দুদক’র মামলা ক্যান্সারের মত-দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, দুর্নীতি দমন আমাদের কাজ নয়, আমরা পারি প্রতিরোধ করতে। তাছাড়া বিভিন্ন সরকারী দপ্তরগুলো থেকে আমরা যে অভিযোগগুলো পাই সেগুলো হচ্ছে একটি সারমর্ম, তবে এর বিস্তারিত অনেক। আমরা কাজ করি দুর্নীতি দমনের জন্য। কিন্তু এতে অনেক সমস্যার সামনে পড়তে হয়। আমরা যেটা করতে চাই সেটা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, কোন মামলা করে নয়। আমরা চাই যারা দুর্নীতি করেন, তাদের মধ্যে চেতনাবোধ জাগ্রত করতে। দুর্নীতিতে আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে থাকব তা হওয়ার নয়। এ জন্য চাই দুর্নীতির উৎসগুলো বন্ধ করতে।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে নগরীর জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘দুর্নীতিমুক্ত সরকারি সেবা ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রকৃতি’ বিষয়ক মাঠ পর্যায়ের বিভাগীয় কর্মকর্তাগনের সাথে আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।

এসময় তিনি আরো বলেন, দুদকের দুর্নীতির মামলা হল ক্যান্সারের মত। ক্যান্সার হলে যেমন পরিবারসহ সকলে এক সময় পথে বসে। তেমনই দুদক কারো বিরুদ্ধে মামলা করলে তার অবস্থা একই রকম হয়। এ সময় বিভিন্ন দপ্তরের সরকারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন- একটি পরিবারের পিতা যদি দুর্নীতিগ্রস্থ হয় তাহলে কোনদিনই ঐ পরিবারের অন্য সদস্যরা সৎ বা নিষ্ঠাবান হতে পারে না। তেমনই সরকারী কোন অফিসের প্রধান যদি দুর্নীতিগ্রস্থ হয় তাহলে তার নিচের যত কর্মকর্তা আছে, তারাও ঠিক একই ভাবে দুর্নীতি পরায়ন হবে। তাই দুদক চায়- সরকারী বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা আইন-কানুন, বিধি-বিধান মেনে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করুক। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগও আসবে না এবং মামলাও হবেনা।

সভায় দুদক চেয়ারম্যান আরো বলেন, এখন লুকানোর কিছু নেই। একটা দেশ এভাবে চলতে পারেনা। আমরা দুর্নীতিতে এগিয়ে যাব, এটা হতে পারে না। এজন্য আমরা কাজ করছি। আমার ইতিমধ্যে ৫’শ এর বেশী দুর্নীতিবাজদের আটক করেছি। আমরা দেখেছি ভয় দেখিয়ে, কোন কিছু জয় করা যাবে না। মূলত আমরা নিজেদেরকে নিজেরাই খেয়ে ফেলেছি। গড্ডালিকা প্রবাহে আমরা যেতে চাই না। আমরা রাজনীতিবিদ নই। আমরা জনগনের সেবক। আমাদের সেবা জনগন যাতে সঠিকভাবে পান, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। দুর্নীতি প্রতিরোধে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরো বেশি সচেতন হতে হবে।

তিনি আরো বলেন, প্রায়শই মনে হয় কোন কোন জেলায় দুদকের অফিসই বন্ধ করে দেয়া উচিৎ। কারণ সেখান থেকে অভিযোগ আসে না আমাদের কাছে। আসলে সকল জায়গা থেকেই অভিযোগ আসা কমে গেছে। ছোট, বড় এবং মাঝারি মিলিয়ে দুদক কাজ করছে। আমরা যে অভিযোগগুলো পাই সে প্রেক্ষিতে মামলা হয়। আমরা চাই এ অভিযোগগুলো যাতে আমাদের কাছে আর না আসে।

দুর্নীতির দায়ে আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, রাঘব বোয়ালদের সহজে ধরা সম্ভব নয়। বড় মাছ ধরতে জালও বড় করে পেতে রাখতে হয়। আমরা ছোট গাছ যত সহজে তুলতে পারি, তত সহজে কিন্তু বড় গাছ তুলতে পারিনা। দেখুন সাধারন জনগনের কাছে জেলা প্রশাসকের চাইতে তহশিলদার, এসিল্যান্ডরাই বেশি গুরুত্বপূর্ন। তাই তাদের দুর্নীতি রোধ করাটা আগে প্রয়োজন।

চেয়ারম্যান নিজের দপ্তরের সমালোচনা করে বলেন, দুদকেরই অনেক সমস্যা রয়েছে। এ কথা বলায় আমাকে অনেকেই পছন্দ করেন না। তবে যেটা সত্য সেটাই বলছি। আমাদের ‘না’ বলা শিখতে হবে। আমরা শুধু ‘হ্যাঁ’ বলতে শিখেছি। আর এ জন্যই জনগন আমলাদের পছন্দ করে না।

দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আমার সরকারী কর্মকর্তারা কখনো কি জনগনকে স্যার বলেছি? কিন্তু বিদেশে দেখবেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বাস চালককে স্যার বলে সম্বোধন করেন। তাদের ভিতর জনগনকে সম্মান করার বোধ থাকার ফলে তাদের দেশ এত উন্নত। জনগনকে সম্মান দিলে তারা আপনাদের নিরাপত্তা দিবে। নতুবা বিপদে পড়লে কেউ আপনাদের দেখবে না। ২২ জন পুলিশ দিয়ে আপনার নিরাপত্তা পাওয়া যাবে না। জনগনের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করলে নিরাপত্তা তারাই দিবে। হয় জিতব, নয় ফিরে যাব। মৃত্যুটা সত্য, তাই সকলকে এ কথা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। তাছাড়া আমাদের মধ্যে ফেসবুকসহ অনেক ধরনের কালচার এসেছে। কিন্তু ‘ধন্যবাদ’ কালচারটি এখন পর্যন্ত আসেনি। ধন্যবাদ দিন জনগনকে তবে তা টাকার বিনিময়ে নয়।

চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন- আমরা এখানে যারা আছি আসলে তাদের বদলানো সম্ভব না। কিন্তু ক্লাস ১০ এর এক ছাত্রকে বদলানো সম্ভব। আমার ৬ষ্ঠ শ্রেনী থেকে ১০ম শ্রেনীর ৮৫ লক্ষ স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুনীতি এবং অপরাধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন লেখা সংবলিত খাতা ও জ্যামিতিক বক্স পৌছে দেয়ার কার্যক্রম গ্রহন করেছি। যা ইতিমধ্যে ৫ লক্ষ শিক্ষার্থীদের মাঝে পৌছাতে সক্ষম হয়েছি। যাতে তারা আগে থেকেই দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে জানতে পারে। এছাড়াও বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের ছাতা বিতরণ করা হচ্ছে।

বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুজ্জামানের সভাপতিত্বে সভায় দুর্নীতি প্রতিরোধে করনীয় বিষয়ক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন দুদুকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) ড. মো. শামসুল আরেফিন।

নির্বাহী হাকিম উর্মি ভৌমিক ও আহসান মাহমুদ রাসেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডিআইজি শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, পুলিশ কমিশনার এস এম রুহুল আমিন, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. নুরুল আলম, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম মোস্তফা, জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান, দুদক বরিশালের পরিচালক আক্তার হোসেন, সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান, পুলিশ সুপার এস এম আক্তারুজ্জামান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো জাকির হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আহসান হাবিব, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. আবুল কালাম তালুকদার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনির হোসেন হাওলাদার, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রমজান আলী, দুদকের উপপরিচালক মো. মতিউর রহমান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ওমর আলী শেখ, দৈনিক আজকের পরিবর্তণ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক কাজী মিরাজ, জেলা প্রানিসম্পদ কর্মকর্তা মো. একরামুল করিম চৌধুরি, মৎস অধিদপ্তরের উপপরিচালক বজলুর রশিদ প্রমুখ।