দর পতনে বোরোর আবাদ হ্রাসের পাশাপাশি ভাল

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ সারা দেশের সাথে দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে এখন বোরো ধান কর্তনের সাথে পাটের আবাদ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষি যোদ্ধাগণ। ইতোমধ্যে সারা দেশে প্রায় ৭৫ ভাগ বোরো ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। পাটের আবাদ শেষ হয়েছে ৯৫%। এ তথ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। আগামী ১৫মে পর্যন্ত পাটের আবাদ চলবে বলে আশা করছে অধিদপ্তরটি। সে হিসেবে চলতি মৌসুমে সারা দেশে ৭ল াখ কুড়ি হাজার হেক্টরে পাট আবাদের লক্ষ্য অর্জনে আশাবাদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল মহল। এলক্ষ্য মাত্রা অর্জন সম্ভব হলে চলতি বছর দেশে ৮৪ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে দেশ।
অপরদিকে ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে সারা দেশে। ফলনও কিছুটা আশাব্যঞ্জক বলে জানা গেছে। যদিও গত বছরের তুলনায় এবার সারা দেশেই বোরো ধানের আবাদ কমেছে লক্ষাধীক হেক্টর জমিতে। অপরদিকে সিলেট অঞ্চলে সম্প্রতিক আকষ্মিক বন্যায় বেশ কিছু বোরো ধান পানির তলায় চলে গেছে। যশোর অঞ্চলেও বৃষ্টির অভাবে বেশ কিছু জমির বোরো ধানের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর পরেও সারা দেশে উফশী বোরো ধানের গড় ফলন ৪টন থেকে ৪.১২ টনের মত বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধধিদপ্তর। আর হাউব্রিডে এ ফলন ৪.৯০ টন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে। সদ্য বিদায়ী রবি মৌসুমে সারা দেশে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে আবাদের মাধ্যমে এক কোটি ৯০লাখ টন চাল পাবার লক্ষ্য স্থির করেছিল কৃষি মন্ত্রনণালয়। কিন্তু ধানের দর পতনে কৃষক বোরো ধানের উৎপাদন ব্যয় তুলতে পারছে না। ফলে গত দু বছর ধরে বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে দেশে বোরো ধান আবাদের পরিমান ৪৬ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টরের মত। যা মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর কম। ফলে বোরো ধান থেকে দেশে চালের উৎপাদন প্রায় ৫লাক্ষাধীক টন কম হবে বলে মনে করছেন কৃষিবীদগণ। তবে বোরো ধানের এ ঘাটতিও দেশে চাহিদার তুলনায় চালের কোন ঘাটতি সৃষ্টি করবে না বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল মহল।
এবার পুরো এপ্রিল জুড়ে লাগাতার খড়ার সাথে মাঝারী থেকে তীব্র তাপ প্রবাহে দক্ষিণাঞ্চলের ১১টি জেলা সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় উঠতি বোরো ধানের ফলন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। অনুরূপভাবে এ খড়ার কারণেই সারা দেশেই আবাদকৃত পাট গাছের বৃদ্ধিও যথেষ্ট ব্যাহত হয়। তবে গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত পাটের চারা বৃদ্ধির পাশাপাশি এর ফলনের জন্যও যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। পাটের জমিতে আপাতত আর কোন সেচ প্রদানের প্রয়োজন পড়ছে না। ফলে প্রতি বিঘা জমিতে সেচ ব্যয় বাবদ কৃষকের সাশ্রয় হচ্ছে অন্তত হাজার টাকা। এমনকি ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলের অনেক জমির আসেপাশেই উৎসগুলো পর্যন্ত পানি শূন্য হয়ে পড়ায় অর্থ ব্যয় করেও সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। গত শনিবারও ফরিদপুর অঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টিপাতে পাট সহ মাঠে থাকা সব ধরনের ফসলের জন্য যথেষ্ট উপকারী হয়েছে।
সদ্য বিদায়ী রবি মৌসুমে বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের ১১টি জেলায়ও সারা দেশের মত বোরো ধান আবাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। দক্ষিণাঞ্চলে ৩ লাখ ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে স্থানীয়, উফশী ও হাইব্রীড জাতের বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রকৃত আবাদ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর কম, ২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে। ফলে বোরো থেকে প্রায় ১৩ লাখটন চাল প্রাপ্তির লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন দায়িত্বশীল মহল।
অপরদিকে চলতি মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের ১১টি জেলায় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রায় ২লাখ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ২ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ সম্পন্ন করেছে কৃষকগণ। এবার সারা দেশে ৭.২০ লাখ হেক্টর জমিতে ৮৪ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
পলিথিনের ব্যাগ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পাটের ব্যাগ ব্যবহারে সরকারি অবস্থান কিছুটা কঠোর হওয়ায় বিগত কয়েকটি বছরের তুলনায় এবার পাটের ভাল দাম পাবার আশা করছেন সারা দেশের কৃষকগণ। ফলে আগামীতে পাটের আবাদ আরো বৃদ্ধির আশা করছেন কৃষিবিদগণও। তবে এলক্ষ্যে আরো কঠোর প্রশাসনিক ও আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ সহ পাটের বহুমুখি ব্যবহারে সরকারি-বেসররকারি খাতকে সচেষ্ট হবারও তাগিদ দিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদগণ।
গত বছর সারা দেশে ৮৪ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যে ৭ লাখ ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি মন্ত্রণালয়। তবে দেশের কৃষি যোদ্ধাগণ সে লক্ষ্য অতিক্রম করে প্রায় ৭.২০ লাখ হেক্টর জমিতে দেশী, তোষা ও কেনাফ জাতীয় পাটের আবাদ সম্পন্ন করে। এরমধ্যে বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলের ১১টি জেলায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২ লাখ ১২ হাজার ১১০ হেক্টরে পাটের আবাদ সম্পন্ন করে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলে গত বছর ২০ লাখ ৭৪ হাজার বেল পাট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়। তবে গত বছরও মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির অভাবে দক্ষিণাঞ্চলে পাটের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়। পাশাপাশি পাটের ভাল দাম না পেয়ে বেশীরভাগ কৃষকই উৎপাদন ব্যয় তুলতে পারেন নি। চলতি মৌসুমে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে খুশি সারা দেশের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকগনও।
কিন্তু বোরো সহ সব ধানের দর পতনে দুশ্চিন্তা আর ক্ষোভ রয়েছে সারা দেশের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যেও। ফলে সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে সারা দেশেই বোরো ধানের আবাদ কমেছে লক্ষাধীক হেক্টর জমিতে।