দেশের উপকূলীয় রুটের ১৪ সী-ট্রাকের ১০টি বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ দেশের উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে সংগৃহীত ১৪টি সী-ট্রাকের ১০ টিই এখন বন্ধ। এমনকি বরিশালের সাথে লক্ষ্মীপুরের নিরপদ নৌ যোগাযোগের সরকারী একমাত্র সী-ট্রাকটিও বরাবরের মতই ১৬ অক্টোবর থেকে পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক ইজারাদার বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারসাজীর সাথে বিআইডব্লিউটিসি’র কারিগরি ও বাণিজ্য পরিদপ্তরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজসের অভিযোগও রয়েছে। অথচ গত কয়েক মাসে এ সীÑট্রাকের ইজারাদার বরিশালÑলক্ষ্মীপুর রুটে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের অনুমোদিত নকশায় বিআইডব্লিউটি’র সময়সূচী অনুযায়ী চলাচলকারী একটি বেসরকারী নিরাপদ নৌযানের চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে উচ্চ আদালতে ৪ টি রীট পিটিশন দায়ের করে। তবে শেষ পর্যন্ত বেসরকারী ঐ নৌযানটি চলাচলে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে বিআইডব্লিউটিসি’র চেয়ারম্যান বেশীরভাগ সী-ট্রাক বন্ধ থকার বিষয়টি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি এধরনের আরো কয়েকটি নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন।
বিআইডব্লিউটসি’র হাতে স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে ত্রান তৎপড়তায় ব্যবহৃত ‘এসটি গিতালী’ ও ‘এসটি রূপালী’ নামের দুটি সী-ট্রাক থাকার পরে উপকূলীয় নিরাপদ নৌযোগাযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০১ সালে সরকার প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশে তৈরী ৪টি বিআইডব্লিউটিসি’কে হস্তান্তর করে। চীনা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ২০০২ সালে আরো ৪ টি এবং ২০০৯ সালে দেশে আরো ৪টি সী-ট্রাক নির্মাণ করে সংস্থাটিকে হস্তান্তর করা হয়।
বিশ্ব ব্যাংকের সুপারিশে সরকার দেশের উপকূলীয় নৌ যোগোযোগকে ‘গণ দায়বদ্ধ সেবাখাত’ হিসেবে ঘোষণা করে। এ লক্ষ্যে আরো ২টি পুরনো উপকূলীয় যাত্রীবাহী নৌযান পুনর্বাসনে সরকার ২০ কোটি টাকা প্রদান করে সংস্থাটিকে। পাশাপাশি ২০০২ সালে চীনা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ‘এমভি বার আউলীয়া’ নামের আরো একটি নৌযান সংগ্রহ করা হয় বরিশালÑচট্টগ্রাম রুটের জন্য। উপরন্তু উপকূলীয় নৌপথে যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে সরকার প্রতিবছর সংস্থাটিকে নগদ ভর্তূকিও প্রদান করে আসছে।
কিন্তু ২০০৯সালে ২টি নৌযান পুনর্বাসনের পরেও দেশের দীর্ঘতম উপকূলীয় চট্টগ্রামÑবরিশাল রুটে যাত্রী পরিবহন অব্যাহত রাখতে পারেনি সংস্থাটি। এমনকি ২০০২ সালে সংগ্রহ করা ‘এমভি বার আউলীয়া’ নৌযানটি গতবছর প্রায় সাড়ে ৬কোটি টাকা ব্যয়ে পুনর্বাসন শেষে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৌ পরিবহন মন্ত্রী ‘বরিশালÑচট্টগ্রাম রুটে পুনরায় উপকূলীয় যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল শুরু করা হবে বলে ঘোষণা দিলেও তা বছরাধীক কালেও বাস্তবতার মুখ দেখেনি। তবে সংস্থাটির চেয়ারম্যান গতকাল ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, ‘বরিশালÑচট্টগ্রাম উপকূলীয় নৌপথে যাত্রী পরিবহনে সরকার আরো ২টি নতুন নৌযান সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে। আগামী বছর দুয়েকের মধ্যেই এসব নৌযান সংস্থার বহরে যুক্ত হলে চট্টগ্রামÑবরিশাল নৌপথে পুনরায় যাত্রী পরিবহন শুরু হবে’ বলে তিনি জানান।
তবে এসব আশার বাণীর মধ্যেও দেশের উপকূলীয় নৌপথে রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান-বিআইডব্লিউটিসি’র নিরাপদ সী-ট্রাকগুলোর চলাচল এখন আর নির্বিঘœ নেই। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সংস্থাটির ১৪টি সী-ট্রাকের মধ্যে ১০টিই বন্ধ। সংস্থার বহরে থাকা ‘এসটি- মিতালী’ সী-ট্রাকটি ২০০৩ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাঘাটে পড়ে আছে। ‘এসটি রূপালী’ ২০১৩-এর শেষভাগ থেকে সংস্থার ১নম্বর ডকইয়ার্ডে পড়ে আছে। অথচ এ নৌযানটি সন্দ্বীপে উপকূলীয় জাহাজ থেকে যাত্রী ও পণ্য খালাশে ব্যবহৃত হত। ‘এসটি শেখ জামাল’ সী-ট্রাকটি গত ৪ জানুয়ারী থেকে বিকলাবস্থায় সংস্থার ১নম্বর ডকইয়ার্ডে পড়ে আছে। ‘এসটি-শেখ রাসেল’ ২০১২-এর ১৫ নভেম্বর থেকে সংস্থার ২ নম্বর ডকইয়ার্ডে। ‘এসটি-সুকান্ত বাবু’ গত বছরাধীককাল যাবত সংস্থার নারায়নগঞ্জ পোতেঙ্গায় পড়ে আছে। ‘এসটি ভাষা শহিদ সালাম’ গত মধ্য এপ্রিল থেকে ১নম্বর ডকইয়ার্ডে, ‘এসটি- ভাষা শহিদ জব্বার’ গত ১৪ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রামে রয়েছে। তবে এ সী-ট্রাকটি কুমিড়াÑগুপ্তছড়া রুটে যাত্রী পরিবহনে যুক্ত হবার কথা।
চীন থেকে সংগ্রহ করা ‘এসটি খিজির-৫ গত প্রায় দেড় বছর ধরে বরিশালে অচলবস্থায় পড়ে আছে। একই সিরিজের ‘এসটি খিজির-৬’ ২০১২-এর শেষভাগ থেকে সংস্থার ২নম্বর ডকইয়ার্ডে মেরামতের অপেক্ষায় আছে। ‘এসটি খিজির-৭’ নামের সী-ট্রাকটি ইজারাদার এখনো ভোলার ইলিশা থেকে লক্ষ্মীপুর রুটে যাত্রী পরবিহন করছে। ‘এসটি খিজির-৮’ নানা খোড়া যুক্তি দার করিয়ে গত ১৬অক্টোবর বন্ধ করে দিয়েছে এর ইজারাদার। মূলত লাভের মৌসুম এলে ১৫মার্চ থেকে এসব সী-ট্রাক সচল হয়, আর কম লাভের সময় ১৫অক্টোবরের পর তা বন্ধ হয় বলে অভিযোগ এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য।
প্রতিবছরই এ নৌযানটি ১৫মার্চ থেকে উপকূলীয় নৌপথে ঝড়ঝঞ্ঝা মৌসুম শুরু হলে সংস্থাটির বাণিজ্য ও কারিগরি পরিদফতরের সহযোগীতায় সচল হয়ে বরিশালÑলক্ষ্মীপুর রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করে। আর ১৫অক্টোবরের পরে শান্ত মৌসুম এলেই তা আবার বিকল হয়। গত ২২জুলাই ‘মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্ট’ থেকে ‘এসটি খিজির-৮’এর পরিচালনার বিষয়ে ১০দফা পর্যবেক্ষন প্রদান করে ৩ মাসের মধ্যে তা নিরষনের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু এ পর্যবেক্ষনের সময়সীমার মধ্যে সংস্থার বাণিজ্য ও কারিগরি পরিদফতরের বিষয়টি নিয়ে কোন হেলদোল ছিলনা। ইজারাদারের স্বার্থেই নৌযানটি মেরামত ও ত্রুটি সমূহ দূর না করায় গত ১৬ অক্টোবর থেকে পরিচালন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। ১৬অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া শান্ত মৌসুমে বরিশালÑলক্ষ্মীপুর সহ উপকূলীয় নৌপথে বেসরকারী মাঝারী মাপের নৌযানসমূহ চলাচল শুরু হলে ইজারাদারগণ সরকারী সী-ট্রাকের চলাচল বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে বলে যাত্রীদের অভিযোগ।
বিষয়টি বিআইডব্লিউটিসি’র শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বশীল মহল অবগত থাকলেও কোন সুরাহা হচ্ছে না। এমনকি ‘উপকূলীয় নৌপথে যাত্রী পরিবহনে লোকসানের বিষয়টি ধরে নিয়েই সরকার থেকে ভর্তুকি প্রদান করা হলেও কথিত লোকসান এড়াতে তা ইজারা দিয়ে নৌযানগুলোর ক্ষতির পরিমান বৃদ্ধি সহ কতিপয় ইজারাদার পালন করা হচ্ছে’ বলেও অভিযোগ যাত্রী সাধারণের।
বিষয়টি নিয়ে গতকাল বিআইডব্লিউটিসি’র চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে আলাপ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে যাত্রীদের সুবিধার্থে যা কিছু করনীয় তা করবেন বলে জানান।