দক্ষিণে নিস্ক্রিয় বিরোধী জোট ক্ষমতাসীনরা ঢিলেঢালা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ হামলা-মামলা ও নানামুখি প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে দক্ষিণাঞ্চলের মূল বিরোধী জোটের রাজনৈতিক কর্মকান্ড ক্রমে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ার মধ্যে শাসক মহাজোটের সাংগঠনিক তৎপরতাও অনেকটাই ঢিলেঢালা। সরকার বিরোধী ১৮ দলীয় জোটের মূল শরিক দলের অনেক নেতা আবার ঢাকা প্রবাসী হয়ে নিজ জেলায় নিস্ক্রিয় হয়েও দলের নিয়ন্ত্রন বজায় রাখছেন। ফলে দলের রাজনৈতিক তৎপরতাও তাদের মতোই। এরই মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি জেলা উপজেলাতেই শাসক ও বিরোধী জোটের মূল শরিক দলের মধ্যে নানা বিভক্তিও ক্রমে ক্রমে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। এমনকি বিরোধী দলহীন সংসদের বর্তমান এমপিদের বেশীরভাগই এলাকার মাটি ও মানুষের সাথে অনেকটা যোগাযোগহীন হয়ে পড়েছে ইতোমধ্যে। এলাকায় ও সংসদে প্রকৃত বিরোধী রাজনৈতিক দল না থাকায় এ অঞ্চলের এমপিগণও অনেকটাই জবাবদিহীতা ও এলাকাবাসীর কাছে দায়বদ্ধতার বাইরে চলে গেছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। এর সাথে উপদলীয় কোন্দল শাসক জোটের মূল শরিক দলকে রাজনৈতিকভাবে ক্রমশ দুর্বল করলেও কার্যকরি বিরোধী দল না থাকায় এখনো তারা পায়ের তলায় মাটির অস্তিত্বও পরিমাপ করতে পারছে না।
খোদ বরিশাল মহানগরীতেও আওয়ামী লীগ এবং এর অংগ সংগঠনসমূহ জেলা ও মহানগরী কমিটির ব্যানারে দ্বিধা বিভক্ত। তবে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ নানা মান অভিমানে বেশীরভাগ সময়-ই ঢাকায় অবস্থান করলেও সাম্প্রতিককালে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র সেরনিয়াবাত সাদেক আবদুল্লাহ বরিশাল মহানগরীতে তার অবস্থান সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরণের অকাল মৃত্যুর পরে অদ্যাবধি দলে সে পদ পূরণ হয়নি। যদিও হিরণের সংসদীয় আসনে তার স্ত্রী জেবুন্নেসা আফরোজ আরেকটি ভোটার বিহীন নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে এ নগরীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু কিছু একান্ত অনুসারী ছাড়া তার সাথে এলাকার সাধারণ মানুষের যোগাযোগ অনেকটাই কম। গত দেড় বছরাধীককালেও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের পদটি পূরণ করতে পারেনি। তবে ইতোমধ্যে দুটি কমিটির তালিকা কেন্দ্রে জমা পড়ার পরে তা নিয়ে নানামুখি তদ্বিরও শুরু হয়েছে।
কিন্তু এ নগরীতে চোখ রাখলে শুধু দুই নেতার পক্ষ থেকে তাদের রঙিন ছবি সহ নানা উপলক্ষে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ছাড়া কোন রাজনৈতিক তৎপরতা চোখে পড়ছে না। তবে বরিশাল মহানগরীতে এমপি গ্রুপের অনুসারী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডারদের হাতে সরকারী দফতরের টেন্ডার জমাদান সহ কাজ ভাগাভাগির বিষয়টি চলে এসেছে অনেক আগে। এমনকি বরিশাল মেডিকেল কলেজে অতি সম্প্রতি ছাত্রলীগের কমিটি গঠন নিয়ে দুই গ্রুপের মুখোমুখি অবস্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণাও করতে হয়। তবে একাডেমিক কাউন্সিলের ঐ সিদ্ধান্তের ঘন্টাখানেকের মধ্যেই এমপি’র হস্তক্ষেপে তা পরিবর্তন করে কলেজ বন্ধের পূর্ব সিদ্ধান্তটি বাতিল করেন কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ ও সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ অবশ্য প্রশংসার দাবী রেখেছেন। তাদের কারণে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের কিছুটা হলেও সেশন জটের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের অন্য জেলাগুলোর চিত্রও খুব একটা ভিন্নতর নয়। প্রায় সর্বত্রই উপদলীয় কোন্দল বিদ্যমান থাকার পাশাপাশি নানা গ্রুপে বিভক্ত ক্যাডাররা ক্রমশ নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমনকি এ অঞ্চলের বেশীরভাগ নেতাই এলাকা ও এলাকাবাসীর উন্নয়নে যতটা না তৎপর, তার চেয়ে বেশী সক্রিয় ক্যাডারদের মাধ্যমে টেন্ডারবাজী নিয়ে। আর প্রতিবাদ বা গঠনমূলক সমালোচনা করার মত কোন কর্মকান্ডেই শাসক মহাজোটের জবাবদিহীতার প্রশ্ন এখন দক্ষিণাঞ্চলে অবশিষ্ট নেই।
ফলে দক্ষিণাঞ্চলে সরকারী জোটের মূল শরিক দল যেমনি রাজনৈতিক তৎপরতা শূণ্য হয়ে পড়ছে, তেমনি জনসমর্থন ও তাদের কাছে জবাবদিহীতার বিষয়টিও এখন গৌণ। কারণ রাজনীতির মাঠে বিরোধী দলহীন শাসক জোট এখন প্রতিনিয়ত ওয়াকওভার লাভ করছে। যা তাদের রাজনৈতিকভাবে ক্রমশ দেউলীয়া করে তুলছে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। এতে করে দক্ষিণাঞ্চলে শাসক জোটের বেশীরভাগ নেতাই এখন জনসমর্থনহীন হয়ে নিজ ক্যাডার ও অনুসারী নির্ভর হয়ে পরেছেন বলেও মনে করছেন মহলটি।
অপরদিকে বিদ্যমান মামলা সহ আগামী দিনের আরো কঠোর পদক্ষেপের আশংকায় বিএনপি ও তাদের সমমনা জোট এখন অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে দক্ষিণাঞ্চলে। বরিশাল মহানগর ও জেলায় বিএনপি’র সীমিত কিছু তৎপরতা বিদ্যমান থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই আবার ফটো সেশন নির্ভর। তবে মামলায় জর্জরিত মহানগর সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সারোয়ার, উত্তর জেলা সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান ও দক্ষিণ জেলা সভাপতি এবাদুল হক চান সহ এখানের বেশীরভাগ প্রথম ও দ্বিতীয় সারির নেতৃবৃন্দ চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। অতি সম্প্রতি গ্রেফতার আতংকে রয়েছে বরিশাল সহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের বিএনপি ও সমমনা জোটের শরিক দলের নেতা-কর্মীরাও।
অপরদিকে ঝালকাঠী ও পটুয়াখালী সহ কয়েকটি জেলার বিএনপি’র প্রথম সারির নেতাদের অনেকেরই স্থানীয়ভাবে দলীয় কর্মকান্ডে অংশীদারিত্ব নেই। ফলে মাঠ কর্মীরা বিভ্রান্ত ও হতাশ। ঝালকাঠী জেলা বিএনপি সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) মোস্তফা কামাল মন্টু থাকেন বরিশালে। তার স্ত্রী বরিশালে শিক্ষা অফিসে কর্মরত। যার কারণে বেশির ভাগ সময় তাকে বরিশাল থাকতে হয়। প্রায় একই পরিস্থিতি পটুয়াখালী বিএনপিতেও। সেখানে অনুপস্থিত সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী জেলা বিএনপি সভাপতি। তবে বিগত দুটি বছরের সরকার বিরোধী আন্দোলনে তিনি এলাকায় থেকে দলীয় কোন কর্মসূচীতে নেতৃত্ব দিতে পারেন নি। এমনকি ঢাকায় প্রবাস জীবনেও তিনি অনেকটা আত্মগোপনে থাকেন প্রায়শই। মাঠে তাকে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ দলের কেন্দ্রীয় অনেক নেতা-কর্মীর। ভোলার সাবেক পৌর চেয়ারমান গোলাম নবী আলমগীর জেলা বিএনপি সভাপতি হলেও ভদ্র ও মার্জিত এ নেতা রাজনৈতিক মাঠে অনেকটাই নিস্ক্রিয় বলে অভিযোগ কর্মীদের। ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনে যথেষ্ট জনপ্রিয় এ নেতার ভদ্রতা ও আচরণ প্রশ্নাতীত। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও ভোলা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোশাররফ হোসেন শাহজাহানের ছোট ভাই হিসেবে স্থানীয়ভাবে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য হলেও বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে নিরব ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ সবার।
পিরোজপুরে জেলা বিএনপি সভাপতিকে নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। সম্পাদক আলমগীর হোসেন দলের জন্য নিবেদিত হলেও সরকারী দমন পীড়নে অনেকটাই কোনঠাসা অবস্থায়। বরগুনা বিএনপি’র সাংগঠনিক অবস্থা কোন সময়ই ভাল ছিলনা। উপরন্তু অভ্যন্তরীন কোন্দলের সাথে সরকারী দল ও আইনÑশৃংখলা বাহিনীর অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ডে সেখানেও দলটি অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।