তদন্ত প্রতিবেদন জমা ॥ ৬ সন্তানের অবহেলার কারণে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হয়েছেন বাবুগঞ্জের সেই মা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বিনা চিকিৎসায় ও অর্ধহারে অনাহারে মৃত্যু পথযাত্রী বাবুগঞ্জের সেই বৃদ্ধা মা সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া অনুমতি দেননি। ওই ঘটনা তদন্তে বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শফিকুল ইসলাম’র গঠিত কমিটির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে। তবে প্রতিষ্ঠিত ৬ সন্তানের অবহেলায় ভিক্ষাবৃত্তি করতে গিয়ে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়ে চলাচলে অক্ষম হয়ে অমানবিক জীবনযাপন করার ঘটনা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে কমিটি। সুপারিশও করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে জমা দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বৃদ্ধার জীবন-মান উন্নয়ন এবং সন্তানদের মধ্যে জমি নিয়ে চলমান বিরোধ নিস্পত্তিসহ অন্যান্য বিষয়ে তিন সুপারিশও করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান প্রমানিক এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগমের অসুস্থতার কারনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে একটু বিলম্ব হয়েছে। সুষ্ঠু এবং নির্ভুল তদন্তের জন্য সময় নিয়েছিলেন তারা। সে অনুযায়ী বর্ধিত সময় শেষে ডিআইজি’র কাছে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের বিষয়টিও রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরা বিষয় সম্পর্কে এসপি হাবিবুর রহমান বলেন, সন্তানদের অবহেলার কারনেই তাদের সত্তরোর্ধ বয়সী বৃদ্ধা মাকে ভিক্ষা করতে হয়েছে। সন্তানরা তাদের জানিয়েছে প্রতি মাসেই নিয়মিত মায়ের জন্য টাকা পাঠাতেন। কিন্তু সেই টাকা মা পেতেন কিনা সে সম্পর্কে কোন খোঁজ খবর ছিলো না।
তিনি বলেন, টাকাটাই একটি মানুষের জীবনে সব কিছু নয়। বৃদ্ধার চিকিৎসা, সেবা, খাবার-দাবার, ভালোমন্দ সম্পর্কে খোজ রাখেনি সন্তানরা। এক কথায় সন্তানদের কাছ থেকে যে সেবা পাওয়ার সেই সেবা বঞ্চিত ছিল সে।
অভিযুক্ত সন্তানদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে কোন প্রকার সুপারিশ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বরিশাল রেঞ্জ’র পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জানান, কমিটির তিন সদস্য বৃদ্ধার বাড়ি-ঘর আত্মীয় স্বজন এবং প্রতিবেশিদের সাথেসহ বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগম’র সাথেও আমরা কথা বলেছি। এতে করে সন্তানদের অবহেলা এবং দোষ প্রমানিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সুপারিশ করা হয়নি। কারন বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগম তাকে অবহেলার জন্য সন্তানরা শাস্তি পাবে, তা চান না তিনি। তাকে এই বিষয়ে অনেকবার প্রশ্ন করা হয়েছে। কিন্তু সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার অনুমতি দেননি বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগম। তাই তার অনুমতি ছাড়া সন্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য কোন সুপারিশও করা হয়নি। তবে বৃদ্ধার জীবন-মান উন্নয়নের বিষয়ে পরবর্তীতে তাকে আর ভিক্ষাবৃত্তি করতে না হয় এবং তিনি সন্তানদের আদর ভালোবাসা এবং সেবা যতœ থেকে বঞ্ছিত না হন সে বিষয়ে পরামর্শ মুলক সুপারিশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সন্তানরা তার মায়ের ভরন-পোষন এবং তার সেবা যতœ করবেন। বিষয়টি তদারকি করবেন উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা এবং জনপ্রতিনিধিরা। সন্তানদের সাথে সমন্বয় করে সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে প্রতি মাসে তারা বরিশাল জেলার পুলিশ সুপার এর নিকট প্রতিবেদন দিবেন। সন্তানরা দায়িত্ব পালনে কোন প্রকার অবহেলা করলে তার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্যও তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে বলে পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, বাবুগঞ্জ উপজেলা ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের মৃত আইয়ুব আলী সরদারের সত্তরোর্ধ স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠিত ৬ সন্তানের জননী মনোয়ারা বেগম ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন কাটাতেন। ভিক্ষা করতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে পায়ে গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হন। তিন্তু বিনা চিকিৎসায় একটি ঘুপরি ঘরের মধ্যে অসহায় জীবন যাপন করে আসছিলেন। এ নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনার সৃষ্টি হয়। প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে বরিশাল-৩ আসনের এমপি এ্যাড. শেখ মু. টিপু সুলতান এর নির্দেশে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। সেই সাথে ওই সংসদ সদস্য বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগমের চিকিৎসা সহ যাবতীয় দায়িত্বভার গ্রহন করেন। পরবর্তীতে বরিশালের পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক এবং ডিআইজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মনোয়ারা বেগম এর খোঁজ খবর নেয়ার পাশাপাশি তাকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
এছাড়া এই ঘটনার তদন্তের জন্য গত ২১ সেপ্টেম্বর ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন বরিশাল রেঞ্জ এর ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম-পিপিএম। ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানকে কমিটির প্রধান করা হয়। কমিটি গঠনের ৬ দিনের মাথায় গতকাল মঙ্গলবার প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কমিটির কর্মকর্তারা।