ট্যাংকার ও কার্গোর সংঘর্ষ কীর্তনখোলার দেড় কিলোমিটার জুড়ে ভাসছে ডিজেল

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ কীর্তনখোলা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকারের সাথে ফ্লাইএ্যাশ বোঝাই কার্গোর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ট্যাংকারের আংশিক ফেটে গিয়ে প্রায় সাত থেকে আটক হাজার লিটার ডিজেল নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাস্থল হতে নদীর প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনায় ফ্লাইএ্যাশ বহনকারী অপর কার্গোটিও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে দিকে কীর্তনখোলা নদীর চরকাউয়া পয়েন্টে এ দূর্ঘটনা ঘটেছে। তবে এতে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দুটি নৌ-যানের পক্ষে থানায় পাল্টা পাল্টি সাধারন ডায়েরী করা হয়েছে।
এদিকে কীর্তনখোলায় ডিজেল ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সহ প্রাকৃতিক ও জলজ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থের আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই সাথে পরিবেশ ঝুকির মুখি পড়তে পারে বলেও মনে করছেন পরিবেশবিদরা। কিন্তু নদীতে ভাসমান ডিজেল অপসারনের কোন পরিকল্পনা গ্রহন করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অবশ্য স্থানীয় শত শত মানুষ নানা উপায়ে ডিজেল সংগ্রহ করছে। নদীর তীরে এবং নৌকায় চড়ে নদীতে ভাসমান তেল সংগ্রহ করছেন তারা। ড্রাম, বালতি, কলসি এবং হাড়ি-পাতিল সহ বিভিন্ন পাত্রে শত শত লিটার ডিজেল সংগ্রহ করে রাখতে দেখা গেছে।
যমুনা পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তেলবাহী ট্যাংকার এম.টি ফজর’র মাস্টার জামসেদুর রহমান জানান- তারা সাড়ে ১২ লাখ লিটার জ্বালানী তেল নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে বরিশাল নগরীতে যমুনা ডিপোর উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। যার মধ্যে জাহাজের একটি চেম্বারে সাড়ে ৯ লাখ লিটার ডিজেল এবং অপর চেম্বারটিতে তিন লাখ লিটার পেট্রোল ছিলো। সকাল ৭টার দিকে যমুনা ডিপোর অদুরে কীর্তণখোলা নদীর চরকাউয়া পয়েন্টে পৌছলে বিপরিত মুখি ফ্লাইএ্যাশবাহী এমভি মা-বাবা-২ নামের অপর একটি কার্গো তেলের ট্যাংকারকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে অয়েল ট্যাংকারটির পোর্ট সাইডের একটি হ্যাচের পাশের অন্তত ২৫ফুট এলাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সাথে সাথে ঐ হ্যাচে থাকা বেশ কিছু জ্বালানী তেল কির্তনখোলা নদীতে ছড়িয়ে পরে। তবে নৌযনটির কাপ্তেন ও ক্রুরা অতি দ্রুততার সাথে ক্ষতিগ্রস্থ হ্যাচ থেকে জ্বালানী অন্য হ্যাচে স্থানান্তর সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। ফলে নৌযানটি থেকে জ্বালানী তেল কির্তনখোলায় নির্গত হবার বিষয়টি দ্রুত বন্ধ করা সম্ভব হলেও ঠিক কত লিটার তেল নদীতে পড়েছে তা এখনো বলতে পারেননি কেউ। ক্লিংকার বোঝাই কার্গোটির সামনে কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হলেও তা তেলবাহী নৌযানটির তুলনায় কম।
মাস্টার জামসেদুর রহমান বলেন, ঘটনার সাথে সাথে তাৎক্ষনিক ভাবে ট্যাংকারটি নিরাপদে সরিয়ে নেন। সেই সাথে যে চেম্বারে ফাটল ধরেছে সেখানে থাকা ডিজেল দ্রুততার সাথে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে অন্য চেম্বারে সরিয়ে নেন। যে কারনে সকল ডিজেল ক্ষতি হয়নি। তার পরেও প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার লিটার ডিজেল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এর পরিমান বৃদ্ধি এবং কমতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে ফ্লাইএ্যাশবাহী এমভি মা-বাবার দোয়া-২ কার্গোর মাস্টার জাকির হোসেন বলেন- ভারত থেকে মেঘনা গ্রুপের ফ্লাইএ্যাশ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে। যা মংলা হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন। শুক্রবার সকালে কীর্তনখোলা নদী অতিক্রম কালে আকস্মিকভাবে নৌ-বন্দর এলাকায় তেলবাহি ট্যাংকারটি তাদের কার্গোটিকে ধাক্কা দেয়। এতে কার্গোর প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবী তার। দুই পক্ষই দুর্ঘটনার জন্য দুই নৌ-যানের সংশ্লিষ্টদের দোষারপ করে পাল্টা পাল্টি সাধারন ডায়েরী করা হয়েছে। তেলের ট্যাংকার এবং কার্গোর দুই মাস্টার বাদী হয়ে কোতয়ালী মডেল থানায় এই ডায়েরী দুটি দায়ের করেন। কার্গো ভেসেল ঔনার্স এসোসিয়েশন’র সাংগঠনিক মো. ইউনুস বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। মুলত তেলবাহী ট্যাংকারের সংশ্লিষ্টদের ভুলের কারনে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তারা বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে দোষ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, তেলের ট্যাংকারের সাথে দুরত্ব বজায় রেখে কার্গো যাচ্ছিলো। কিন্তু ট্যাংকারটি দ্রুত গতিতে বাক অতিক্রমকালে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে কার্গোকে আঘাত করে। সাংগঠনিক সম্পাদক আরো অভিযোগ করেন, ট্যাংকার সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দোষ এড়িয়ে নদীতে পড়ে যাওয়ার তেলের পরিমান বাড়িয়ে ঘাটতি পূরনের কৌশল নিয়েছে।
এদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীক’র কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বলেন, দুটি নৌ-যানই বর্তমানে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। বিষয়টি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছেন। তাছাড়া খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়া বরিশাল ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর নৌ- স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান দুর্ঘটনায় তেমন কোন উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়নি। তবে দুর্ঘনটার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক আজমল হুদা সরকার মিঠু বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা খোজ খবর নিয়েছি। কিন্তু এটির বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহন আমাদের দায়ের মধ্যে পড়ে না। ফায়ার সার্ভিস এবং লোকাল প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত সহ তদারকি করবেন। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করবে বিআইডব্লিউটিএ।
কোতয়ালী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সত্যরঞ্জন খাসকেল বলেন, দুটি নৌযানে সংঘর্ষের ঘটনায় থানায় পাল্টা পাল্টি ডায়েরী হয়েছে। পুলিশ আপাতত বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।