দক্ষিণাঞ্চলে বসন্তে গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও বাড়ছে

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ ভরা বসন্তে দেশের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে গ্রীষ্মের আবহাওয়ার সাথে লাগাতার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন অনেকটাই বিপর্যস্ত। এবার ‘মাঘের শীত বাঘের গায়’ লাগার আগেই দক্ষিণাঞ্চলে বসন্তের আবহাওয়া লক্ষ্য করা যায়। আর বসন্তের মধ্যভাগের কয়েকদিনের লাগাতার বর্ষনে শত শত কোটি টাকার তরমুজ আর গোল আলু সহ বেশ কিছু রবি ফসল বিনষ্ট হবার পরে এখন দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে তাপমাত্রার পারদ ৩৪ ডিগ্রী সেলসিয়াসে উঠে যাচ্ছে।
আবহাওয়া বিভাগের মতে, লঘুচাপের বর্ধিত অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশ সহ উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধি সহ রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকার কথাও বলেছে আবহাওয়া বিভাগ। গতকাল বরিশালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩ ডিগ্রী সেলসিয়াসের কাছাকাছি। সর্বনিম্ন ২৬.৭ ডিগ্রী। আজ সকালের পরবর্তী ৪৮ ঘন্টায় আবহাওয়া পরিস্থিতির সামান্য পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে। গতকাল দিনভরই দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে মেঘের আনাগোনা লক্ষ্য করা গেলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন বৃষ্টি হয়নি।
এবারের শীত মৌসুমে শুধুমাত্র একদিন বরিশালে তাপমাত্রার পারদ ৭.৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসে হ্রাস পাবার পরে আর কনকনে শীতের দেখা মেলেনি। ১ মাঘের ঐ কনকনে শীত পর দিন থেকেই উধাও হতে শুরু করে। এর পরে পুরো মাঘ জুড়েই ছিল বসন্তের আমেজ। ফাল্গুনের শেষভাগে এসে গত ১০-১২ মার্চের কয়েক দফার মাঝারী থেকে ভারী বর্ষনে ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনার বিস্তির্ণ এলাকায় গোল আলু ও তরমুজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারন অধিদফ্তর-ডিএই’র মতে শুধুমাত্র তরমুজেরই ক্ষতির পরিমান সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকা। গোল আলুর অবস্থা আরো খারাপ। ভোলাতে এক গোল আলুর চাষি ফসলের ক্ষতি সহ্য করতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন। সেখানের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, বেশীরভাগ গোল আলুই আর জমি থেকে তোলা সম্ভব হয়নি। অনেক চাষির গোল আলু টানা বৃষ্টিতে পচন ধরে জমিতেই নষ্ট হয়ে গেছে। ভোলার লালমাহন, তজুমদ্দিন ও বোরহানউদ্দিন সহ বিভিন্ন এলাকার মাঠে আলুর পচা গন্ধে দাড়ান যাচ্ছে না। অনেক চাষিই জমি থেকে আলু তোলারও সাহস করেননি। কারন এতে শ্রমিকের মজুরীর অর্থও উঠবে না। অথচ ডিএই’র বরিশাল আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রন কক্ষে ভোলা থেকে গোল আলুর ক্ষয়ক্ষতির কোন হিসেব পৌঁছেনি। দক্ষিণাঞ্চলে এবারে কৃষকদের সর্বশান্ত করে দেয়া এ বৃষ্টিপাতের পর পরই তাপমাত্রার পারদ ক্রমশ চড়ছে। আর তাপমাত্রার এ বাড়াবাড়ির মধ্যেই বিদ্যুৎ সংকট না থাকলেও বিতরন ব্যবস্থার ত্রুটির কারনে বরিশাল মহানগরী সহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বেশ কষ্টে আছেন। গত দিন পনের ধরেই সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট যথেষ্ঠ অসহনীয় পর্যায়ে পৌছেছে। ৩৩/১১ কেভী সাব-স্টেশন থেকে শুরু করে সঞ্চালন লাইনে সমস্যা সহ ১১ কেভী ও ০.৪ কেভী বিতরন লাইনে গোলযোগ নিয়মিত ঘটনায় পরিনত হয়েছে। সাথে ছোট-বড় সব ধরনের ট্রান্সফর্মারগুলোও বার বার গোলযোগের শিকার। ফলে খোদ বরিশাল মহানগরী সহ দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্রই বিদ্যুতের হাহাকার শুরু হয়েছে। দূর্ভোগে সাধারন মানুষ। শিল্প ও ব্যবসা-বানিজ্যের অবস্থাও যথেষ্ঠ নাজুক। গত দুদিন বরিশালের রূপাতলী ৩৩ কেভী মূল সাব-স্টেশন থেকে পলাশপুরগামী ৩৩ কেভী লাইনে গোলযোগের কারনে রাত-দিন গোটা নগরীর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বার বারই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রূপাতলী-কাশীপুর ৩৩ কেভী সঞ্চালন লাইন ও এর সরঞ্জামগুলোতেও গোলযোগ চলছে। ফলে এসব সঞ্চালন লাইন বার বার ট্রিপ করায় সাধারন মানুষের দূর্ভোগ বাড়ছে। এমনকি বুধ ও বৃহস্পতিবার রূপাতলী-পলাশপুর ৩৩ কেভী লাইনে গোলযোগের কারনে কয়েক দফায় বরিশাল গ্রীড সাব-স্টেশনটিই বন্ধ হয়ে যায়।
৩০বছরের পুরনো সঞ্চালন এবং বিতরন লাইন সহ ট্রান্সফর্মার ও এর সংযূক্ত সরঞ্জামাদী আয়ুস্কাল হারানোর পাশাপাশি এর পরিপূর্ণ রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে বরিশাল মহানগরী সহ দক্ষিণাঞ্চলবাসীর দূর্ভোগ বাড়ছে। তবে বেশ কিছু বিতরন ও সঞ্চালন লাইন সহ রূপাতলী সাব-স্টেশনটি পূণর্বাসনের একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও তার গতি অত্যন্ত শ্লথ। আগামী অর্থ বছরে ঐ প্রকল্পের কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছেনা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে ঐসব কাজ শেষ করতে আরো অন্তত দেড় বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে। ততদিনে বরিশাল মহানগরী সহ দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরন ব্যবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছবে তা বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরাও।