দেড় বছরে ৩ শতাধিক আত্মহত্যা

মো. জিল্লুর রহমান, অতিথি প্রতিবেদক ॥ জেলায় গত ১৫ মাসে প্রায় ৩ শতাধিক নর-নারী ও কিশোর-কিশোরী যুবক নানা কারণে আত্মহত্যা করেছে। এসব আত্মহননকারীদের বেশিরভাগই ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করলেও বিষ বা কীটনাশক পানেও আত্মহননের ঘটনা রয়েছে অনেক। প্রেমে ব্যর্থতা ছাড়াও পরকীয়ায় প্রতারণার শিকারসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই চরম হতাশা থেকেই এসব আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। আর হতাশার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ জায়গা দখল করে আছে সামাজিক অবক্ষয়সহ অভাব-অনটন-জনিত বিষয়গুলোও। বেশ কিছু ক্ষেত্রেই ইভটিজিং-এর কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলেও এর আলাদা কোন পরিসংখ্যান জানা যায়নি। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের তথ্য মতে গত বছর জানুয়ারি-ডিসেম্বর মাসে বরিশাল জেলায় ১৭৯ জন আত্মহননকারী ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এখানের মর্গে। এছাড়া চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখানে আরো ১৬ জন আত্মহননকারীর ময়নাতদন্ত হয়েছে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের মর্গে। এছাড়া জেলার অন্য কয়েকটি উপজেলার থেকে আরো ২৯ জন আত্মহননকারী লাশের ময়নাতদন্তও সম্পন্ন হয়েছে ।
পাশাপাশি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরো ৩৫ জন আত্মহননকারী মৃত্যুর পরে প্রশাসনের অনুমোদন নিয়ে অভিভাবকগণ মৃতদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিয়ে দাফন করেছে। এসব তথ্য ফরেনসিক মেডিসিন ও হাসপাতালের রেকর্ড সূত্রে জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জানুয়ারি মাসে ১১ জন আত্মহননকারীর লাশ ময়নাতদন্ত হয় শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের মর্গে। যাদের মধ্যে ৬ জন গলায় ফাঁস দিয়ে ও ৫ জন নানা ধরনের বিষপানে এ ধরনের জঘন্যতম পথ বেছে নেয়। ফেব্রুয়ারি মাসে ঐ সংখ্যা ছিল ১৫ জন। যার ৯ জন আত্মহত্যা করে গলায় ফাঁস দিয়ে। মার্চে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা ছিল ২১। যার ১৩ জন বিভিন্ন ধরনের বিষপানে আত্মহত্যা করে। এপ্রিলে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা ছিল ১২। ৭ জন ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। মে মাসে বরিশাল আত্মহত্যা করে ২২ জন। যার ১১ জনই ফাঁস দিয়ে এ পথ বেছে নেয়। জুন মাসে ১৫ জন আত্মহননকারীর মধ্যে ৮ জন বিষ পানে আত্মহত্যা করে। জুলাই মাসে আত্মহত্যা করে ৭ জন। যার মধ্যে ৫ জন বিষপানে। আগষ্টে আত্মহননকারী ১৭ জনের মধ্যে ৯ জন ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ১৫ জন। যার ১১ জন বিষপানে আত্মহত্যা করে। অক্টোবরে ১৭ জনের মধ্যে ৯ জন বিষপানে আত্মহত্যা করে। নভেম্বরে ৮ জনের মধ্যে ৭ জনই ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এছাড়া ডিসেম্বর মাসে ১০ জনের মধ্যে ৮ জন ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
এসব আত্মহত্যাকারীদের নিকটজনদের মতে, অভাব-অনটনসহ সংসার জীবনের নানা ঝামেলা থেকে নিস্কৃতি লাভের জন্যও অনেকে সবকিছু থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার জন্য এ জঘন্যতম পথটি বেছে নিয়েছে। তবে বরিশালে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আক্তারুজ্জামান তালুকদারের মতে, আত্মহত্যার পেছেনে মানুষের মস্তিষ্ক অনেকটাই কাজ করে। তখন সে বিষয়টির প্রতি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার চিন্তাধারাকে বাস্তবে পরিণত করতে না পারছে, ততক্ষণ ঐ বিষয়টির প্রতি দুর্বল থাকছে। আত্মহত্যাও অনেকটা একই কারণে ঘটছে বলে তিনি মনে করেন। তবে কোন মানুষ আবেগ তাড়িত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিলেও সে মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। বিশেষ করে যার ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে থাকে, শেষ মুহূর্তে সে বাঁচার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করে বলে জানান ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ডাঃ।
তবে আত্মহত্যার মতো জঘন্য পথ থেকে মানুষকে ফেরানোর জন্য সামাজিক আন্দোলন জোরদার করাসহ সমাজে ন্যায় বিচার ও সুষ্ঠু সামাজিক রীতিনীতি প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই বলেও মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীগণ। সাম্প্রতিককালে ইভটিজিং উদ্বেগজনক বৃদ্ধি পাওয়াসহ অনেক জঘন্যতম সামাজিক অপরাধের ন্যায় বিচার নিশ্চিত না হওয়ার কারণেও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করেন এসব সমাজ বিজ্ঞানীরা। সুশীল সমাজের মতে ফেসবুক ব্যবহারকারী প্রায় ৮ শতাংশ জীবন ঝরে পরে। দুই সন্তানের জননী তাসলিমার সাথে ফেসবুকে তাদের পরিচয় হয় এক এ.এস.পি’র সঙ্গে। বরিশালে চাকরিরত ছিলেন মো. আবুল কালাম আজাদ, তার পর বিয়ে। কয়েক মাস পর যৌতুকের জন্য তাসলিমাকে নির্যাতন করা হতো বলে এ.এস.পি. আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন তাসলিমা। তাসলিমার মামলা পরিচালনা করতে পদে পদে বিপদের মুখোমুখি হয়েছিল। অবশেষে তাসলিমা নিরাপত্তা চেয়ে বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরী করেন। পুলিশ তার সহকর্মী পুলিশের পক্ষপাত আচারণে। কোন প্রকার সুফল না পেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা চেষ্টা করেন তাসলিমা।