দক্ষিনাঞ্চল সহ সারা দেশে গম আবাদে লক্ষমাত্রা অতিক্রম নিবিড় কার্যক্রম গ্রহণ করলে আগামীতে উৎপাদনে সয়ংসম্পূর্ণ হবে দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য ফসল গম উৎপাদনে এবার রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন কৃষি যোদ্ধাগন। তবে এবার শীতে তাপমাত্রার পারদ নিচে নামলেও তা স্থায়ী না হওয়ায় এখনো গম উৎপাদন নিয়ে কিছুটা সংশয়ে রয়েছেন কৃষিবীদগন। তবে কৃষি সম্প্রসারন অধিদফতরের দায়িত্বশীল মহল বিষয়টি নিয়ে ‘খুব দুশ্চিন্তার কিছু নেই’ বলে জাানিয়েছেন। মূলত শীত প্রধান দেশের খাদ্য ফসল গম আমাদের দেশে আবাদের ইতিহাস খুব বেশী দিন আগের নয়। কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট-বারি এবং কৃষি সম্প্রসারন অধিদফতর সহ গম গবেষনা কেন্দ্র দেশে গম আবাদে অগ্রনী ভুমিকা পালন করলেও আমাদের কৃষকদের অবদানও এক্ষেত্রে যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কৃষিবীদগন। ইতোমধ্যে গম আবাদে বাংলাদেশ বিশ্বে ৮মÑ১০ম পর্যায়ে পৌছার পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় খাদ্য ফসল হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেছে।
চলতি রবি মওশুমে দক্ষিনাঞ্চল সহ সারা দেশের সাড়ে ৪লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৪লাখ টন গম উৎপাদনের লক্ষেমাত্রা নির্ধারন করেছে কৃষি মন্ত্রনালয়। তবে ইতোমধ্যে সে লক্ষ অতিক্রম করে ৪লাখ ৮০হাজার হেক্টরেরও বেশী জমিতে এবার গমের আবাদ হয়েছে। ফলে চলতি মওশুমে দেশে গম উৎপাদনের পরিমান ১৫লাাখ টনে পৌছতে পারে বলে আশাবাদী মাঠ পার্যায়ের কৃষিবীদগন। দেশে বার্ষিক গমের চাহিদা ২৫-২৭লাখ টনের মত। এর মধ্যে বরিশাল ও ফরিদপুর সহ দক্ষিনাঞ্চলের ১১টি জেলার ৭৩হাজার ৬৭৯হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে ইতোমধ্যে ৭৮হাজার ৫১হেক্টর জমিতে গমের আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে দক্ষিনাঞ্চলে এবার ২লাখ ২৬হাজার ৩৪৭মেট্রিক টন গম উৎপাদনের যে লক্ষ স্থির করা হয়েছে, তা ২.৫০লাখ টন অতিক্রম করতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৃষি সম্প্রসারন অধিদফÍর-ডিএই’র দক্ষিনাঞ্চলের দায়িত্বশীল মহল।
তবে শীত প্রধান দেশের এ খাদ্য ফসল আবাদে ডিএই এবং বারি সহ গম গবেষনা কেন্দ্রের নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে কম শীতে উচ্চ ফলনশীল ও নোনা পানি সহিষ্ঞু জাতের গম বীজ এবং এর আবাদ প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌছে দেয়া জরুরী। কম সেচে অধিক ফসল উৎপাদন সহ রোগ বালাই-এর আক্রমন কম হওয়ায় গম আবাদ ও উৎপাদন ব্যায় কম। পাশাপাশি ধানের সাথে তুলনামূলকভাবে গমের দামও ভাল। ফলে কৃষকগন কম বিনিয়োগ ও ঝুকিতে অধিক আয়ের লক্ষে গম আবাদে ঝুকছেন বলে ডিএই’র দায়িত্বশীল মহল মনে করছেন। এমনকি বোরো ধানের চেয়ে গম আবাদ ও উৎপাদনে রাসয়নিক সারের ব্যবহারও কম। ফলে কৃষকের বিনিয়োগ কম, আয় বেশী। উপরন্তু দেশে এখন প্রতিমন ইরি-বেরো ধান উৎপাদন ব্যায় যেখানে প্রায় ৬শ টাকার কাছাকাছি, সেখানে গমের ক্ষেত্রে তা ৫শ টাকারও কম। অপরদিকে প্রতিমন ধান বিক্রী হচ্ছে সাড়ে ৫শ থেকে ৬শ টাকার মধ্যে। কিন্তু গম বিক্রী হয় ৮শ টাকার ওপরে।
মূলত গম অধবাদে সেচ ব্যায়ও খুবই কম। যেখানে আমাদের দেশে বোরো আবাদ ও উৎপাদন ব্যায়ের প্রায় ৩৩%-এরও বেশী সেচ ব্যায়, সেখানে গমের ক্ষেত্রে তা ১০%-এরও কম। পাশাপাশি আমাদের প্রকৃতি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার জন্যও গম উপযোগী। যেকোন প্রাকৃতিক দূর্যোগে বোরো ধানের চেয়ে গম অনেক বেশী প্রতিরোধক্ষম ও টেকসই। আর এসব কারনেই সারা দেশের মত দক্ষিনাঞ্চলেও গম আবাদ গত কয়েকটি বছর যাবত বেড়ে চলতি মওশুওমে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে বলে জানা গেছে। চলতি রবি মওশুমে বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলায় ৫হাজার ২৭৫হেক্টর জমিতে আবাদ লক্ষমাত্রার বিপরিতে ১৪হাজর ৫১হেক্টর জমিতে গমের আবাদ সম্পন্ন হয়েছে ইতোমধ্যে। যা লক্ষমাত্রার প্রায় তিনগুন । এর মধ্যে শুধুমাত্র দ্বীপজেলা ভোলাতেই ৩হাজার ৪৮৩হেক্টরে আবাদ লক্ষমাত্রার বিপরিতে প্রায় ১০হাজার হেক্টরে গম আবাদ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
আমাদের দেশে গম আবাদের ইতিহাস খুব বেশী দিন আগের নয়। বিশেষকরে দক্ষিনাঞ্চলের জেলাগুলোতে তা মাত্র এক যুগ আগে শুরু হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে অপ্রচলিত এ খাদ্য ফসল আবাদে কৃষকদের আগ্রহ লক্ষণীয় ভাবে বাড়তে শুরু করেছে। সত্তরের দশকে দেশে সামান্য কিছু জমিতে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত ‘খেরী, আইপি-৫২ ও আইপি-১২৫’ জাতের গম-এর আবাদ শুরু করেন কৃষকগন। পরিবর্তিতে কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট-বারি আবহাওয়া পরিস্থিতি ও উৎপাদন অনুকুল পরিবেশের কথা চিন্তা করে এবং কৃষকের বিষয়টিও বিবচনায় নিয়ে বিদেশ থেকে ‘কল্যাণ সোনা’ ও ‘সোনালিকা’ জাতের মধ্যম মানের ফলনশীল গমবীজ আমদানী করে। আমদানীকৃত ঐসব বীজ দিয়ে আবাদ সম্প্রসারন কার্যক্রম শুরু করে কৃষি সম্প্রসরন অধিদফর। স্থানীয় জাতের তুলনায় এসব গমের উৎপাদন প্রায় তিনগুন বেশী হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহও বৃদ্ধি পায়।
তবে এর পরে কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট পর্যায়ক্রমে ‘শতাব্দী, প্রদিপ, সৌরভ, গৌরব, সুফী, এবং বিজয়’ নামের উচ্চ ফলনশীল গমের জাতসমুহ উদ্ভাবন করেছে। এসব জাতের মধ্যে দক্ষিসনাঞ্চলে উচ্চ তাপ সহনশীল ‘শতাব্দী’ জাতটি ইতোমধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এছাড়াও ‘বারি গম-২৫’ ও ‘বারি গমÑ২৬’ নামের আরো দুটি উচ্চ ফলনশীল এবং লবনাক্ততা ও উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল দুটি জাতও উদ্ভাবন করেছেন আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীগন। অপরদিকে দেশী আগাছা ও গমের জাত থেকে শংকরায়ন করে ‘ট্রিটিক্যালী-১’ ও ‘ট্রিটিক্যালী-২’ নামের আরো দুটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীগন।
কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত আমাদের এসব উচ্চফলনশীল গমের জাতসমুহ আবাদ ১০লরাখ হেক্টরে উন্নীত করতে পারলে আগামীতে দেশ গম উৎপাদনে সয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে বলে মনে করছেন ওয়াকিবাহাল মহল। তবে সেলক্ষে গম আবাদ সম্প্রসারন কার্যক্রম গ্রহন সহ এর আবাদ প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে পৌছে দেয়ার কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন মহলটি। আর এ লক্ষে বারি, ডিএই ও গম গবেষনা কেন্দ্রের নিবিড় কার্যক্রম গ্রহন সহ তা মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌছে দেয়ার কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন মাঠ পার্যায়ের কৃষিবীদগন।