন মেয়র আহসান হাবিব কামাল।
রোববার মেয়র সহ কাউন্সিলর এবং কর্মকর্তারা নগর ভবনে গেলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, এ বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এ অবহিত করা হয়েছে। কোন প্রকার বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।
বিসিসি’র বর্তমান পরিস্থিতি এবং নানান সংকটের কথা তুলে ধরে মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর আমি মেয়র এবং ৪০ জন নির্বাচিত কাউন্সিলর দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকেই নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমরা বর্তমান পরিষদ যখন দায়িত্ব গ্রহন করেছিলাম তখন শুধুমাত্র ঠিকাদারী পাওনাই ছিলো দেড়শ কোটি টাকা। এর বাইরে বিদ্যুৎ বিল সহ নানা খাত সহ প্রায় তিনশ কোটি টাকার মত দেনার বোঝা মাথায় নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয় আমদের।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি বছর সিটি কর্পোরেশনে শুধুমাত্র বেতন বাবদ ব্যয় হচ্ছে ২৭ কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য সকল খরচ বাবদ ব্যয় হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা। তাছাড়া ২০১৬ সালে পে-স্কেল প্রদানের ফলে বেতন প্রায় দ্বিগুন হয়ে যায়। যার ফলে প্রতি বছর শুধুমাত্র বেতন বাবদ সিটি কর্পোরেশনকে ঘাটতি দাড়াচ্ছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। অথচ বিসিসি’র বার্ষিক আয় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। বাকি যে টাকা ঘাটতি থাকছে তা সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প কিংবা সরকারি উন্নয়ন তহবিল থেকে সমন্বয়পূর্বক যতখানি সম্ভব পূরন করা হয়। এমনবস্থায় নগর ভবনে আর্থিক সংকটের স্থায়ী কোন সমাধান নেই।
মেয়র দাবী করে বলেন, বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের তিনটি প্রকল্পের কাজ চলামান রয়েছে। এর পাশাপাশি আরো ৫২০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। গত সপ্তাহে এই কাজ শুরুর কথা থাকলেও আন্দোলনকারীদের কারনে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে। বাধাগ্রস্থ হচ্ছে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও। আমি এবং আমাদের কাউন্সিলরবৃন্দের গত ৩ বছরের প্রচেষ্টায় জার্মানের কেএফডব্লিউ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে। এ প্রকল্পের প্রথম বর্ষে ১৩০ কোটি টাকা হারে ৫ বছর নগরীর উন্নয়ন কাজ করার কথা রয়েছে। কিন্তু সেই মুহুর্তে গুটি কয়েকক উৎশৃঙ্খল কর্মকর্তা-কর্মচারীর ধর্মঘট ও আন্দোলনের ফলে এখন প্রকল্প কর্মকর্তারা পিছিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী আনিসুজ্জামান এই প্রকল্পের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ তিনিই এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। যে কারনে কতিপয় উৎশৃঙ্খল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এমন কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানান সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল।
মতবিনিময় সভায় অন্যান্যদের মাঝে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র ও বর্তমান ২১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আলহাজ্ব আলতাফ মাহমুদ সিকদার, প্যানেল মেয়র-১ আলহাজ্ব কেএম শহীদুল্লাহ শহীদ, প্যানেল মেয়র-২ মোশারেফ আলী খান বাদশা এবং প্যানেল মেয়র-৩ শরিফ তাসলিমা কামাল পলি সহ ৩৫ জন কাউন্সিলর মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, বকেয়া বেতন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দাবীতে বিসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অস্থায়ী শ্রমিকরা গত ২৭ মার্চ থেকে কর্মবিরতি ও লাগাতার বিক্ষোভ করে আসছে। আন্দোলনকারীরা দাবী করছেন, অনিয়ম-দুর্নীতিতে রাজস্ব আয়ের টাকা দিয়ে লুটপাট করে বিসিসিতে আর্থিক সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে বিষয়টি মেয়র সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।