তাপদাহে পুড়ছে দক্ষিণাঞ্চল আরো বাড়ার শংকা

রুবেল খান ॥ চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ তাপমাত্র ছিলো গতকাল মঙ্গলবার। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তামাত্রা ছিলো ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ। এমন পরিস্থিতি আগামী দেড় মাস থাকার পাশাপাশি তাপমাত্রা আরো কয়েক গুন বৃদ্ধি পাবে। এমনটিই জানিয়েছেন নগরীতে আবহাওয়া দপ্তরের পর্যবেক্ষক। তাই শেষ চৈত্রের প্রচন্ড খড়তাপে পুড়ছে গোটা দক্ষিণাঞ্চল। তাপমাত্রার উর্ধ্বগতির সাথে ভ্যাপসা গরম এবং বিদ্যুৎ এর লুকোচুরি খেলায় অতিষ্ঠ করে তুলেছে জনজীবন। এমনকি মাটি ফাটা রোদের তীব্রতায় হাপিয়ে উঠেছে প্রাণীকুলও।
আবহাওয়া দপ্তরের বার্তায় জানা গেছে, গত কদিন ধরে সূর্যের পারদ নিচে নেমে আসায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে। দপ্তরের উচ্চ পর্যবেক্ষক প্রনব কুমার রায় বলেন, বৃষ্টি না থাকায় রোদের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত তাপমাত্রা আবারো বৃদ্ধি পাবে। এবারের তাপমাত্রা ইতিপূর্বের রেকর্ড অতিক্রম করতে পারে বলেও ধারনা করছেন তিনি।
উচ্চ পর্যবেক্ষক আরো বলেন, চলতি মৌসুমে মঙ্গলবার ছিল সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এছাড়া সন্ধ্যা পর্যন্ত সর্বনি¤œ ২৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ।
তিনি বলেন, আগামী দেড় মাসে তাপমাত্রা কমার তেমন সম্ভাবনা নেই। তবে বৃষ্টি অথবা কালবৈশাখী ঝড় হলে তাপমাত্রা কিছুটা কমবে। অবশ্য তা দু’একদিনের বেশি স্থায়িত্ব পাবে না বলেও আওয়ামী পর্যবেক্ষক জানিয়েছেন।
এদিকে চৈত্রের কড়তাপের কারনে অসস্থি নেমে এসেছে দক্ষিণাঞ্চলের জনজীবনে। রোদের তাপেদাহের কারনে সাধারন মানুষ গৃহবন্ধি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া দিন মজুর, রিক্সা, ভান চালক এবং মাটি কাটা ও অন্যান্য শ্রমিকরা গড়মে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। যে কারনে তাদের কর্মক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে অসহ্য ভোগান্তি।
অপরদিকে চৈত্রের এই তাপদাহের মধ্যে আরেক অশান্তির কারন হয়ে দাড়িয়েছে লোড শেডিং ছাড়াও প্রতিদিন আসা যাওয়া।
নগরীর কাউনিয়া থানাধিন ভাটিখানার বাসিন্দা শাহ মুনির জানান, কোন কারন ছাড়াই প্রতিদিন গড়ে ৩/৪ বার বিদ্যুৎ আসা যাওয়া করছে। বিদ্যুৎ গেলে প্রতিবার কম করে হলেও এক ঘন্টা স্থায়ীত্ব পায়। বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে যোগাযোগ করা হলে লোড শেডিং দোহাই দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন শাহ মুনির।
প্রচন্ড গরমে অফিস পাড়ায় কর্মচাঞ্চলতায় অনেকটা ধীরগতি চলে এসেছে। অফিস পাড়ার কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা গরমে স্বস্তি পেতে ছুটছেন নদীর পাড় কিংবা গাছের ছায়াতে।
প্রচন্ড গরমের কারনে হাসপাতালে ডায়রিয়া এবং চুলকানি রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। রাস্তার পাশে সরবত, কোমল পানীয়সহ নানা পানি জাতীয় খাবার খেয়ে বিষক্রিয়ায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।
ঘামের কারনে ঘামাচির সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া হিট ষ্ট্রোকের ঝুকিতেও রয়েছেন প্রবীনরা।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ভাস্কর সাহা বলেন, গরমে হিটস্টোক বেড়ে থাকে। তবে আমরা এখন পর্যন্ত এ ধরনের রোগী পাইনি।
তিনি বলেন, গরমে বৃদ্ধদের একটু সতর্ক থাকা উচিৎ। প্রখর রোদের মধ্যে ঘাম ঝড়িয়ে কাজ করা কিংনা অস্বাস্থ্যকর খাবার না খেলে হিটস্ট্রোক এবং অন্যান্য রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
মেডিকেল কলেজের শিশু বিশেষজ্ঞ এবং সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম. আর তালুকদার মুজিব বলেন, গরমে শিশুদের প্রতি বেশি যতœ নিতে হবে। রাস্তার পাশে কিংবা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানো যাবে না। তাদের ঠান্ডা এবং শুস্ক স্থানে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ভেজা কাপড় কিংবা নোংরা কাপড় পরিধান থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে করে শিশু ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে।
চর্ম রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিপ্লব কুমার দাস বলেন, গরমে ঘামের কারনে মানুষের শরীরে ব্যাক্টেরিয়ার আক্রম ঘটে। এতে করে ডায়রিয়া এবং আমাশয় পাশাপাশি চুলকানি বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে এলার্জির সমস্যা আক্রান্তদের ঘাম থেকে সাবধান থাকতে হবে। এজন্য ধোয়া কাপড় পরিধান করতে হবে। প্রতিদিন এক পোশাকে না থেকে পৃথক ভাবে পোশাক পড়ার চেষ্টা করতে হবে। শরীরে ঘাম থাকলে তা শুকানোর আগেই পোশাক পরিবর্তন করে নতুন পোশাক পড়ার জন্য পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
আমাদের পিরোজপুর প্রতিবেদক জানান, টানা ৭ দিনের প্রচন্ড তাপদাহে পুড়ছে এই অঞ্চলের মানুষ। এতে করে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খরতাপের সঙ্গে যোগ হয়েছে বৃষ্টি শূন্যতা আর অসহ্য ভ্যাপসা গরম। চৈত্রের প্রখর তাপদাহে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। এতে বেশি সমস্যায় পড়েছে খেটে খাওয়া দিনমজুর, রিকশাচালক ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা। শুকিয়ে চৌচির হয়ে যাচ্ছে মাঠ-ঘাট। আবাদী ফসলের জমিতে পানির অভাবে নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার ফসল।
গত কদিন ধরে পিরোজপুর, ভা-ারিয়া, মঠবাড়িয়া, কাউখালী, নেছারাবাদ, জিয়ানগর, নাজিরপুর উপজেলার কোথাও বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া যায়নি। হাসপাতালগুলোতে গ্রীষ্মকালীন রোগে আক্রান্তদের চাপ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেড়েছে কয়েকগুন। শিশু ও বয়স্ক মানুষেরা বেশি ঝুঁকিতে আছে। বিশেষ করে ডায়রিয়া, ভাইরাস জ্বর, সর্দি-কাশি, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া, জন্ডিস, আমাশয় রোগের প্রভাব বেড়েছে।
ভান্ডারিয়া স্বাস্থ্যকম্পেলেক্সের টি.এইচ.এ ডাঃ শাহাদৎ হোসেন বলেন, তীব্র তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক ও ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় রোদে না থেকে প্রচুর পরিমাণ তরল জাতীয় খাবার খাওয়ার পাশাপাশি শতর্ক থাকতে হবে।
আমতলী প্রতিনিধি জানান, হঠাৎ করেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষের জনজীবন বিপর্যস্থ হচ্ছে। সাভাবিক কার্মকান্ড ব্যহত হচ্ছে।
আমতলীর চাওড়া এলাকার কৃষক নয়ন মিয়া বলেন, ‘গরমে শরীর পুড়ে যাওয়ার অবস্থা হচ্ছে। একটু পরপরই পানি খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় কোন কাজ ভাল লাগেনা।
আমতলী একে হাইস্কুলের ৭ম শ্রেণীর ছাত্র রনি জানান, গরমে ক্লাশ করতে আমাদের খুবই কষ্ট হয়। বার বার পানির পিপাসা লাগে। মাঝে মাঝে মাথা ঘুরে যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, গরমে শারিরীক সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য বেশী বেশী বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। লবণশূন্যতা পূরণের জন্য খাবার স্যালাইন, ডাব প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহিত ফলের রস খেতে হবে। বেশি মসলাযুক্ত ও রাস্তার খোলা খাবার এড়িয়ে যেতে হবে। যতটা সম্ভব রোদে না যাওয়া উচিত। এছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার পাশাপাশি শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে বাড়তি নজরদারী থাকতে হবে।