দরপত্র বিক্রি বন্ধ রাখতে নগর ভবন দখল !

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ নগরীর তিন প্রবেশ পথের পণ্যবাহী যানবাহন থেকে টোল আদায়ের ইজারা বাগিয়ে নিতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজ নেতা-কর্মিরা দরপত্র বিক্রি করতে দেয়নি। গতকাল সোমবার দরপত্র বিক্রির শেষ দিনে টেন্ডারবাজ নেতা-কর্মিরা এই জন্য নগর ভবনে ত্রাস সৃষ্টি করে। দরপত্র বিক্রি বন্ধ রাখতে তারা নগর ভবনের হাটবাজার শাখার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দিয়ে টেন্ডার কক্ষ দখলে নেয়। এমনকি আতংক সৃষ্টি করতে ওই শাখার কর্মকর্তা কর্মচারীদের হুমকি দিয়ে বের করে দেয়। এ সময় নিজেদের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনলেও ভয়ে দরপত্র বিক্রির শেষ সময় বিকাল ৫টা পর্যন্ত হাট বাজার শাখার কর্মকর্তারা আত্মগোপনে ছিলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সোমবার নগরীর গরিয়ারপাড়, কালিজিরা ও রূপাতলী শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতু সংলগ্নে সিটি টোলের ইজারা দরপত্র বিক্রির শেষ দিন ছিলো। নগর ভবনের হাট বাজার শাখা, মহানগর পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক কার্যালয়সহ ৪ সরকারী দপ্তর থেকে দরপত্র বিক্রি করা হয়। ইজারা গুছ প্রক্রিয়ায় বাগিয়ে নিতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়াও মূল দলের ওয়ার্ডের নেতারা তৎপরতা শুরু করে।
ধারাবাহিকতায় শেষদিনে ছাত্রলীগের জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হান্নান বাপ্পির নেতৃত্বে টেন্ডারবাজ নেতা-কর্মিরা নগর ভবনের তৃতীয় তলায় হাট বাজার শাখায় অবস্থান নেয়। তারা সেখান থেকে ৬টি দরপত্র ক্রয় করে। পরে দরপত্র ক্রয়ের জন্য কেউ গেলেও তাদের বাধা দেয়া শুরু করে। যার ফলে সাধারন ঠিকাদাররা ইজারা দরপত্র ক্রয় করতে পারেনি।
এদিকে দুপুর ১টার দিকে বরিশাল সরকারী ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় (বিএম) কলেজ কর্ম পরিষদের সহ-সভাপতি মঈন তুষার, সাধারন সম্পাদক নাহিদ সেরনিয়াবাত ও ২৬ নং ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি হুমায়ুন কবির’র নেতৃত্বে ছাত্রলীগ কর্মিরা দরপত্র ক্রয়ের জন্য নগর ভবনের হাট বাজার শাখায় যান।
এসময় জেলা ছাত্রলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক বাপ্পি ও তার ক্যাডার বাহিনী এবং ২৫ নং ওয়ার্ড আ’লীগের সাধারন সম্পাদক বিদ্যুৎ কর্মকার পিংকু সহ তাদের টেন্ডারবাজরা তুষার, নাহিদ ও হুমায়ুন কবিরের কাছে দরপত্র বিক্রিতে বাধা দেয়।
এজন্য ক্ষিপ্ত হয়ে তারা হাট বাজার শাখার কম্পিউটারের তার ছিড়ে ফেলে। এমনকি দরপত্র বিক্রি না করায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নামাজে যাওয়ার কথা বললেও তাদের কক্ষের মধ্যে আটকে রাখে তুষার, নাহিদ ও কবির চেয়ারম্যান বাহিনী।
এসময় জেলা ছাত্রলীগের বাপ্পি, মনির মোল্লা ও বিদ্যুৎ কর্মকার পিংকুসহ তাদের লোকজন বাজার শাখায় গেলে তাদের মধ্যে টানা হেচড়া ও সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায় তুষার, নাহিদ ও কবির বাহিনীকে নগর ভবন থেকে বের করে দেয়া হয়।
দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও পাল্টা ধাওয়া হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আতংকে অফিস থেকে পালিয়ে যায়। সেই সুযোগে শাখার তত্ত্বাবধায়ক নুরুল ইসলামকে নগর ভবন থেকে অজ্ঞাত স্থানে ধরে নিয়ে আটকে রাখে বাপ্পি ও ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের টেন্ডারবাজ বাহিনী।
খবর পেয়ে মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতয়ালী) কাজী আব্দুল কাউয়ুম ও মডেল থানার ওসি শাখাওয়াত হোসেনসহ পুলিশের দল ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। তবে হাট বাজার শাখার কাউকে খুঁজে পাননি তারা। বিকাল ৫টা পর্যন্ত দরপত্র বিক্রির শেষ সময় থাকলেও হাট বাজার শাখার প্রধান ফটক ছিলো তালাবদ্ধ। সামনের শাখায় দু-একজন কর্মচারীকে দেখা গেলেও তত্ত্বাবধায়ক এবং পরিদর্শক দু’জনই ছিলো নিরুদ্দেশ।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, বিসিসি সহ অন্যান্য সরকারী দপ্তর থেকে যে দরপত্র বিক্রি হয় সেগুলোও জেলা ছাত্রলীগের বাপ্পি বাহিনী ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা কিনে নিয়েছে।
জানতে চাওয়া হলে বিসিসি’র হাট বাজার শাখার তত্ত্বাবধায়ক নূর ইসলাম পরিবর্তনকে জানান, দরপত্র বিক্রি নিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে উত্তেজনা, হাতাহাতি ও সংঘর্ষ হয়। এসময় আতংকে তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আত্মরক্ষায় নগর ভবন থেকে পালিয়ে যান। যার ফলে পরবর্তীতে তিনি আর নগর ভবনে ফেরেননি। তবে তাদের আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেন হাট বাজার শাখার এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আজ দরপত্র গ্রহন করা হবে।
ওসি শাখাওয়াত হোসেন জানান, দরপত্র বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে নগর ভবনে ছাত্রলীগের মধ্যে একটু ঝামেলা হয়েছিলো। কিন্তু বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার পূর্বেই তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন। উল্লেখ্য নগরীর কোথাও টেন্ডার আহবান করা হলেই সবার আগে ছাত্রলীগের কিছু চিহ্নিত নেতাকর্মী টেন্ডার বাগিয়ে নিতে তৎপরতা শুরু করে। বিশেষ করে নিজেরা টেন্ডারে অংশ না নিলেও কারো পক্ষ হয়ে কাজ বাগিয়ে নিতে তৎপরতা চালায়। গত ১মাসে ছাত্রলীগ এলজিইডি, ফেসিলিটিস্ দপ্তরসহ বেশ কয়েকটি অফিসে মারামারিতে লিপ্ত হয়েছে। যার কারনে র‌্যাব বেশ কয়েকজনকে আটকও করেছিল। তবে মুচলেকা দিয়ে তারা ছাড়া পেলেও পুনরায় তাদের অপতৎপরতা বহাল রেছেছে। উল্লেখ্য, নগরীর বেশির ভাগ সাধারন ঠিকাদার ছাত্রলীগের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে টেন্ডারে অংশ গ্রহন করছেন না।