দুর্ঘটনা কেড়ে নিচ্ছে সৈনিক মনোয়ারের পরিবার একেক জনকে

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ‘মা আমি ভালো আছি, চিন্তা কইরেন না। আমি শীঘ্রই চলে আসব। ’ শনিবার বিকেলেও মাকে এ কথা বলে আশ্বস্থ করেছিল সৈনিক মনোয়ার। এছাড়াও মা’সহ সকলের কাছে দোয়া চেয়েছিল সে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মালিতে সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইজ (আইইডি) বিস্ফোরনে নিহত হয় এই সেনা সদস্য। সৈনিক মনোয়ারের মৃত্যুর খবর এসে পৌছানোর পর থেকে বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। এ মাতম নতুন নয়। এর আগেও এমন ঘটনার শিকার হয়েছে পরিবারটি।
পরিবার সুত্র জানিয়েছে, নিহত মনোয়ারের গ্রামের বাড়ী সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন গ্রামে। তবে নগরীর ২৮ নং ওয়ার্ডের শের-ই-বাংলা সড়কে তৈরী নতুন বাড়িতে বাস করত তার পরিবার। তার বাবা রফিকুল ইসলাম ছিলেন পুলিশ সদস্য। ঢাকার লালবাগ এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন তিনি। ভাই আনোয়ার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সেখানে লেখাপড়ারত অবস্থাতেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তার। এছাড়া তার দুই চাচাও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এর মধ্যে এক চাচা আব্দুল মান্নান বিডিআর সদস্য ছিলেন। সাইকেল চালিয়ে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। অপর চাচা আব্দুল মোতালেব ফরিদপুরে ট্রাফিক পুলিশ’র দায়িত্বে ছিলেন। তিনিও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
বাবা ও বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর সংসারের হাল এসে পড়ে মনোয়ারের উপর। তাই শিক্ষা জীবনের মাঝপথে ২০০৩ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস আজ তাকেও (মনোয়ার) হারাতে হলো পরিবারকে। বর্তমানে পরিবারটি’র হাল এসে পড়েছে মনোয়ারের একমাত্র ছোট ভাই রবিউল ইসলাম’র উপর। তিনি পুলিশের কনষ্টেবল পদে চাকুরী পেয়ে বর্তমানে খুলনায় প্রশিক্ষনে রয়েছেন। তাকে ঘিরেই বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন মা রওশন আরা বেগম। নিহত মনোয়ারের সাত বছর বয়সী কন্যা সন্তান ইলমুন ও দেড় বছরের শিশু পুত্র তাসনিম বাবা হারানোর বেদনা উপলব্ধি করতে পারছে না। কিন্তু তার স্ত্রী ইভা আক্তার শোকে পাথর হয়ে আছেন। স্ত্রী এবং বৃদ্ধা মায়ের স্বজন হারানোর বিলাপে গোটা হরিপাশা এলাকা জুড়ে বইছে শোকের মাতম। শোকার্তদের সান্তনা দেয়ার ভাষা হারিয়েছেন প্রতিবেশিরাও। স্বজনদের এখন একমাত্র চাওয়া যত দ্রুত সম্ভব মনোয়ারের নিথর দেহটি ফিরে পাওয়ার।
নিহত সেনা সদস্য’র মামা আতিকুর রহমান জানান, মনোয়ার খুব অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরেছিলো। এমনকি চাকুরী হওয়ার প্রায় চার থেকে সাড়ে চার বছরের মাথায় অর্থাৎ গত ১০ বছর পূর্বে সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন এলাকার মো. কবির হাওলাদারের মেয়ে ইভা আক্তারকে বিয়ে করে সে। ওই সময় মনোয়ার এবং তার পরিবারের সদস্যরা ওই এলাকাতেই বসবাস করত। পরবর্তীতে নগরীর ২৮নং ওয়ার্ডের চহুতপুর হরিপাশা এলাকায় জমি ক্রয় করে স্ত্রীকে নিয়ে টিনের ঘর তৈরী করে বসবাস শুরু করে। ওই বাড়িতেই স্ত্রীকে রেখে চাকুরীর সুবাদে যশোর ক্যান্টনমেন্টে সৈনিকের চাকুরী করছিলেন মনোয়ার। তাছাড়া বিয়ের পরে তার সংসার আলোকিত করে একটি কন্যা এবং একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহন করে। তাছাড়া বাবা না থাকায় বৃদ্ধা মাকেও তার ওই ঘরে স্ত্রীর সাথে রেখে যান মনোয়ার। ৭ বছর বয়সি ইলমুন স্থানীয় একটি মাদ্রাসা পড়াশুনা করছে।
আতিকুর রহমান আরো জানান, সেনাবাহিনীতে চাকুরীর সুবাধে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার সুযোগ আসে মনোয়ারের। তাই গত রোজার ঈদের পূর্বে অর্থাৎ ৩০ মে (২ রমজান) এক বছরের জন্য আফ্রিকার দেশ মালিতে মিশনে যায় মনোয়ার। সেখানে যাবার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তিনি মা, স্ত্রী এবং সন্তান সহ আত্মিয় স্বজনদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। সর্বশেষ গত শনিবার মা, স্ত্রী এবং বড় মেয়ের সাথে কথা হয়েছিলো মনোয়ারের।
নিহতের স্ত্রী ইভা আক্তার জানান, শনিবার মালি থেকে ফোন করেছিলো মনোয়ার। বাবার সাথে ফোনে কথা বলার সময় আংগুর, আপেল আর আম নিয়ে আসার বায়না ধরেছিলো বড় মেয়ে ইলমুন। ওর বাবা আসবে কিন্তু আংগুর, আপেল, আম নিয়ে নয়, নিথর দেহটি শেষ দর্শনের জন্য বলে কেঁদে ফেলেন স্বামী হারা দুই সন্তানের জননী ইভা।
ইভা জানান, তাদের দেড় বছরের সন্তান তাসনিম শারীরিক ভাবে অসুস্থ। তাই রোববার রাতে লঞ্চ যোগে তাকে নিয়ে সেনা হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার কথা ছিলো। সে অনুযায়ী ওর বাবা সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলো। কিন্তু রোববার বিকালে সেনা সদর দপ্তর থেকে আসা মোবাইল ফোন বার্তায় সব কিছু এলোমেলো করে দিলো। সেনা সদর দপ্তর থেকে জানায় মালিতে দায়িত্ব পালন শেষে ক্যাম্পে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা বোমা বিষ্ফোরনে মনোয়ার মারা গেছে সে।