ট্রাক থামিয়ে গরু নামালেই ব্যবস্থা

রুবেল খান ॥ আসন্ন ঈদ উল আযহা উপলক্ষে বরিশাল মহানগরীর পশুর হাট ইজারাদার, সিভিল প্রশাসন, চিকিৎসক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিশেষ মতবিনিময় সভা করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন (বিএমপি) পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় নগরীর পুলিশ লাইন ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএমপি কমিশনার এসএম রুহুল আমিন। এসময় তিনি বলেন, বরিশাল মহানগরী এলাকার ২১টি পশুর হাটে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকবে। প্রত্যেকটি হাটে বিএমপি পুলিশের পক্ষ থেকে একটি করে জাল নোট সনাক্তকরন মেশিন দেয়া হবে। তাছাড়া হাটগুলোতে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসিয়ে বেপারী, পাইকার এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের জান মালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে। বিএমপি কমিশনার এসএম রুহুল আমিন আরো বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান হতে ট্রাক যোগে কোরবানীর পশু বিক্রির উদ্দেশ্যে বরিশালে নিয়ে আসবে সংশ্লিষ্টরা। তারা যে হাটে মনে চাইবে সেই হাটে ট্রাকের পশু নামাবে। এতে কোন হাটের ইজারাদার কিংবা সংশ্লিষ্টরা বাধা দিতে পারবে না। কারোর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পেলে হাটের ইজারাদার সহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট হাটের ইজারা বাতিল করা হবে বলে হুশিয়ার করেন তিনি। এর পাশাপাশি পশুর হাটে অজ্ঞান এবং মলম পার্টির দৌরাত্ম্য প্রতিহত করতে সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ভ্রাম্যমান হাকাররাই অজ্ঞান এবং মলম পার্টি সেজে ঘোরা ফেরা করে। তাই পশুর হাটে যাতে করে ভ্রাম্যমান হকার প্রবেশ না করতে পারে পারে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। তাছাড়া হাটে পশু বেচা-কেনা হাটের মধ্যে করার পাশাপাশি ইজারাদারদের পক্ষ থেকে হাট গুলোতে অজ্ঞান এবং মলম পার্টি সহ প্রতারকদের বিরুদ্ধে মাইকিং এর মাধ্যমে সতর্কতা মূলক প্রচারনা চালাবার নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।
তিনি বলেন, বিসিসি এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের নীতিমালা অবলম্বন করে পশুর হাট বসাতে হবে। এ ক্ষেত্রে সড়ক এবং মহাসড়ক থেকে নির্ধারিত ২শ ফুট দুরে হাট বসাতে হবে। প্রত্যেকটি হাটে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সম্ভব হলে সিসি ক্যামেরা এবং জেনারেটর এর ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রত্যেকটি হাটে গরুর খাজনা আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকতে হবে। হাটে খাজনার সুনির্দিষ্ট টাকা এবং পার্সেন্টেজের অংশ স্পস্ট ভাবে উল্লেখ করে টানিয়ে রাখতে হবে। যাতে করে ক্রেতাদের খাজনা দিতে সমস্য না হয়। তাছাড়া অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের অভিযোগ এবং খাজনার রশিদ না দিলে সংশ্লিষ্ট হাট ইজারাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে পুলিশ কমিশনার হুশিয়ার করেছেন।
সভাপতির বক্তৃতায় পূর্বে বিএমপি পুলিশের পক্ষ থেকে কোরবানী উপলক্ষে গৃহীত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন সহকারী কমিশনার (ফোর্স)। এসময় তিনি জানিয়েছেন, বরিশাল মহানগরী এলাকায় এবার মোট ২১ হাট বসবে। কিন্তু গত বছর এর সংখ্যা ছিলো ২৮টি। এ বছর ২১টি হাটের মধ্যে কোতয়ালী মডেল থানা এলাকায় ৬টি, বন্দর থানা এলাকায় ২টি, কাউনিয়া থানা এলাকায় ৫টি এবং সর্বচ্চ ৮টি গরুর হাট রয়েছে এয়ারপোর্ট থানা এলাকায়। মোট হাটের মধ্যে বিসিসি’র ৩০টি ওয়ার্ডে স্থায়ী এবং অস্থায়ী মিলিয়ে হাট সংখ্যা ৯টি।
তিনি জানান, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের নিটক ১৬টি জাল নোট সনাক্ত করন মেশিন থাকলেও এর মধ্যে একটি বিকল অবস্থায় রয়েছে। তাই ১৫টির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আরো ১০টি জাল নোট সনাক্তকরন মেশিন মিলিয়ে মোট ২৫টি মেশিন মহানগরীর হাট গুলোতে স্থাপন করা হবে।
পশুর হাট চলাকালে মেট্রোপলিটন পুলিশেল ডিউটি সংখ্যা থাকবে ১৩৫টি। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ঈদের জামাত হবে ৯টি। নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকবে ৮২৯ অফিসার-ফোর্স। এর মধ্যে পুরুষ থাকবে ৭৮৯ এবং নারী পুলিশের সংখ্যা ৪০ জন। এরা নিয়মিত আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।
এদিকে বরিশাল র‌্যাব-৮ এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঈদ উপলক্ষে মহানগরী এলাকায় ২টি টহল টিম নিয়মিত দায়িত্ব পালন করবে। তবে যেহেতু হাটের সংখ্যা বেশি তাই টহল টিমের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য র‌্যাব কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানান পুলিশ কমিশনার।
এদিকে মতবিনিময় সভায় হাটের ইজারাদার, প্রানি সম্পদ কর্মকর্তা, বিসিসি কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ড্রাগ প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, ডিজিএফআই, এনএসআই সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঈদ উপলক্ষে তাদের পক্ষ থেকে করনীয় এবং প্রস্তুতির বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করেন। তবে আলোচনায় বেশিরভাগ প্রাধান্য পায় অজ্ঞান, মলম পার্টি এবং প্রতারক চক্র। এদের হাত থেকে রক্ষা পেতে নানা দিক নির্দেশনা দেয়া হয় মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে। তাছাড়া সভা শুরুর পূর্বে বিএমপি পুলিশের পক্ষ থেকে অজ্ঞান এবং মলম পার্টির বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে প্রজেক্টরে একটি ডকুমেন্টরী প্রদর্শন করা হয়।
উন্মুক্ত আলোচনায় প্রানি সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি বলেন, সাধারনত কোরবানীর হাটেই পশু-মোটা তাজা করন ওষুধ খাওয়ানো হয়। কারন মোটা তাজা করন ওষুধ খাওয়ানোর ৪/৫ দিনের মধ্যে পশুটি মারা যেতে পারে। হাটে যাতে কৃত্তিম উপায়ে পশু মোটা তাজা করতে না পারে সে বিষয়টি মনিটরিং করার জন্য প্রানি সম্পদ বিভাগ থেকে ৬টি টিম থাকবে। যা মহানগর এবং জেলা পর্যায়ের হাট গুলোতে মনিটরিং করে কৃত্তিম উপায়ে মোটা তাজা করা এবং রোগাক্রান্ত পশু চিহ্নিত করা হবে। প্রানি সম্পদ দপ্তরের পাশাপাশি বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৯টি হাটে এবিষয়ে মনিটরিং করবে বিসিসি’র স্বাস্থ্য বিভাগের টিম।
কৃত্তিম উপায়ে পশু মোটা তাজা করা পশু চেনার কয়েকটি প্রাথমিক লক্ষন উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পশুর গায়ে চাপ দিয়ে দেখতে হবে যে চাপ দেয়ার পর পশুর চামরা দেবে যায় কিনা। এছাড়া যে ঠিক ভাবে খায় না এবং বসে ঝিমুতে থাকে এসব পশু কেনার পূর্বে ভালো ভাবে যাচাই করে নেয়ার পরামর্শ দেন প্রানি সম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা।
এদিকে বিসিসি’র প্রতিনিধিরা জানান,
নির্ধারিত স্থানে পশু জবাই করনে নগরবাসীকে উদ্ভুদ্ধ করনের লক্ষ্যে মাইকিং এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্তত পক্ষে কোরবানীর দু’দিন পূর্বে থেকে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মাইকিং করা হবে। তাছাড়া কোরবানীর দিন পশু জবাই এর পরে ১২ থেকে সর্বচ্চ ২৪ ঘন্টার মধ্যে পশুর বর্জ্য অপসারনে বিসিসি’র ৫শতাধীক পরিচ্ছন্নতা কর্মী কাজ করবে। এজন্য নির্ধারিত স্থানের বাইরে কেউ পশু কোরবানী দিয়ে থাকলে তা বিসিসি’র সংশ্লিষ্ট শাখাকে অবহিত করে বর্জ্য অপসারনের অনুরোধ জানানো হয়েছে বিসিসি থেকে।
বরিশাল জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি বলেছেন, কোরবানীতে জনগনেন নিরাপত্তা এবং অপরাধ প্রবনতা প্রতিরোধে নগরী সহ বরিশাল জেলার প্রত্যেকটি উপজেলায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বাস এবং নৌ বন্দরেও এরা দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া ঈদের ছুটির মধ্যেও বিশেষ প্রয়োজনে মোবাইল কোট পরিচালনা করবে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটগন।
ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পশু মোটা তাজা করনের লক্ষে এক প্রকারের ইন্ডিয়ান ওষুধ ফার্মেসীতে পাওয়া যায়। এই ওষুধ পশু এমনকি মানব দেহের জন্যও ক্ষতিকর। এগুলোর বেচা বিক্রি বন্ধে ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং এবং অভিযান চালানো হয়েছে। তবে পুলিশ কমিশনার তাদের মনিটরিং ব্যবস্থা ঈদের পূর্বে পর্যন্ত আরো জোরদার করার আহ্বান জানান। এজন্য পুলিশ সহযোগিতা করবে বলেও আশ্বস্থ করেন।
বরিশাল সিভিল সার্জন এর প্রতিনিধি জানান, ঈদে ঘর মুখোযাত্রীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ৬টি কমিটি করা হয়েছে। এরা নদী বন্দর এবং বাস টার্মিনাল সহ সংশ্লিষ্ট স্থান সমুহে দায়িত্ব পালন করবে। সিভিল সার্জন এবং বিআইডব্লিউটিএ’র চিকিৎসকদের সমন্বয়ে এই মেডিকেল টিম গঠন করা হয়। ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সন্ধ্যায় এবং ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাতে এই টিম কাজ করবে। তবে বিএমপি কমিশনার এসএম রুহুল আমিন রাত্রিকালিন চিকিৎসা ব্যবস্থা ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরুর পাশাপাশি ভোর রাতে যখন লঞ্চ গুলো বরিশালে আসে তখন মেডিকেল টিমকে কাজ করার আহ্বান জানান। এমনকি এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সিভিল সার্জন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্শন করেন।
শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. এস.এম সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে বিশেষ রোটেশনের মাধ্যমে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার এই রোষ্টার তৈরীর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেছেন, জরুরী বিভাগ থেকে শুরু করে সর্বত্ত জরুরী চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসময় পুলিশ কমিশনার সাংবাদিকদের অভিযোগের পর্যালনা করে হাসপাতাল পরিচালককে বলেন, অজ্ঞান এবং মলম পার্টির সদস্যদের খপ্পরে পড়া যাত্রীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরো মনোযোগী হতে হবে। তাদের হাসপাতালে আনা মাত্র চিকিৎসা শুরু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যাতে করে কোন গাফেলতী না হয় সে বিষয়ে পরিচালককে দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানান।
টশুর চামড়া (ট্যানারী) ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, বরিশাল থেকে চামড়া পাচার হয়ে থাকলেও তার সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই তাদের কাছে। তবে এক শ্রেণির মৌসুমী ব্যবসায়ীরা কোরবানীর মৌসুমে চামড়া কিনে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের লোকশানে ফেলে দেয়। তাই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়ার জন্য পুলিশ কমিশনার এর নিটক অনুরোধ জানান। সেই সঙ্গে ট্যানারী শিল্প বাচিয়ে রাখতে এদের জন্য পৃথক স্থানের ব্যবস্থা করনের জোর দাবী জানান তারা।
এছাড়া বিভিন্ন দপ্তরের নানা পর্যায়ের কর্মকর্তারা পবিত্র ঈদ উল আযহা এবং তাদের করোনীয় বিষয় নিয়ে সভায় আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহন হয়।
হাটের ইজারাদারদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এক শ্রেণির মৌসুমী ব্যবসায়ীরা পাইকারী দরে গরু কিনে এনে তা তাদের নিজস্ব জায়গায় মজুদ করে রাখে। পরবর্তীতে তারা সেখানে বসেই পশুগুলো বিক্রি করে থাকে। যে কারনে হাটে পশু বিক্রি যেমন কম হয় তেমনি ইজারাদারদেরও লোকশানে পড়তে হয়। আর তাই পুলিশ এবং বিসিসি’র পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য জোর অনুরোধ জানান ইজারাদাররা।
সভায় অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার সায়েদুর রহমান, উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) গোলাম আব্দুর রউফ খান, উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) উত্তম কুমার পাল, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আবু রায়হান মো. সালেহ্, উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিএসবি) মো. জাহাঙ্গীর মল্লিক, উপ-পুলিশ কমিশনার (ফোর্স) কামরুল ইসলাম প্রমূখ।