তিন স্বজনকে জামিনে মুক্তি শেবাচিমে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের তান্ডবে ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ হামলা এবং ভাংচুরের অজুহাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবারো তান্ডব চালিয়েছে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। আন্দোলনের নামে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা হাসপাতালের জরুরী বিভাগে তালা ঝুলিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় তারা। এতে করে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয় দূর দুরান্ত থেকে আসা বিভিন্ন পর্যায়ের রোগী এবং তাদের স্বজনদের। এসময় বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে গুরুতর অসুস্থ এক রোগীর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ হস্তক্ষেপ করলে তাদের সাথেও অসৌজন্যমূলক আচরণ করে অপ্রতিরোধ্য শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা।
এদিকে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের বারবার হামলার শিকার হয়েও বিচার পায়নি অবহেলায় মৃত্যু হওয়া প্রসুতী রিনা বেগম’র মা এবং ভাই-দেবর। উল্টো শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের রোষানলে পড়ে স্বজনহারাদের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন তারা। যে কারনে সাধারণ রোগী এবং তাদের স্বজনদের মাঝে ব্যাপক উত্তেজনা এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঘটনার কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে বিশেষ বিবেচনায় আদালত মানবিক কারনে জামিনে মুক্ত করে দিয়েছেন তাদের। পাশাপাশি কথায় কথায় শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের জরুরী বিভাগের গেট আটকে এমন ধর্মঘটের প্রতি তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
হাসপাতালের জরুরী বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া সদর এলাকার বাসিন্দা সাইদুল মোল্লার স্ত্রী রিনা বেগম (২০)। তাকে মঠবাড়িয়া উপজেলার একটি ক্লিনিকে সিজারিয়ান করে একটি সন্তান প্রসব করানো হয়। তবে প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ জনিত সমস্যার কারনে ৬ অক্টোবর রাতে তাকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের প্রসুতি ইউনিট-১ এর অধিনে ভর্তি করা হয়। তবে তার শারীরিক অবস্থা ভালো ছিলো না।
রিনা বেগম’র ভাই মোস্তাফিজুর রহমান জনান, গত বুধবার রাতে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় গাইনী পেয়িং বেডে চিকিৎসাধিন তার বোনের শারীরিক অবস্থার অবনতী ঘটে। এসময় রিনার প্রচন্ড শ^াস কষ্ট হচ্ছিলো। তাৎক্ষনিকভাবে বিষয়টি তিনি তৃতীয় তলায় চেম্বারে থাকা ইন্টার্নি চিকিৎসকদের জানান। পর পর চার বার চিকিৎকদের ডাকা হলেও তারা কোন প্রকার গুরুত্ব দেয়নি। পরবর্তীতে ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্সদের বিষয়টি অবহিত করা হলে তারাও অক্সিজেন সংকটের অজুহাত দেখিয়ে স্বজনদের ফিরিয়ে দেয়। এর কিছুক্ষন পর ভোর রাত সাড়ে ৫টার দিকে এক চিকিৎসক এসে রোগীকে মৃত ঘোষনা করে। এ নিয়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক এবং নার্সের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। পরে চিকিৎসক এবং নার্সরা চলে যান।
মোস্তফা জানান, এর কিছুক্ষন পর সংঘবদ্ধ হয়ে ইন্টার্নি চিকিৎসকরা গাইনী পেয়িং বেডে এসে স্বজনদের উপর হামলা চালায়। এসময় তারা মৃত রিনার মা হাসিনা বেগম, ভাই মোস্তফাফিজুর রহমান এবং দেবর প্রকৌশলী জাকারীয়া হোসেনকে একটি রুমের মধ্যে আটকে রেখে নির্মম ভাবে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। পরবর্তীতে তাদের ধরে নিয়ে জরুরী বিভাগের সোয়াইন ফ্লু ওয়ার্ডে তালাবদ্ধ করে রাখে। সেই সাথে লাশটিও লাশ ঘরে আটকে রাখে বলে অভিযোগ করেন মোস্তফা। পাশাপাশি জরুরী বিভাগের দুটি গেটে তালা ঝুলিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ করে পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে।
শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ডা. মোসাদ্দেক হোসেন জানান, রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনরা অহেতুক শিক্ষানবিশ চিকিৎসক এবং নার্সদের উপর হামলা চালায়। এসময় তারা ডা. ফাহাব মোহাম্মদ মাহিয়ান, ডাঃ শিহাব উদ্দিন এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স মমতাজ বেগমকে মারধর ছাড়াও পেয়িং ওয়ার্ডে ভাংচুর করে। এর প্রতিবাদে এবং দোষিদের শাস্তির দাবীতে তারা শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা ধর্মঘট এবং জরুরী বিভাগে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেন বলে জানিয়েছেন মোসাদ্দেক।
কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাখাওয়াত হোসেন জানান, চিকিৎসক এবং নার্সদের উপর হামলার প্রতিবাদে সকাল পৌনে ৯টা থেকে জরুরী বিভাগে তালা দিয়ে ধর্মঘট এবং বিক্ষোভ করে ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। পরবর্তীতে মারধর করে জরুরী বিভাগে আটকে রাখা মৃত রিনা’র মা, ভাই এবং দেবরকে আটক করলে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ধর্মঘট তুলে নেয় তারা। একই সাথে জরুরী বিভাগের গেট খুলে দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা হয়।
ওসি জানান, হাসপাতালে ভাংচুর এবং চিকিৎসক ও নার্সের উপর হামলার ঘটনায় হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. শহীদুল ইসলাম বাদি হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। ঐ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আটককৃতদের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছেন। তবে পরবর্তীতে মানবিক কারনে আদালত থেকে মৃত রিনার মা এবং ভাই সহ তিনজনকে জামিনে মুক্তি দেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক রফিকুল ইসলাম।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. শহীদুল ইসলাম জানান, রোগীটির অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিলো। তার রক্তক্ষরণ ছাড়াও রক্ত শুণ্যতা ও হার্টে সমস্যা ছিলো। তাছাড়া হৃদ যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়েই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসক অথবা নার্সদের কোন অবহেলা নেই। মৃত’র স্বজনরা অযথাই চিকিৎসক এবং নার্সদের মারধর করেছে। এছাড়া সরকারী মালামাল ক্ষতিসাধনের অপরাধেই তারা থানায় মামলা দায়ের করেছেন। তবে মৃত ব্যক্তির স্বজনরা অভিযোগ দিলে এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।