দক্ষিণাঞ্চলের খাদ্য অধিদপ্তরেও নিন্মমানের গম

মিজানুর রহমান রনি॥ নিন্মমানের গম সরবারাহ করায় গত এক মাস ধরে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ওএমএস এর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ রয়েছে। বিভাগের প্রত্যেক উপজেলায় অবস্থিত এলএসডি থেকে জেলা প্রশাসনের নির্বার্হী ম্যাজিস্টেটরা ব্রাজিল থেকে আমদানী করা ‘জীরা’ গমের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। ইতোমধ্যে বরিশালের বিভিন্ন সরকারী দপ্তর থেকে রেশনে ভালো মানের গম সরবরাহের জন্য জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাছে চিঠি দিয়েছেন। বিভাগীয় খাদ্য নিয়ন্ত্রক দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাসে সরকার ব্রাজিল থেকে দুই লাখ মেট্রিকটন গম আমদানী করেছেন। যা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতে সরবারাহ করা হয়। সোমবার পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় বর্তমানে মোট ১৪ হাজার ৯৯৮ মেট্রিক টন ’জীরা’ গম মজুদ রয়েছে। এরমধ্যে বরিশাল জেলায় রয়েছে ২ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন, ঝালকাঠীতে ৯’শ ৬৩ মেট্রিক টন, পিরোজপুরে ২ হাজার ৫৬৫ মেট্রিক টন, ভোলায় ২ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন, পটুয়াখালিতে ২ হাজার ৪৪৮ মেট্রিক টন এবং বরগুনায় ৩ হাজার ৭৯৭ মেট্রিক টন। ভোক্তারা জানান, চলতি বছরে ব্রাজিল থেকে যে গম আমদানী করা হয়েছে তার মান অত্যন্ত নিম্মমানের। এটির আকার সরু হওয়ায় ‘জীরা’ গম নামে পরিচিত। যা ব্রাজিলে এ্যানিম্যাল ফুড (গো-খাদ্য) হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে তারা শুনেছেন। ওই গম থেকে উৎপাদিত আটা গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে। ফলে ওএমএস ডিলারা ওই গম থেকে উৎপাদিত আটা গ্রহন করছেন না। অপরদিকে বিভিন্ন সরকারী দপ্তরও ওই গম গ্রহনে আপত্তি জানাচ্ছে। এছাড়া খাদ্য বিভাগের তালিকাভুক্ত মিল মালিকরাও ওই গম থেকে আটা উৎপাদন করতে চাইছেন না। সূত্রমতে, বরিশাল সিটি করপোরেশন ও জেলা মিলে ১৪ জনসহ অন্য পাঁচ জেলায় ৯ জন করে সর্বমোট ৫৯ জন ওএমএস ডিলার রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রতিদিন এক মেট্রিকটন করে গম ওএমএস এর মাধ্যমে বিক্রীর জন্য দেওয়া হয়। সেই হিসেবে প্রতিদিন বরিশাল বিভাগে ৫৯ টন গম বিতরণের কথা। আর এ থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ছয় হাজার দরিদ্র মানুষ উপকৃত হতো। কিন্তু ব্রাজিলের ’জীরা’ গম থেকে নিন্মমানের আটা উৎপাদন হওয়ায় ওএমএস ডিলারসহ বিভিন্ন সরকারী দপ্তর রেশনের জন্য ওই গম গ্রহন করতে চাচ্ছেন না। সিটি করপোরেশনের ওএসএম ডিলার সোহেল রানা বলেন, বর্তমানে খাদ্য অধিদপ্তর থেকে যে আটা বিতরণ করা হচ্ছে তার মান এতোই নিন্মমানের যে নিন্ম আয়ের মানুষও সেই আটা ক্রয় করছেন না। যার জন্য প্রতিদিন দেওয়া একটন (এক হাজার কেজি) আটার মধ্যে দুই কুইন্টাল (দুইশত কেজি) আটা বিক্রী হয় না। তাই বেশীর ভাগ ডিলাররা ওএসএম এর আটা বিক্রী বন্ধ রেখেছে। ভোলা জেলার খাদ্য বিভাগের তালিকাভূক্ত মিল মালিক মো. জামান হোসেন বলেন, খাদ্য বিভাগের সাথে চুক্তি অনুযায়ী এক কেজি গম থেকে ৮৫০ গ্রাম আটা দেওয়ার কথা রয়েছে। বাকী ১৫০ গ্রাম ভূষি হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে যে গমটি দেওয়া হচ্ছে সেটি দিয়ে ৬৫০ গ্রামের বেশী আটা দেওয়া যায় না। এছাড়া গম থেকে আটা উৎপাদনের জন্য মেশিনে যে চালনী রয়েছে তার চেয়ে গমের আকার ছোট। তাই গম থেকে আটা উৎপাদন করতে গেলে চালনীর ফাঁকা থেকে গম পরে যায়। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমান অনেক বেশী হয়। পিরোজপুর জেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন ধরে ওএসএম কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কি কারনে বন্ধ রয়েছে তা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা। সূত্রে আরও জানা গেছে, ক্যাডেট কলেজ, বিভাগের কারাগারগুলো, র‌্যাব, রির্জাভ ফোর্স, পুলিশ ব্যাটালিয়ান, এপিবিএন, পুলিশ বিভাগের বিভিন্ন দপ্তর, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় রেশনের গম ও আটা খাদ্য অধিদপ্তর থেকে সরবরাহ করা হয়। এসব সরকারি দপ্তরও রেশনের জন্য ওই গম গ্রহন করতে চাচ্ছে না বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেট্রোপলিটন পুলিশের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, চলতি বছরে খাদ্য অধিদপ্তর থেকে যে গম সরবারাহ করা হচ্ছে তার মান অত্যন্ত খারাপ। রেশনের জন্য বিতরণকৃত ওই গম পুলিশ সদস্যরা নিতে চাইছেন না। তাই পুলিশ বিভাগে ভালো মানের গম সরবারাহের জন্য জেলা খাদ্য অধিদপ্তরকে ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে বরিশালের বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল আলম বলেন, চলতি মাসের প্রথমভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের গমের নমুনা সংগ্রহের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রির কার্যালয় থেকে ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গমের নমুনা সংগ্রহের জন্য চিঠি পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা উপজেলাগুলোতে অবস্থিত এলএসডি গোডাউন থেকে গম সংগ্রহ করে জেলা সদরে পাঠিয়েছেন। ১০টি উপজেলার প্রতিবেদন একত্রিত করে প্রধানমন্ত্রির দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এভাবে বরিশাল বিভাগের ৪১টি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সহায়তায় উপজেলাগুলোর এলএসডি গোডাউনে থাকা ব্রাজিল থেকে আমাদনীকৃত ’জীরা’ গমের নমুনা সংগ্রহ করে স্ব-স্ব জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রির দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে। জেলার উজিরপুর উপজেলার নির্বার্হী অফিসার মো. সোহরাব হোসেন বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরে গোডাউনে মজুদ থাকা গম সংগ্রহ করেছি। সংগ্রহীত গমের মান এতোই নিন্মমানের যে, যা আগে কখানো দেখিনি। গমটির আকার অত্যন্ত সরু। দূগন্ধযুক্ত গমের বস্তায় ধূলি কণার পরিমানও বেশী। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার নির্বার্হী কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা বলেন, গমগুলো ছিল পোকায় খাওয়া, কালো ও ক্ষুদ্র আকৃতির। ভাঙা গমের পরিমাণও ছিল অনেক বেশি। বরিশালের বিদায়ী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মিজানুর রহমান জানান, প্রত্যেক জেলা প্রশাসকদের নির্বার্হী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ব্রাজিল থেকে আমদানীকৃত গমের নমুনা সংগ্রহ করার জন্য প্রধানমন্ত্রির দপ্তর থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর একটি অনুলিপি জেলা খাদ্য অধিদপ্তরেও পাঠানো হয়েছে। বরিশাল আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আমজাদ হোসেনে বলেন, সরকারীভাবে বিদেশ থেকে যেকোন গম ও চাল আমদানীর সময়ে তার মান পরীক্ষা করে আনা হয়। চলতি বছরে ব্রাজিল থেকে আনা গমের আকার কিছুটা সরু। এনিয়ে অভিযোগ উঠলে জেলা ও উপজেলাগুলোর গোডাউনে রক্ষিত ব্রাজিল থেকে আমদানী করা গমের নমুনা ঢাকায় পাঠানোর জন্য নিদের্শ দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী আমরা নমুনা সংগ্রহ করে গত রবিবার তা খাদ্য অধিদপ্তরে জমা দিয়েছি।