দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা কোরবানীর পশুর চামড়া কিনে বিপাকে

জুবায়ের হোসেন ॥ বরাবরের ন্যায় এ বছরও দক্ষিণাঞ্চলের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা কোরবানীর পশুর চামড়া কিনে বিপাকে পরেছে। অভিভাবকহীন এই ব্যবসায় নেমে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও লাখ টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। ট্যানারী মালিকদের ধার্যকৃত মূল্যে চামড়া কিনে প্রক্রিয়াজাত করনে লবন ব্যাবসাইদের সিন্ডিকেটের শিকার হয়ে এবছরের ব্যবসা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বেশ খারাপ অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। অন্যদিকে অবস্থ্রা উত্তরনে এই ব্যবসার অভিভাবক খ্যাত ট্যানারী মালিকদের কাছ থেকে কোন ধরনের সহায়তা না পেয়ে অবস্থা শোচনীয়তার পর্যায়ে চলে গেছে বলে মন্ত্যব্য তাদের। সহায়তা তো দূরের কথা ট্যানারী মালিকদের কাছে নিয়মিত ব্যবসার বাকী টাকাই এখন তাদের মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোরবানীর পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও বিক্রয়কারী নগরীর পদ্মাবতি এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এবছর ট্যানারী মালিক এ্যাসোসিয়েশন কোরবানীর পশুর চামড়ার প্রতি বর্গফূট মূল্য নির্ধারন করে দেয় ঢাকার মধ্যে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০ টাকা করে। নগরীর পদ্মাবতি এলাকায় ৭/৮ জন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী রয়েছে। গরু ছাগল মিলিয়ে এবছর কোরবানির পর নগরী থেকে ১৮-২০ হাজার পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছে তারা। পুরো দক্ষিণাঞ্চলের এই সংগ্রহ হবে ৫০ হাজারের অধিক বলে জানায় তারা। ট্যানারী মালিকদের নির্ধারিত মূল্যকে মাথায় রেখে বাজেটের মধ্যেই নগরী সহ আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে চামড়া সংগ্রহ করেছেন। সেক্ষেত্রেও পরতে হয়েছে চোরাই পথে চামড়া বিক্রির সিন্ডিকেটের নিয়োগকৃত প্রতিনিধিদের সৃষ্ট বিড়ম্বনার মুখে। কিছু কিছু স্থানে তাদের কারনে নির্ধারিত মূল্যের অনেকটা বেশি দিয়েই ক্রয় করতে হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। তবে ভোগান্তি সেখানেই শেষ হয়নি, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করনের অপরিহার্য উপকরন লবনের দাম গত বছরের তুলনায় তিনগুন বৃদ্ধি পাওয়াতে প্রক্রিয়াজাত করনের খরচ মিলিয়ে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ট্যানারী মালিকদের নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় ২০ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় চলে এসেছে। এখন এই দামে চামড়া বিক্রি এক রকমের অসম্ভব জানিয়ে নিশ্চিত ক্ষতির কথা জানিয়েছেন তারা। দাদনহীন ব্যবসা করে এবং পূর্বের বকেয়া টাকার বোঝা মাথায় নিয়ে তারা জানিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের কাঁচা চামড়ার ব্যবসার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা। অন্যদিকে তাদের ক্ষতি হলেও কালোবাজারিদের কেনা চামড়া ঠিকই নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ভারতসহ বিভিন্ন স্থানে পাচার হয়ে কোটি টাকায় কেনা বেচার পর অসাধুরা লাভবান হবে বলেও জানিয়েছে তারা। এ বিষয়ে বরিশাল কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী এ্যাসোসিয়েশন এর সহ-সাধারন সম্পাদক জিল্লুর রহমান মাসুমের সাথে আলাপ কালে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কম থাকায় এবছর এমনিতেই ব্যবসায় ক্ষেত্রে মন্দাভাব চলছে। এছাড়া লবন ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের শিকার হয়ে এবছর ব্যবসা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক খারাপ বলেন তিনি। ঢাকার ট্যানারী মালিকরা চামড়ার চড়া মূল্য নির্ধারন করে দিলেও দাদন দিয়ে সহায়তা করছেন না বেশ কয়েক বছর ধরে। দাদন দেয়া তো দুরের কথা বছরের অন্যান্য সময় তাদের কাছে বিক্রয়কৃত চামড়ার বকেয়া টাকা পর্যন্ত এখনও পরিশোধ করেনি কেউই। ট্যানারী মালিকরা চামড়া ক্রয়ের জন্য সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋন পেলেও তা কখনই তাদের হাতে এসে পৌঁছায় না বলেন জিল্লুর রহমান মাসুম। এজন্য ক্ষতিতে থেকেও নিজেদের অর্থসংস্থানেই তাদের চামড়ার ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে এবছর সংগৃহিত পশুর চামড়া ট্যানারী মালিকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ২/৩ সপ্তাহ সময় লাগবে। কাঁচা চামড়া দ্রুত পচনশীল হওয়ায় এর প্রক্রিয়াজাতকরন অতি জরুরি একটি বিষয়। আর চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরনের জন্য অপরিহার্য লবন এবার হয়েছে মহা সমস্যার একটি বিষয়। গত বছর নগরীর বিভিন্ন লবন বিক্রেতারা প্রতি বস্তা লবন বিক্রয় করেছে ৬০০ টাকায় যা এবার তারা সিন্ডিকেট করে বৃদ্ধি করে তুলেছে বস্তা প্রতি ১৮০০ টাকায়। চামড়া পচনের হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে তিন গুন বেশি মূল্য দিয়ে লবন কিনতে হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রক্রিয়াজাতকরনের বর্ধিত এই খরচের কারনেই নির্ধারিত মূল্য বর্গফুটে বেড়েছে ২০ টাকা করে। নগরীর লবনের কিছু ডিলারদের সরকার কর্তৃক এল সি দেয়া হয়েছিল। সেই অনুসারে লবনের প্রতি বস্তা মূল্য ৭০০-৮০০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও এর কোন সুফল ভোগ করতে পারেনি চামরা ব্যাবসারীরা বলেও জানান তিনি। সব মিলিয়ে অতিরিক্ত খরচ করে নিশ্চিত ক্ষতির সম্মুখিন হওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা নিয়ে এখন সংরক্ষিত চামড়া বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানান বরিশাল কাঁচা চামড়া ব্যাবসায়ী এ্যসোসিয়েশন এর সহ-সাধারন সম্পাদক জিল্লুর রহমান মাসুম। এমন অবস্থা বিগত কয়েক বছরের যা ক্রমান্বয়ে আরও খারাপ হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন ক্ষতির এমন ব্যবসা চলতে থাকলে কাঁচা চামড়ার ব্যবসা করা তাদের মত ব্যবসায়ীরা ধার দেনায় জর্জরিত হয়ে একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবেন। একই সাথে সংকট এড়াতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তারা।