দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি-অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা ॥ সোয়া লাখ টন কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ

অতিথি প্রতিবেদক ॥ খাদ্য উদ্বৃত্ত দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক অসময়ের অতি বর্ষনে প্রায় সোয়া লাখ টন কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এমনকি গত মার্চ ও এপ্রিলে দুদফায় প্রায় সাড়ে ৫শ মিলিমিটারের অসময়ের অতি বর্ষনে কৃষিক্ষেত্রে সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ ক্ষতি হলেও লক্ষ লক্ষ কৃষকের আহাজারী কেউ শুনছেনা। দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি পূণর্বাসনে কোন উদ্যোগও এখনো গ্রহন করা হয়নি। ফলে প্রায় ৫ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি-অর্থনীতিতে এবার যথেষ্ঠ বিরূপ প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলার মধ্যে ভোলা, পটুযাখালী ও বরগুনাতেই ব্যাপক ফসলহানী ঘটেছে সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দূর্যোগে।

তবে তুলনামূলকভাবে বোরো ও আউশ ধানের ক্ষতি কিছুটা কম হলেও মুগডাল, মরিচ, তিল, সয়াবিন, চিনাবাদাম, মিষ্টিআলু, তরমুজ ও গোল আলুর ক্ষতি মারাত্মক। গত মার্চের অতি বর্ষনে ভোলা, বরগুনা ও পটুয়াখালী সহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে শুধুমাত্র তরমুজ ও গোল আলুর ক্ষতি পরিমানই ছিল প্রায় ৫শ কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারন অধিদফ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রের মতে গত মার্চের বর্ষনে দক্ষিণাঞ্চলে এবার তরমুজের ক্ষতি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকা। ভোলাতে এক গোল আলু চাষি নিজের জমির ভয়াবহ ক্ষতি সহ্য করতে না পেয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। মার্চের অতিবর্ষনে গ্রীষ্মকালীন সবজি সহ আরো বেশ কিছু ফসলেও যথেষ্ঠ ক্ষতি হয়েছে।

মার্চের ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই গত ২০ থেকে ২৪ এপ্রিল প্রায় ৩৩০ মিলিমিটার বর্ষনে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি সেক্টরে আরো ভয়াবহ দূর্যোগ নেমে আসে। ডিএই’র দায়িত্বশীল সূত্রের মতে এসময়ে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাঠীর মাঠে থাকা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ হেক্টর জমির ফসলের মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর প্লাবিত হয়। যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ। ডিএইর হিসেব অনুযায়ী এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। যা মোট ফসলী জমির প্রায় ১২%। এ হিসেবে এবারের অতিবর্ষনে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজাার টন ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

ডিএই’র হিসেবে ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় মিষ্টি আলুর অবস্থানই শীর্ষে। সম্প্রতিক বর্ষনে দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলায় প্রায় ২৯ হাজার টন মিষ্টি আলুর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এর পরেই অবস্থান শাক-সবজির। এবারে ২৪ হাজার টন শাক-সবজির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলে। এছাড়া প্রায় ১৯ হাজার টন মুগডাল, ১৬ হাজার টন মরিচ, দেড় হাজার টন তিল, সারে ৫ হাজার টন সয়াবিন ও প্রায় ৭ হাজার টন চিনাবাদামের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দেড়শ টনের মত সূর্যমূখী এবং মার্চ ও এপ্রিলে দু’দফার বর্ষনে প্রায় দেড় লাখ টন তরমুজের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ্ হয়েছে। এর মধ্যে গত এপ্রিলের অতিবর্ষনে তরমুজের উৎপাদন ক্ষতির পরিমান প্রায় সাড়ে ৭ হাজার টন। এছাড়া প্রায় ৫শ’ টন বোরা ও ৪ হাজার টন স্থানীয় ও উফশী আউশ ধানের উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। মুগডাল, মিষ্টি আলু এবং তিল, সয়াবিন ও চিনাবাদামের মত তেল বীজের ক্ষতি বাজারে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। শুধুমাত্র তেল বীজের উপদান ক্ষতির পরিমানই প্রায় ১৫ হাজার টন। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন চরাঞ্চলে প্রতিবছর বিপুল পরিমান সয়াবিন তেল বীজের আবাদ ও উৎপাদন হয়ে থাকে। যা দেশের বিভিন্ন পোল্ট্রী ফিড-এর পুষ্টিকর খাবার উপাদান হিসেব ব্যবহ্রত হয়। কিন্তু প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন সয়াবিন-এর উৎপাদন ক্ষতি এ অঞ্চলের কৃষকদের অনেকটাই সর্বশান্ত করে দিচ্ছে।

গত এপ্রিলে দ্বিতীয় দফার অতিবর্ষনে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে ভোলাতে প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর, পটুয়াখালীতে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর, বরগুনাতে ১৫ হাজার হেক্টর, বরিশালে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর, পিরোজপুরে ২৭০ হেক্টর ও ঝালকাঠীতে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল কমবেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কৃষিবীদদের মতে, এবার এমন সময়ে ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হল যে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য আপাতত নতুন করে আবাদও সম্ভব হচ্ছে না। এ অঞ্চলের কৃষকদের আমন আবাদের জন্য আরো দুমাস অপেক্ষা করতে হবে। বীজতলা তৈরীর কাজ শুরু হবে আরো মাস দেড়েক পরে। ভাটির অপেক্ষাকৃত নিচু অঞ্চল বিধায় আমন ও বোরো সহ সব ফসল আবাদেই কিছুটা বিলম্ব ঘটে থাকে। ইতোমধ্যে ৩০ ভাগ বোরো কর্তন সম্পন্ন হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলে। দক্ষিণাঞ্চলের মাঠে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া বোরো ও আউশ ধানকে এখন যক্ষের ধনের মত আগলে রাখছেন কৃষিযোদ্ধাগন।