দক্ষিনাঞ্চলে এনজিও ঋণের বেড়াজালে হতদরিদ্ররা

বরগুনা প্রতিবেদক ॥ দক্ষিন উপকূলীয় এলাকার মানুষগুলো এনজিও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এসব এলাকার মানুষের প্রধান কর্মস্থল মৌসুম ভিত্তিক মাছ শিকার করা। আর এতেই চলে তাদের সংসারের ভরন পোষন। এ বছর বঙ্গোপসাগরসহ উপকূলীয় নদ-নদীতে মাছ না থাকায় চরম বেকায়দায় পরেছেন ঋণগ্রস্ত হাজার হাজার পরিবার। জীবন যুদ্ধ চলে সাগরের ঢেউয়ের তালে তালে। রয়েছে জলদস্যুদের অপহরণ বানিজ্য। মুক্ত করতে নতুন করে পরতে হয় ঋণের জালে। এই সাগর পাড়ের জেলেদের জীবন জীবিকার তাগিদে নৌকা জাল ক্রয়সহ সরঞ্জামাদি সংগ্রহের জন্য এনজিও ঋণের পাশাপাশি স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে ও মহাজনদের থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে এ পেশার মানুষ গুলো প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হয়ে পরেছেন।
এমনি ভাবেই স্কুলপড়ুয়া দুটি সন্তানকে নিয়ে কী করবেন, এমন হতাশায় বরগুনার তালতলীতে আত্মহত্যা করেছেন তিন সন্তানের জননী শিউলী বেগম (৩২)। কিছুদিন পূর্বেও বরগুনার তালতলী উপজেলার সিলভারতলী গ্রামে ওই ঘটনা ঘটে।
শিউলী বেগমের স্বামী দরিদ্র আবদুল কাদের মিয়া একজন প্রান্তিক জেলে। বাড়ির আশপাশের খালে-বিলে মাছ ধরেই চলে তাঁর জীবিকা। সাকুল্যে তাঁর দৈনিক রোজগার ২’শ টাকার বেশি নয়। এ রোজগারেই চলে তাঁর দুই ছেলের স্কুলসহ চার সদস্যের সংসার খরচ। এসব জেনেও দরিদ্র জেলে আবদুল কাদের মিয়াকে ঋণ দিয়েছে এনজিওগুলো। এরমধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক, এসডিএফ, হিড বাংলাদেশ, সংকল্প ট্রাস্ট, আশা, কোডেকসহ ১০টির বেশি এনজিও। এসব এনজিওর ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে একসময় নিজেদের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়স্থল ছোট্ট বসতঘরটিও বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন কাদের মিয়া। স্থানীয় একজন ক্রেতার কাছ থেকে ৫’শ টাকা বায়নাও নেন তিনি।
ভুক্তভোগী কাদের মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা আর সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে তিনি আশা এনজিও সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে দেড় লক্ষাধিক টাকা ঋণ নিয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে তাঁকে এসব এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। এক সময় বাধ্য হয়ে তিনি একটি এনজিওর ঋণ পরিশোধ করতেই আরেকটি এনজিওর ঋণ নেন। এ ছাড়া নাকি তাঁর কোনো উপায় ছিল না।
তাঁর তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে মেজ ছেলে শাহীন বর্তমানে ছোটবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয় এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট ছেলে তুহিন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বড় মেয়ে কাকলীর বাল্যবিবাহ হয়েছে বছর তিনেক আগে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও গৃহবধূ শিউলী আক্তারের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্কুলপড়ুয়া দুই ছেলের খরচের পাশাপাশি বড় মেয়ের বিয়ের খরচ এবং সংসারের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে দরিদ্র জেলে কাদের মিয়া বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেন। এদিকে মাছের আকাল থাকায় রোজগারের অবস্থাও ভালো ছিল না তার। বেশ কয়েক মাস ধরে আয়-রোজগার তেমন না থাকায় সংসারের খরচের সঙ্গে এনজিওর কিস্তি বাড়তি চাপ হিসেবে যোগ হয়। এ অবস্থায় একসময় দরিদ্র জেলে কাদের মিয়া নিজেদের বসবাসের একমাত্র ঘরটি বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শিউলির পরিবারের মত শতশত পরিবার রয়েছে বরগুনার উপকূলীয় এলাকায়। এমন কথাই বললেন, তালতলী উপজেলার লাউপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র আনোয়ারা বেগম। তিনি প্রতিবেদককে জানান, আমার স্বামী কোন রকম সংসার চালাবার জন্য  বঙ্গোপসাগরে ইলিশ মাছ ধরার নৌকা জাল ক্রয়ের জন্য এনজিও থেকে টাকা নেন কিন্তু গত কয়েক বছরে সাগরে মাছ তেমন না পাওয়ার কারনে তারা বিভিন্ন এনজিও থেকে কয়েক লক্ষাধিক টাকা ঋন নিয়েছে । শুধু মাত্র বসত ঘরটুকু ছাড়া তাদের কোন জমিজমাও নেই বলে তিনি জানান। এ টাকা কি দিয়ে পরিশোধ করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা জানিনা তবে একটির টাকা পরিশোধ করতে অন্য আরেকটির টাকা ছাড়িয়েই লক্ষ লক্ষ টাকা ঋণের বোঝা তাকে মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে ছোট বগী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান তৌহিদুজ্জামান তনু জানান, কাদের মিয়ার স্ত্রী শিউলী বেগমের আত্মহত্যার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ঘটনাটি দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এনজিওরা অধিক মুনাফার লক্ষ্যে ঋণগ্রহীতাদের অর্থনৈতিক অবস্থা যাচাই-বাছাই না করেই ঋণ দিয়ে থাকে। এভাবে একাধিক এনজিওর ঋণ নিয়ে তা শোধ করতে না পেরে দিন দিন দরিদ্র থেকে অতি দরিদ্র হয়ে পড়ছে শত শত পরিবার। এদের অনেকেই আবার ঋণের ভাড়ে জর্জরিত হয়ে ভিটেমাটি ফেলে পালিয়ে গেছেন। ইউপি চেয়ারম্যান তনু আরো বলেন, এনজিওরা যতটা উদার হস্তে ঋণ দিয়ে থাকে, ততটাই শক্ত হাতে তা আদায় করে নেয়।
এ বিষয় তালতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী তোফায়েল হোসেন বলেন, নিহত শিউলী বেগমের স্বামীর এনজিও সহ দেড় লক্ষাধিক টাকা ঋণের বোঝায় শেষ সম্বল বসত ঘরটি বিক্রি করায় সন্তানদের আশ্রয়স্থল না থাকায় স্বামীর সাথে অভিমান করে আত্মহত্যা করেন।