দুর্নীতি ও অনিয়মে ভরা বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে বসে মাদকের হাট

জুবায়ের হোসেন॥ অবিশ্বাস্য দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রকাশ্য মাদক বিক্রয়ের হাটে পরিণত হয়েছে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার। বিভাগের সর্ববৃহৎ এই কারাগারের অভ্যন্তরে এখন মেলে সব ধরনের মাদকদ্রব্য। হাজারের বেশি কয়েদির এই কারাগারের সংশ্লিষ্টদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সকল অপকর্ম চলছে বলে অভিযোগ করেছে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একাধিক আসামী। কারাগারে চলা নানা দুর্নীতির তালিকা তুলে ধরে তারা পরিবর্তনকে জানায়, দুইজন কারারক্ষীর তত্ত্বাবধানে সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের দ্বারা চলে রমরমা মাদক ব্যবসা। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কারাগারের মধ্যে পাওয়া যায় গাজা, ফেন্সিডিল, ইয়ারা, উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ঘুমের ঔষধসহ নানা মাদক। কারারক্ষী ভোলার বাসিন্দা আবু বকর সিদ্দিক (খোকন) ও সজিবের মাধ্যমে কারাগারে মাদক প্রবেশ করে। তাদের সরবারহ করা মাদক বিক্রি করে ভোলার বাসিন্দা সাজাপ্রাপ্ত আসামী আব্বাস ও গাঙ্গু পলাশ। কারাগারে মাদক বিক্রয় নিয়ে প্রায়ই বিক্রেতাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। গত ৯ মে মাদক বিক্রি করা নিয়ে আব্বাস ও নগরীর চিহ্নিত মাদক স¤্রাট মালেকের সাথে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। তবে ভোলা জেলার বাসিন্দাদের সাথে কেউ পেরে উঠে না। কারন অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখানে কর্মরত কারারক্ষীর ৮০ জন ভোলার বাসিন্দা। তাই তারা শক্তিশালী। তারাই কারা অভ্যন্তরের সব কিছু নিয়ন্ত্রন করে। কারাগারে দুই ধরনের ইয়াবা পাওয়া যায়। এর এক ধরনের ইয়াবা বিক্রি হয় প্রতি পিচ ৪০০ টাকা, অপরটি ৭০০ টাকা, ফেন্সিডিল প্রতি বোতল ১ হাজার ৮০০ টাকা, ২৫ গ্রাম গাঁজা অথবা গাঁজা ভর্তি ১টি সিগারেট বিক্রি হয় ১০০ টাকায় অথবা ১ প্যাকেট সিগারেটের বিনিময়ে। মাদক ক্রয়ের নগদ অর্থ কারাগারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দুর্নীতিবাজ কারা রক্ষিদের মাধ্যমে। ঘুষ দিলেই নগদ টাকা পৌছে যায় অভ্যন্তরে। ৫০০ টাকায় ৫০ টাকা, ১ হাজারে ১০০ টাকা এভাবেই নির্দিষ্ট ঘুষের মাধ্যমে কয়েদিদের হাতে যায় নগদ অর্থ। কারাগারের টয়লেটে বসে সেবন করা হয় মাদক দ্রব্য। সেবনের সময় খোদ রক্ষিরা রক্ষক হয়। মাদকের এই অভিযোগ ছাড়াও রয়েছে আরও একাধিক অভিযোগ। এর মধ্যে অন্যতম কয়েদিদের দেয়া খাবারের নি¤œমান, অভ্যন্তরের ক্যান্টিনের খাদ্য দ্রব্যের উচ্চমূল্য, আমদানি ও ওয়ার্ডের বেডের জন্য টাকা আদায়, কোন কয়েদি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসা না দিয়ে অবহেলায় ফেলে রাখা, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে খাবারের জন্য বরাদ্দ দেয়া টাকা আত্মসাৎ ও জামিনের পরে জেল গেট থেকে গোয়েন্দা পুলিশের মাধ্যমে আটকের ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায়ের মত অভিযোগ গুলো।
অভিযোগের বিষয়ে সূত্রটি আরও জানায়, কারাগারে খাবার খুবই নি¤œমানের। প্রতিদিন দুপুরে অথবা রাতে ১ বেলা ৭০/৮০ গ্রাম মাছ খাওয়ানোর নিয়ম থাকলেও বছরেও তা কয়েদিরা একবারও চোখে দেখে না। সকালের নাস্তা হিসেবে দেয়া হয় বালি মিশ্রিত ময়দার তৈরি লাল রুটি। দুপুরে ও রাতে ভাত দেয়া হয় তাতে থাকে পোকা। অভ্যন্তরের ক্যান্টিনের দ্বিগুন মূল্যে খাদ্য দ্রব্যেসহ পন্য সামগ্রী বিক্রি করা হয়। যে সাবান বাইরে বিক্রি হয় ১৪ টাকা তা কারাগারের ক্যান্টিনে কিনতে হয় ৩৫ টাকায়। নতুন কয়েদি আমদানি হাজতে এলে তাদের কাছ থেকে বেডের জন্য রাখা হয় ৫০০ টাকা করে। কারাগারে অসুস্থ কয়েদিদের চিকিৎসা দেয়া হয়না বললেই চলে। কোন কয়েদি যদি রাতে অসুস্থ হয়ে পড়ে তবে তাকে সেই অবস্থায় রাখা হয় পরদিন দুপুর পর্যন্ত। এ কারনে অনেক কয়েদির বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুও হয়েছে। তবে মৃত্যুর পরে তাদের লোক দেখানোর জন্য এ্যাম্বুলেন্সে করে চিকিৎসা দিতে নেয়া হয় শেবাচিমে।
এক নারীর গর্ভপাত ঘটানোর কিছু পরে তাকে আনা হয় কারাগারে। ওই অবস্থায়ও তার রক্তপাত হচ্ছিল। কিন্তু চিকিৎসার জন্য কোন ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে জেলে রাখা হয়েছিল সারারাত বলে জানিয়েছে অভিযোগকারী সূত্রটি। কারাগারের সাজাপ্রাপ্তরা সারা বছর অপেক্ষা করে বিশেষ দিবস গুলোর জন্য, কারন ওই দিবসে তাদের ভালো খাবার খাওয়ানো হয়। কিন্তু জেলের অসাধু কর্মকর্তারা তাদের কোন ভাল খাবার না খাইয়ে কৌশলে ওই অর্থ আত্মসাৎ করে।
এ বছর পহেলা বৈশাখে কারাগারে পান্তা ইলিশ খাওয়ানোর কথা ছিল। সরকার এজন্য বরাদ্দ দিয়েছিল। কিন্তু কৌশলী জেল কর্তারা কোস্টগার্ডের অভিযানে আটক ইলিশ দিয়েই কাজ সেরেছে আর মেরে দিয়েছে বরাদ্দের টাকা। সূত্রটি সর্বশেষ অভিযোগ করে, জামিনের আসামিদের জেল গেটে জিম্মি করে টাকা আদায়ের বিষয়টির। কোন কয়েদির যদি জামিন হয় তখন বের হওয়ার সময় তাকে ভয় দেখানো হয় যে গেটে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য গোয়েন্দা পুলিশ এনে রাখা হয়েছে। যদি টাকা না দেয়া হয় তবে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এছাড়াও জামিন প্রাপ্ত আসামীদের প্রত্যেকের কাছে জন প্রতি ৫০০-৬০০ টাকা রাখা হয় এই বলে যে টাকা না দিলে আজ মুক্তি পাওয়া সম্ভব না। মুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও একটি দিন। এই কাজটির দায়িত্ব পালন করেন ডেপুটি জেলার (হাজতি) মনির। কারারক্ষিদের অপকর্মের মদদতাও তিনি বলে জানিয়েছে অভিযোগকারি সূত্রটি। তবে তার উপরের কেউ না কেউ অপকর্মের গডফাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও নিশ্চিত করেছে অভিযোগকারীরা। তবে সকল অপরাধ দমনে মাঝে মাঝে তল্লাশী করা হয়। তল্লাশীর সময় উদ্ধারকৃত কোন মালামাল বাইরে আসে না, তা পুনরায় নতুন দামে বিক্রির জন্য চলে যায় কারাগারে। এ বিষয়ে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার বদরুদ্দোজার সাথে কথা বললে তিনি রহস্যজনকভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তার সাথে অফিস সময়ে যোগাযোগের জন্য বলেন।
সাবেক ভারপ্রাপ্ত জেল সুপার হোসনে আরা বেগমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি কারাগারে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য আটক ও দোষিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তবে বর্তমানের যাবতীয় বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।
একই বিষয়ে বর্তমানের সিনিয়র জেল সুপার কামাল হোসেন এর সাথে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।