দেশে নির্মিত কন্টেইনারবাহী জাহাজ নদীতে ভাসালো খুলনা শিপইয়ার্ড

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ দেশে প্রথমবারের মত নির্মিত দুটি কন্টেইনারবাহী নৌযানই সাফল্যজনকভাবে নদীতে ভাসানো সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর নিয়ন্ত্রনাধীন খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মিত দুটি কন্টেইনার ভ্যসেলের প্রথমটি মাস কয়েক আগেই রূপসা নদীতে ভাসানোর পরে তার চূড়ান্ত পরীক্ষামূলক পরিচালন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহেই দ্বিতীয় কন্টেইনারবাহী নৌযানটিও খুলনা শিপইয়ার্ডের স্লিপওয়ে থেকে রূপসা নদীতে সাফল্যজনকভাবে ভাসানো হল। এ উপলক্ষে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর সহকারী প্রধান রিয়ার এ্যডমিরাল শাহিন ইকবাল-এনইউপি, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি-বিএন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। লাঞ্চিং অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস ইরশাদ আহমদ এনইউপি, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি-বিএন সহ নৌ নির্মান প্রতিষ্ঠনটির জেনারেল ম্যানেজারবৃন্দ সহ উচ্চ পর্যায়ের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাগনও উপস্থিত ছিলেন। এসময় নব নির্মিত নৌযান দুটি সহ খুলনা শিপইয়ার্ড এবং দেশ ও জাতীর কল্যান কামনা করে মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমীনের দরবারে দোয়া মোনাজাতে উপস্থিত সকলে অংশগ্রহন করেন।
বাংলাদেশে নৌ বাহিনীর নৌ ফাউন্ডেশন-এর জন্য নির্মিত এসব কন্টেইনার ভ্যসেলের নির্মান কাজ শুরু হয় ২০১৪-এর সেপ্টেম্বর। প্রায় ৭৮কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ দুটি কন্টেইনারবাহী নৌযান খুব শিঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ ফাউন্ডেশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে শিপউয়ার্ডের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। এধরনের বিশেষায়িত নৌযান বাংলাদেশে প্রথমবারের মত নির্মাণের কৃতিত্ব অর্জন করল খুলনা শিপইয়ার্ড। সিঙ্গাপুরের ‘সী কোয়েস্ট’এর ডিজাইন হাউজ থেকে নকশা প্রনয়ন শেষে ‘জাপানীজ ক্লাসিফিকেসন সোসাইটি-এনকে’র মাধ্যমে অনুমোদন সহ তাদের নিবিড় তত্বাবধানে খুলনা শিপইয়র্ড-এর প্রকৌশলীগন সাফল্যজনকভাবে এ দুটি নৌযানের নির্মান কাজ সম্পন্ন করেন।
প্রায় আড়াইশ ফুট দৈর্ঘের এসব কন্টেইনার জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর থেকে নারায়নগঞ্জের ‘পাঁনগাও ইনল্যান্ড কন্টেইনাল টার্মিনাল’এ একইসাথে কুড়ি ফুট দৈর্ঘ্যরে ১৪০টি করে কন্টেইনার পৌছে দিতে সক্ষম। প্রায় ৪৫ফুট প্রস্থ ও ১৩ফুট গভীরতার এসব নৌযানে ৬শ অশ্বশক্তির ২টি করে মূল ইঞ্জিন ছাড়াও ১২৬কিলোওয়াট ক্ষমতার ২টি করে জেনারেটরও সংযোজন করা হয়েছে। ১০নটিক্যাল মাইল গতিবেগ সম্পন্ন এসব কন্টেইনার জাহাজ দীর্ঘ উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীন নৌপথ পাড়ি দিয়ে মাত্র ১৮ঘন্টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার অদুরে পানগাঁও-এ কন্টেইনারসমূহ পৌছে দেবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
১৯৯৮-এর শেষভাগে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পরে খুলনা শিপইয়ার্ড ইতোমধ্যে ৫টি মধ্যম মানের যুদ্ধ জাহাজ ছাড়াও একাধীক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ৪টি অয়েল ট্যাংকার, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ও নৌ বাহিনীর জন্য ল্যান্ডিং ক্রাফট সহ বিভিন্ন ধরনের বিপুল সংখ্যক নতুন নৌযান তৈরীর কাজ সম্পন্ন করেছে। এছাড়া খুব শিঘ্রই এ প্রতিষ্ঠানটি আরো দুটি অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ কাজেরও সূচনা হতে যাচ্ছে। উপমহাদেশের অন্যতম আধুনিক এ নৌ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে বিআইডব্লিউটিসি’র জন্য দুটি কন্টেইনার জাহাজ ছাড়াও একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আরো ২টি কার্গো কাম কন্টেইনার জাহাজ নির্মাণাধীন। চলতি বছরই বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কন্টেইনার জাহাজ দুটি সরবারহ সম্পন্ন হবে। আগামী বছরের মাঝামাঝি নাগাদ বিআইডব্লিউটিসি’র কন্টেইনার জাহাজ দুটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে তা সরবারহ করার লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিতে দুটি সাবমেরিন টাগ তৈরীর বরাত লাভের বিষয়টিও বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে।
১৯৯৮সালের শেষভাগে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পরে প্রায় পৌনে ২শ কোটি টাকার দায়দেনা ও লোকশান কাটিয়ে খুলনা শিপইয়ার্ড ইতোমধ্যে প্রায় সোয়া ২শ কোটি টাকা নীট মুনফা অর্জনেও সক্ষম হয়েছে। ইতোমধ্যে দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের সেরা করদাতারও গৌরব অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি সেরা দক্ষতা ও দেশের উন্নয়নে ব্যাপক অবদানের স্বীকৃতি হিসবে খুলনা শিপইয়ার্ডকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব কস্ট ম্যনেজমেন্ট-এর ‘আইসিএমএবি বেস্ট পারফরমেন্স এওয়ার্ড’ ও ‘বিজনেস এক্সিলেন্স এওয়ার্ডস সিংগাপুরÑ২০১৪’ প্রদান করা হয়েছে।