দাদা-দাদীর পাশেই শায়িত হলো মালিতে নিহত সেনা মনোয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে মালিতে সন্ত্রাসীদের পুঁতে রাখা ইম্প্রোভাইজড এক্সপোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বিস্ফোরণে নিহত সেনা সদস্য মনোয়ার হোসেনের লাশ দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গত রোববার সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের পূর্ব চন্দ্রমোহন গ্রামের হাওলাদার বাড়িতে নিজ দাদা-দাদীর পাশেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। এর পূর্বে সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটে ফ্রিজিং এ্যাম্বুলেন্সে মনোয়ার হোসেন’র মৃতদেহ এসে পৌছায়। তার মৃত দেহ নিয়ে চন্দ্রমোহন নিয়ে আসেন ছোট ভাই পুলিশ সদস্য রবিউল ইসলাম। এর আগে রোববার সকাল থেকে চন্দ্রমোহন জৈনপুরির খানকা শরিফের মাঠে অবস্থান করে নিরাপত্তা বলয় তৈরী করে রেখেছিল প্রস্তাবিত বরিশালের লেবুখালীতে নির্মিতব্য শেখ হাসিনা সেনানিবাস’র ৬২ ইস্ট বেঙ্গল’র সেনা সদস্যরা। গ্রামের বাড়িতে পৌছানোর পর মৃতদেহ গ্রহন করেন ৬২ ইস্ট বেঙ্গল’র কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. কর্ণেল নাহিদ ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন’র বাংলাদেশের ব্যান বেড-৪ এর মেজর কায়সার। এর পর জৈনপুরি খানকা শরিফের মাঠে মরহুমের জানাজা নামাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। নামাজের পূর্বে সেনাবাহিনীর ৮ সদস্য’র দল নিহত সৈনিক মনোয়ারের প্রতি স্বশস্ত্র সালাম প্রদর্শন করেন। পরে তার সংক্ষিপ্ত জীবনী পড়ে শোনানো হয়। সন্ধ্যা ৭টায় মরহুম মনোয়ারের জানাজা জানাম অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৬২ এবং ৩২ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট’র সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যরা ছাড়াও গ্রামের শত শত মানুষ অগ্রহন করেন। জানাজা শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মনোয়ারের মৃত দেহ নেয়া হয় নিজ বাড়িতে। সেখানে মা এবং স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে লাশ দাফন সম্পন্ন করেন সেনা সদস্যরা। অনুমতি নিয়ে কবরস্থানের উদ্দেশ্যে নেয়ার সময় বাড়িতে সৃষ্টি হয় হৃদয় বিদারক পরিবেশ। মাত্র দু’মিনিট আগেও বাবার কোলে ওঠার অপেক্ষায় থাকা পাঁচ বছরের শিশু কন্যাটি লাশবাহী কফিন দেখে কানায় ভেঙ্গে পড়ে। শিশু কন্যার বিলাপে সেনা কর্মকর্তারাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
সহযোদ্ধাকে নিজ বাড়ির পাশেই মরহুম দাদা মেনাজ উদ্দিন ও দাদী ফয়জরা বিবি’র কবরের পাশে দাফন সম্পন্ন করে সেনারা। পরে সৈনিক মনোয়ার হোসনকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন করেন ৬২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র লে. কর্নেল নাহিদ, যশোর ক্যান্টেনমেন্ট’র অধিনায়ক মেজর মুনির ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন’র বাংলাদেশের ব্যান বেড-৪ এর মেজর কায়সার। এসময় বিউগলের সুর বাজানো হয়। পাশাপাশি মরনোত্তর স্বশস্ত্র সালাম এবং চারবার তোপধ্বনি দেয়া হয়। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিহত মনোয়ারের মায়ের হাতে তুলে দেয়া হয় বাংলাদেশ, সেনাবাহিনী ও জাতিসংঘের পৃথক তিনটি পতাকা, তিনটি চিঠি এবং দুটি সম্মাননা মেডেল। এছাড়া দাফন-কাফনের জন্য আর্থিক সহায়তা।
লেবুখালী প্রস্তাবিত শেখ হাসিনা ক্যান্টেনমেন্ট’র অধিনায়ক লে. কর্ণেল নাহিদ বলেন, ২০০৩ সালে মনোয়ার হোসেন সেনাবাহিনীতে চাকুরী নিয়ে যশোর ক্যান্টেনমেন্টে যোগদান করেন। সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট থেকে গত রমজানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে আফ্রিকার মালিতে অংশ নেন। ২২ সেপ্টেম্বর সেখানে বিদ্রোহীদের সাথে গোলাগুলি হয়। এরপর ক্যাম্পে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের পুঁতে রাখা ইম্প্রোভাইজড এক্সপোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বিস্ফোরণে গাড়িতে থাকা ৭ জনের মধ্যে ৪ জন আহত ও নিহত হন ৩ জন। এদের মধ্যে মনোয়রার হোসেন একজন।
তিনি বলেন, গত শনিবার মনোয়ারের মৃত দেহ ঢাকায় এসে পৌছায়। সেখান থেকে যশোর ক্যান্টেনমেন্ট’র অধিনায়ক ও অন্যান্য কর্মকর্তারা মৃতদেহ গ্রহন করেন। রোববার সকাল ৯টার পরে মৃত দেহ নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন তারা। সর্বশেষ সন্ধ্যায় বরিশালে নিজ বাড়িতে লাশ নিয়ে আসা হয়েছে।
মনোয়ার হোসেন ৩২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যশোর ক্যাম্পের সৈনিক। তাই মৃত্যু পরবর্তী সকল আনুষ্ঠানিকতা ওই ক্যাম্পের কর্মকর্তারাই করেন। তবে মনোয়ারের দাফন-কাফন’র দায়িত্ব আমাদের ৬২ ইস্ট বেঙ্গল সেনাদের দেয়া হয়। এজন্য লাশ গ্রহন থেকে দাফন পর্যন্ত সকল কার্যক্রম তারা সম্পন্ন করেছেন বলে লে. কর্নেল নাহিদ জানিয়েছেন।
এদিকে মনোয়ার হোসেনের মা রওশন আরা বেগম বলেন, তার বড় ছেলে আনোয়ার হোসেন ২০০০ সালে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পরীক্ষা দেয়ার জন্য বাবার কাছে ফরম পূরনের টাকা আনতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। তার স্বামী ২০০৩ সালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পুলিশ ফাঁড়িতে ডিউটিরত অবস্থায় আগারগাঁ বস্তিতে দুই গ্রুপ সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এরপর মেঝো ছেলে মনোয়ার হোসেনের মৃত্যু পরিবারটির সকল স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়েছে। এর পূর্বেও মনোয়ারের দুই পুলিশ সদস্য চাচা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।
স্ত্রী ইভা আক্তার বললেন, ঘটনার আগে ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলেও তার স্বামীর সাথে শেষ কথা হয়েছিলো। ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে কথা বলবে জানিয়েছিল। এরপর শনিবার বিকেলে সেনা সদর দপ্তর থেকে তার কাছে ফোন করে মনোয়ার হোসেনের ভাই ও বোনের মোবাইল নম্বর চায়। তখনই তার মনে সন্দেহ হয়। এর কিছুক্ষন পরে স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছেন।
একমাত্র বোন জোহরা বেগম বলছেন, বড় ভাই, বাবা এরপর মেঝো ভাই মারা গেল। কারোর সেবা করার সুযোগ পাইনি। এখন ছোট ভাই আর আমি রয়েছি। বিলাপ করছেন স্বজন ও এলাকাবাসীও। হাসোজ্জ্বল ও বিনয়ী ছিলেন মনোয়ার হোসেন। এই মৃত্যু তারা মেনে নিতে পারছেন না।