দক্ষিণাঞ্চলে লেখাপড়ার মান ক্রমশই কমছে

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ একসময়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্থানে থাকা বরিশালে লেখাপড়ার মান ক্রমশ নিচের দিকে বলে উদ্বিগ্ন অনেক প্রবীন শিক্ষাবিদ সহ ওয়াকিবহাল মহল। বিগত এসএসসি ও সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি’র ফলাফলে বেশ কিছু উদ্বেগজনক বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এইচএসসি’র ফলাফলে বরিশাল বোর্ডের অবস্থান নিচের দিকে। পাসের হারের সাথে জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতেও বরিশাল বোর্ডের অবস্থান সর্বনি¤েœ। এমনকি অন্য শিক্ষা বোর্ডগুলোর আওতাধীন একটি জেলা থেকে যে সংখ্যক ছাত্রÑছাত্রী জিপিএ-৫ নিয়ে পাস করেছে, গোটা বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সংখ্যা তার চেয়েও নিচে। এবারের এইচএসসির ফলাফলে বরিশাল শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার গত বছরের তুলনায় দশমিক ৭ভাগ বেড়ে ৭০.১৩ শতাংশে উন্নীত হলেও এ বোর্ডের আওতাধীন বরগুনা জেলায় পাস করেছে ৫৪.৩৯%। যা গতবছর ছিল ৬৯.৪৩%। এমনকি বরগুনা ও ঝালকাঠী জেলার ফলাফল বিপর্যয় গোটা শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলকেই পেছেনে ফেলে দিয়েছে বলে স্বীকার করেছেন জেলা দুটির প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগনও। বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলার মধ্যে এবারের উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলে পিরোজপুর জেলা শীর্ষস্থান দখল করেছে। জেলাটিতে পাসের হার ৭৫.১৩%। দ্বিতীয় অবস্থানে ভোলা জেলা। পাসের হার ৭৫.০৮%। পটুয়াখালী জেলার ছাত্রÑছাত্রীরা ৭৩.১৩% নিশ্চিত করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। আর অনেক বড় বড় নেতা ও কর্তাদের সমাবেশের বরিশাল বিভাগীয় সদরের পাসের হার ৭০.৭০%। অবস্থান ৪র্থ।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ৩১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৬১ হাজার ৫৩৮ ছাত্রÑছাত্রীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণের সংখ্যা মাত্র ৭৮৭। যা পরীক্ষার্থীর তুলনায় মাত্র ১.২৮%। গতবছর এ শিক্ষা বোর্ডে জিপিএÑ৫ পেয়ে উত্তীর্ণের সংখ্যা ছিল ১,৩১৯। যা ছিল পরীক্ষার্থীর তুলনায় ২.৩৬%। কোচিং বাণিজ্যের ব্যাপক বিকাশের পরেও বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার হ্রাস পেয়ে এবার অর্ধেকে নেমেছে। বিগত মাধ্যমিকের ফলাফলেও বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে জিপিএÑ৫ প্রাপ্তির হার প্রায় ৩৫% হ্রাস পাবার চিত্র ফুটে ওঠে। আর গত তিন বছরে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এসএসসির পাসের হার কমেছে ১১%-এরও বেশী।
এমনকি বিভাগীয় সদর বরিশালের অবস্থান এবারের উচ্চ মাধ্যমিকে গতবছরের প্রথম থেকে এবার চতুর্থতে নেমেছে। এ জেলাটির পাসের হার গতবছর ৭২.৯৪% থেকে ২.২৪% হ্রাস পেয়ে ৭০.৭০%-এ নেমেছে। জেলার ৯৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২২ হাজার ৫৫৮ ছাত্রÑছাত্রীর মধ্যে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪৬৮ জন। এর মধ্যে শুধুমাত্র বরিশাল ক্যাডেট কলেজে ৫০ ছাত্র ঐ লক্ষ্য অর্জন করেছে । নচেত জেলাটিতে এ সংখ্যা আরো নিচে নামতে পারত। অথচ গতবছর উচ্চ মাধ্যমিকে বরিশাল জেলায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ ছাত্রÑছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৭৯৭। দক্ষিণাঞ্চলের অন্য জেলাগুলোর মত বরিশালের লেখা পড়ারও বেহাল দশা এবারের উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলে উঠে এসেছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। অথচ এ জেলার আমলা আর রাজনৈতিক নেতাদের নানা বিষয়ে অর্জন নিয়ে ব্যাপক প্রচারনার কোন কমতি নেই। বিগত মাধ্যমিকের ফলাফলেও বরিশাল জেলার অবস্থান ছিল ৬টি জেলার মধ্যে পঞ্চমে। অথচ অতি নিকট অতীতেই শিক্ষা ক্ষেত্রে এ জেলার অবস্থান ছিল সারা দেশের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে। এ বিভাগীয় সদরে কোচিং বাণিজ্য অন্য যেকোন জেলার চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ হলেও লেখাপড়ার মান বাড়েনি বলে অভিযোগ অভিভাবক সহ সাধারন ওয়াকিবহাল মহলের। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা বিভাগ সহ প্রশাসনিক পর্যায়ে তেমন কোন হেলদোলও নেই। এব্যাপারে বরিশালের উচ্চ প্রশাসনিক পর্যায়ে আলাপ করার চেষ্টা করা হলেও সেখান থেকে অপারগতা প্রকাশ করা হয়েছে।
এবারের উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলে বরগুনা জেলায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্রÑছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ৪৮। গতবছর যা ছিল ৬৩। আর ঝালকাঠী জেলায় এবারের উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের হার ৬৫.০১%। যা গতবছর ছিল ৭২.৪১%। জেলাটিতে এবার জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণের সংখ্যা ৪৫ হলেও গত বছর তা ছিল ৭১। এমনকি সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মত করেই ঝালকাঠী জেলায়ও মেধাক্রমে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা যথেষ্ট ভাল করেছে। এবার জেলাটির জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৪৫ জনের মধ্যে ৩১জনই ছাত্রী। গতবছরও ৭১জনের মধ্যে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৫২। জেলার ২৮টি কলেজের মাত্র ৯ ছাত্র জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।
দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন পর্যায়ে তা নিয়েও যথাযথ মূল্যায়নের তাগিদ দিয়েছেন অনেক প্রবীন শিক্ষাবীদ সহ ওয়াকিবহাল মহল। গত কয়েক বছরে দক্ষিণাঞ্চলে কোচিং বানিজ্যের সম্প্রসারন ঘটেছে ব্যাপক হারে। সকাল ও সন্ধ্যায় এখন আর ছাত্রÑছাত্রীরা ঘরে পড়তে বসে না। স্কুল-কলেজের ক্লাসের পরে কোচিং সেন্টারে ছুটছে ছাত্রÑছাত্রীরা। সেখান থেকে বের হয়ে ছাত্ররা অনেক রাত পর্যন্তই রাস্তা আর পার্কে আড্ডা দেয়। ছাত্রীরা ঘরে ফিরে টিভি দেখে। তবে অনেক ছাত্রীরাই ঘরে ফিরে অভিভাবকের তাড়ায় কিছু পড়াশোনা করলেও ছেলেদের অবস্থা খুবই অবনতিশীল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল। গত তিন বছরের উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল বিশ্লেষনে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭১.৭৫%, জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ছিল ২,২২৫। ২০১৫ সালে পাসের হার ছিল ৭০.০৬%। জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ ছাত্রÑছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১,৩১৯। আর চলতি বছর পাসের হার দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও তা দু বছর আগের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ের চেয়ে ১.৬২% কম। আর এবার জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা সাম্প্রতিককালের সর্বনি¤œ, মাত্র ৭৮৭।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে মাধ্যমিকে পাসের হার ২০১৪ সালে ছিল যেখানে ৯০.৬৬%। সেখানে ২০১৫ সালে তা ৮৪.৩৭%এ হ্রাস পায়। আর চলতি বছরে এ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৭৯.৪১%-এ হ্রাস পেয়েছে। অনুরূপভাবে জিপিএÑ৫ প্রাপ্তির হারও গত তিন বছরের সর্বনি¤েœ এবারের এসএসসির ফলাফলে। ২০১৪ ও ২০১৫-এর রাজনৈতিক অস্থিরতায় যেখানে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪,৭৬২ ও ৩,১৭২, চলতি বছর তা ৩,১১৩’তে হ্রাস পেয়েছে।
তবে গত তিনটি বছরের ফলাফল বিশ্লেষনে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা যথেষ্ট এগিয়ে রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলে।
ফলাফল বিপর্যয়ের বিষয়ে বরগুনা ও ঝালকাঠীর জেলা প্রশাসকদ্বয়ের সাথে আলাপ করা হলে তারা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিস্থিতি উত্তরনে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহনের কথা জানান। খুব শীঘ্রই শিক্ষক ও অভিভাবক সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষদের নিয়ে বৈঠক করে তাদের স্ব-স্ব জেলার শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহনের কথাও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসকবৃন্দ। পাশাপাশি ছাত্রÑছাত্রীদের লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করার ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদের আরো সচেতন হবারও আহবান জানান জেলার শীর্ষ এ দুই কর্মকর্তাগন।