‘দরদী নাইয়া রে তুমি কি টুঙ্গিপাড়ায় যাও…?

পুলক চ্যাটার্জি, অতিথি প্রতিবেদক ॥ “একাত্তরের ৭ মার্চে সাড়ে ১৮ মিনিটের মহাকাব্যে বঙ্গবন্ধু বাঙালীকে যে জাগরনে জাগিয়ে ছিলেন, তার স্রোতধারায় একদিন গিয়ে পৌঁছি কোলকাতার বালিগঞ্জে। তারপর শুরু করি মুক্তির জন্য গান। ৩০ লক্ষ প্রাণ আর দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পাই স্বাধীনতা-লাল সবুজ পতাকা। রক্তে কেনা আমাদের স্বাধীনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তিনটি পবিত্র বাংলা শব্দ। ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘বাংলাদেশ’ কথাগুলো বলেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সুরসৈনিক মনোরঞ্জন ঘোষাল।
রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, সাংবাদিক মনোরঞ্জন ঘোষালের মুখে আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিলাম মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার স্মৃতিচারণ। তারপর তিনি গাইলেন, ‘ ও দরদী নাইয়া রে, তুমি কি টুঙ্গিপাড়ায় যাও……….? ‘আমরা হারবো না হারবো না……… তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’।
মনোরঞ্জন ঘোষাল। মহান মুক্তিযুদ্ধে সহদোর দুই ভাইকে হারিয়েছেন। নিজেও মৃত্যুর দুয়ার থেকে কখনও নদী সাঁতরিয়ে আবার কখনও মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে একাত্তরের ২২এপ্রিল কোলকাতায় গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। মহান এ সঙ্গীত যোদ্ধাকে শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে বরিশাল জেলা প্রশাসন আয়োজন করে ‘স্বাধীনতা-বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীন বাংলা বেতার’ শীর্ষক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। জেলা প্রশাসক কবি মোঃ শহীদুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ সহ নগরীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও সাংবাদিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহন করেন।
বীরযোদ্ধা মনোরঞ্জন ঘোষাল তার সম্মানে জেলা প্রশাসনের এ আয়োজনে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমরা সবাই মিলে দেশটাকে এগিয়ে নিতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল দুর্নীতিমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। তিনি বলেন আমরা যেমন পুরোপুরি দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করতে পারিনি, তেমনি সাম্প্রদায়িকতার বিষ দূর হয়নি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ থেকে। ঘাপটি মেরে থাকা একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা আবার একাত্ম হয়ে মাঝে মাঝে ফনা তোলে। ওদের বিরুদ্ধে আমাদের সব ভেদাভেদ ভুলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারন করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বাঙালী জাতির গর্ব মনোরঞ্জন ঘোষাল আহবান জানান, রাজাকার পরিবারের সঙ্গে যেন কেউ আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ না হন। আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিনকে সরকারিভাবে ‘আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি দিবস’ ঘোষণার দাবী জানিয়ে তিনি বলেন, একদিন তাহলে অবশ্যই সারা বিশ্ব অসাম্প্রদায়িকতার অনন্য প্রতীক কবি নজরুলের জন্মদিনকে ঐ স্বীকৃতি দেবে। তারপর আবার মহান শিল্পী গাইলেন মুক্তিযুদ্ধের গান ‘সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করলো কে? রাজাকার তোমায় আসামীর মতো জবাব দিতে হবে’। এরপর সঙ্গীত পরিবেশন করেন, বরিশালের প্রথিত যশা শিল্পী কবি জীবনানন্দ দাশ ও শহীদ আলতাফ মাহমুদ স্মৃতি পদক প্রাপ্ত সংস্কৃতজন মুকুল দাস ,মুক্তিযোদ্ধা এবং গণসঙ্গীত শিল্পী আক্কাস হোসেন, সংস্কৃজন বিশ্বনাথ দাস মুুন্সি, জেলা প্রশাসক কবি শহীদুল আলমের লেখা গান গেয়ে শোনান উদীয়মান শিল্পী জহিরুল হক সোহেল। কবিতা আবৃত্তি করেন সাংবাদিক মুরাদ আহম্মেদ ও কাজল ঘোষ। মুক্তিযুদ্ধের নাটক ‘বিবিসাব’ এর কিছু অংশ অভিনয় করেন শিক্ষিকা পাপীয়া জেসমিন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি জেলা প্রশাসক মোঃ শহীদুল আলম মুক্তিযোদ্ধা ও সুরসৈনিক মনোরঞ্জন ঘোষালের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, আমরা জাতির বীর সন্তানদের আদর্শকে ধারন করে দেশকে সমৃদ্ধ করতে চাই। আর এ কাজে তিনি সকলের সহযোগীতা কামনা করেন। সাংবাদিক ও গুনীজন এসএম ইকবাল, নাট্যজন সৈয়দ দুলাল বীর যোদ্ধা মনোরঞ্জন ঘোষালের সম্মানে জেলা প্রশাসনের আয়োজনকে স্বাগত জানিয়ে বলেন এ আয়োজনের মাধ্যমে বরিশালবাসী সম্মানিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী হোসনে আরা বেগম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু ইউসুফ মোঃ রেজাউর রহমান, অধ্যক্ষ প্রফেসর ইমানুল হাকিম, মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত হোসেন চৌধুরী, বিভাগীয় তথ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ জাকির হোসেন, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা পংকজ রায় চৌধুরী, এনডিসি সাদিকুর রহমান, সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শান্তি দাস প্রমুখ। সঙ্গীতানুষ্ঠানে যন্ত্রশিল্পী ছিলেন, ললিত দাস, সুশান্ত দাস, কাঞ্চন ও রনজিৎ শীল। শেষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন ঘোষালের সম্মানে নৈশ ভোজের আয়োজন করে জেলা প্রশাসক।
উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী মনোরঞ্জন ঘোষাল বৈবাহিক সূত্রে বরিশালের আত্মীয়। বরিশালের ঐতিহ্যবাহী স্টুডেন্টস্ লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মাখন লাল ঘোষের জামাতা তিনি।