ধুমপান নিয়ন্ত্রন আইন উপেক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বরিশালে মানা হচ্ছেনা ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রন) আইন। সরকারী অফিস, আদালত, থানা এবং হাসপাতাল থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে এই আইন লুন্ঠিত হচ্ছে। পাবলিক প্লেসে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইন বাস্তবায়নে মাঝে মধ্যে অভিযান হলেও দেখা যাচ্ছে না জোরালো পদক্ষেপ। তবে অভিযোগ উঠেছে এই আইন বাস্তাবয়নকারী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাই প্রকাশ্যে আইন লঙ্ঘন করছেন। যে কারনে তামাক বিরোধী কোন অভিযান জোড়ালো হচ্ছে না। এমনকি বেশিরভাগ সরকারী প্রতিষ্ঠানেই নেই ধুমপান ও তামক জাত দ্রব্য ব্যবহার ও বিক্রিতে শাস্তি যোগ্য অপরাধের নোটিশ বা সাইনবোর্ড।
ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সে লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউ.এইচ.ও) ৫৬ তম সম্মেলনে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার জন্য ফ্রেম ওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) নামীয় কনভেনশনে ২০০৩ সালের ১৬ জুন স্বাক্ষর এবং ২০০৪ সালের ১০মে অনুস্বাক্ষর করে বাংলাদেশ।
এফসিটিসিতে সর্বপ্রথম স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম। যার ফলে এফসিটিসির সবগুলো ধারা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক আইনগত বাধ্যবাধকতা সরকারের উপর আরোপিত হয়। এফসিটিসি ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ‘ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ প্রণীত হয়। যা সংশোধিত হয় ২০১৩ সালে।
এদিকে ধুমপান ও তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ, সংশোধন) আইন ২০১৩ এর ২(চ) ধারাতে ২৩টি স্থানকে পাবলিক প্লেস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানগুলো হলো- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারী, আধা-সরকারি, স্বায়ত্ত্বশাসিত, বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট, আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, আদালত, বিমান বন্দর, সমুদ্র বন্দর, নৌবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিাল, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদশর্নী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণী প্রতিষ্ঠান, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণ কর্তৃক সম্মিলিত ভাবে ব্যবহার্য অন্য কোন স্থান অথবা সরকার বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা ঘোষিত অন্য কোন স্থান। ওই আইনে পাবলিক প্লেসে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উন্মুক্ত স্থানে ধুমপান মুক্ত স্থানের সতর্কীকরণ নোটিশ (ধুমপান হইতে বিরত থাকুন, এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ) বা ধুমপানমুক্ত সাইন বোর্ড স্থাপনের নির্দেশ দেয়া আছে। কিন্তু এই নির্দেশনা না মানলেও আইন ভঙ্গ করলে দন্ডনীয় অপরাধ বিবেচ্য করে অর্থ দন্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তির বিধান রয়েছে।
অপরদিকে ২০০৫ সালে প্রথম ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে ধুমপান মুক্ত স্থানে ধুমপানের শাস্তি স্বরুপ ৫০ টাকা জরিমানা করার বিধান রাখা হলেও বর্তমান সংশোধিত আইনে জরিমানার পরিমাণ ৩০০ টাকা করা হয়েছে। প্রথম জরিমানা হওয়া ব্যক্তি দ্বিতীয় অথবা বারবার একই অপরাধ করলে তিনি পর্যায়ক্রমে দ্বিগুন হারে দন্ডিত হবে। আর পাবলিক প্লেসে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি না রাখলে তত্ত্বাবধায়ক বা নিয়ন্ত্রণকারী বা ব্যবস্থাপক আইনের বিধান লংঘন করায় তিনি অনধিক এক হাজার টাকা অর্থ দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং একই কাজ বারবার করলে পর্যায়ক্রমে ওই দন্ডের দ্বিগুন হারে দন্ডনীয় হবেন। অথচ আইনে যেসব স্থানকে পাবলিক প্লেস’ ঘোষণা করা হয়েছে, বরিশালের সেই সব স্থানগুলো দেখলে মনে হবে এগুলো স্মকিং জোন (ধুপমান করার উন্মুক্ত জায়গা)।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত আদালত পাড়া, শেবাচিম ও সদর হাসপাতাল, সিটি কর্পোরেশন, বিভিন্ন ক্লিনিক, বিএম কলেজ, হাতেম আলী কলেজ, মেডিকেল কলেজ, বরিশাল কলেজ সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ ঘাট, শিশু পার্ক, সদর রোডের পাবলিক স্কয়ার, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক সহ বিভিন্ন সরকারী এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ও বাউন্ডরির মধ্যে সিগারেট, বিড়ি, জর্দ্দা, গুল, সাদাপাতা এবং পানের অবৈধ দোকান রয়েছে। এসব অফিস পাড়ায় ধুমপান এবং তামাকজাত দ্রব্যের দোকান থাকায় পাবলিক প্লেসে ধুমপান মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুধুমাত্র বরিশাল নগরীতেই নয়, বিভাগের ৬ জেলা এবং প্রতিটি উপজেলার সরকারী এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের একই চিত্র। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি সরকারী অফিস ছাড়া আর কোথাও ‘পাবলিক প্লেসে ‘ধুমপান হইতে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধ” লেখা নোটিশ নেই। আরো অবাক করার বিষয়, এই ধারাকে বিবেচ্য করে আজ পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের কোন পাবলিক প্লেসের তত্ত্বাবধায়ক বা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি বা ব্যবস্থাপককে অর্থদন্ডে দন্ডিত করা হয়নি। শুধু মাত্র লঞ্চ ঘাট, বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতালের সামনে ও নগরীর ডিসি অফিস চত্ত্বরে ধুমপান বিরোধী অভিযান চালিয়ে কিছু দোকানী এবং ধুমপায়ীদের জরিমানা করতে দেখা গেছে ভ্রাম্যমান আদালতকে। তবে জরিমানা হওয়া ব্যক্তিতের নিয়ে করা হয়নি কোন ফাইল। আর এ কারনে তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে আইন পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া বিভাগের কোথাও ধুমপানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বা ‘স্মোকিং জোন’ না থাকায় আইন লঙ্ঘন করে যত্র-তত্র চলছে ধুমপান। এমনটিই মতামত ব্যক্ত করেছেন সচেতন মহল।