টিসিবির মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল কালোবাজারে বিক্রি ও আটক

রুবেল খান॥ ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ’র (টিসিবি) কার্যালয়ে মজুদ মেয়াদ উত্তীর্ণ প্রায় ১ হাজার ২০০ লিটার সায়াবিন তেল পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিলো। এ নিয়ে দিনভর নানা নাটকিয়তা শেষে প্রায় ৪০ হাজার টাকা উৎকোচের বিনিময়ে সিএসডি গোডাউন থেকে পাঁচারের দুটি ট্রাক ভর্তি মেয়াদ উত্তীর্ণ সয়াবিন তেল আটক করেছে পুলিশ। তবে থানা থেকে মামলাগুলো ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
জানাগেছে, গেল রমজান উপলক্ষে বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের অধিনে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ’র (টিসিবি) সরকার নির্ধারিত ন্যায্য মূলে চিনি, ডাল, ছোলার সাথে উন্নত মানের ভোজ্য তেল বিক্রি শুরু করে। কিন্তু রমজানের মধ্যেই বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় টিসিবি’র তেল বেচা কেনা বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে টিসিবি’র তেল বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বরিশাল সিএসডি গোডাউনে ৬৪ হাজার ১২০ লিটার তেল অবিক্রিত অবস্থায় রয়ে যায়। ফলে গুদামজাত তেল নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় টিসিবি কর্তৃপক্ষের। কেননা গুদামে রক্ষিত থাকা তেলের মেয়াদ গত মে মাসে শেষ হয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে বানিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে জাতীয় দৈনিক এবং স্থানীয় পত্রিকার মাধ্যমে মেয়াদ থাকাকালীন সময়ের মধ্যে সাড়ে ৫৫ টাকা দরে তেল ক্রয়ে সকলের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহবান করা হয়। কিন্তু টিসিবি বরিশাল কার্যালয়ের সাবেক এবং বর্তমান কর্মকর্তা ও কয়েকজন ডিলার মিলে সব তেল মেয়াদ উত্তীর্ণ দেখিয়ে কিনে রাখে। ।
এর মধ্যে শুধু মাত্র ত্রিশ গোডাউন সংলগ্ন চরের বাড়ির বাসিন্দা টিসিবি’র ডিলার মেসার্স মোল্লা এন্টারপ্রাইজের শাহিন মোল্লা একাই ৩৭ হাজার ১৬০ লিটার মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল ক্রয় করেন।
এছাড়া বাকি তেল টিসিবি’র বর্তমান অফিস প্রধান মো. হান্নান খান, সাবেক সংরক্ষন ও বিক্রয় সহকারী আতিকুর রহমান, বর্তমান গোডাউন ইনচার্জ মো. সেলিম শেখ ও সংরক্ষণ কাম বিক্রয় সহকারী শফিউল ইসলাম অবৈধ ভাবে কিনে রাখে। পরবর্তীতে তেলগুলো বাইরে বিভিণœ ডিলারদের কাছে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
এদিকে গত ২ মাস পূর্বে টিসিবির ঐ তেলের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর তা বিভিন্ন সময় বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন ডিলারদের কাছে বিক্রি করে। মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল ক্রয়কারীদের মধ্যে ঝালকাঠি সদরের তামাক পট্টির মেসার্স মনজ এন্টারপ্রাইজ ১লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৫০ টাকা দরে ২৫শ লিটার, বরগুনার আমলতী বন্দরের মাঈনুল এন্টারপ্রাইজের কাছে ১লক্ষ ৮০ হাজার ৫শ টাকায় ৩ হাজার ২৭০ লিটার, নগরীর স্ব-রোডের জালাল স্টোর্সের কাছে ১৭৫০ লিটার, মাদারীপুরের শিবচরের শাহীন এন্টারপ্রাইজের কাছে ৩ লক্ষ ২২ হাজার ১২৫ টাকায় ৭ হাজার ৭৮০ লিটার ও পটুয়াখালীর পুরানবাজারের জিএম এন্টারপ্রাইজের কাছে ৭ হাজার ৩০০ লিটার মেয়াদ উত্তীর্ণ সয়াবিন বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় টিসিবির বরিশাল আঞ্চলিক কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা।
অপরদিকে টিসিবি’র অন্যান্য কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা তাদের ক্রয়কৃত টিসিবি’র অবৈধ মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল বিক্রি করতে সক্ষম হলেও ২৫ জুন বরিশাল থেকে চট্টগ্রামের বদলি হয়ে যাওয়ায় সাবেক সংরক্ষন ও বিক্রয় সহকারী আতিক তার অবৈধ ভাবে ক্রয়কৃত মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল বিক্রি করতে পারেনি। তবে টিসিবি বরিশাল কার্যালয়ের পিওন মনির এবং তার বড় ভাই সাগরদী ব্রাঞ্চ রোড এলাকার চিহ্নিত কালোবাজারী স্বপন দায়িত্ব নিয়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ ঐ তেল ঝালকাঠির তামাকপট্টির মেসার্স মনজ এন্টারপ্রাইজের প্রভাইডার সুমন এর কাছে কালোবাজারির মাধ্যমে বিক্রি করে দেয়। সে অনুযায়ী গত মঙ্গলবার থেকে সুমন অবৈধ ভাবে কেনা মেয়াদ উত্তীর্ণ ঐ তেল বরিশাল টিসিবি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সিএসডি গোডাউন থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। মঙ্গলবার সিএসডি গোডাউন থেকে দুটি হলুদ মিনি ট্রাকে তেল পাচার কালে স্থানীয়রা তাদের বাধা দেয়। এক পর্যায়ে ৩০ হাজার টাকার দেন দরবারের মাধ্যমে অবৈধ এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় মনজ এন্টারপ্রাইজের মালিক সুমন। এসময় দুই পুলিশ এবং দুই সাংবাদিক ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে বিষয়টি চেপে যায়।
এদিকে একদিন পর গতকাল বিকাল পৌনে ৫টার দিকে আবারো দুটি মিনি ট্রাক যোগে ১১৫০ লিটার মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল পাচারের চেষ্টা করে। এজন্য বরিশাল নগরীর ৭/৮ সাংবাদিক সহ পাচারে সহযোগিতাকারী স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তিদের প্রায় ৪০ হাজার টাকা ঘুষ প্রদান করেছে টিসিবি’র পিওন মনির’র ভাই স্বপন এবং তার স্ত্রী। এর মধ্যে সাংবাদিকরা ১০ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহন করে বিষয়টি চেপে যান বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অপরদিকে বিকালে দুটি মিনি ট্রাকে সিএসডি গোডাউন থেকে অবৈধ তেল বের হয়ে ব্যাটালিয়ান ক্যাম্প গেট হয়ে বিআইপি শাখা সড়ক থেকে বেরিয়ে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল পাচার করতে পারেনি টিসিবি কর্তৃপক্ষ। পথিমধ্যে কালিজিরা এলাকা থেকে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল সহ দুটি ট্রাক আটক করে থানায় নিয়ে আসে। এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত মেয়াদ উত্তীর্ণ মাল ছাড়িয়ে নিতে ব্যাপক তোড় জোর চালাচ্ছে ঝালকাঠির চোরা কারবাড়ি এবং মনজ এন্টারপ্রাইজের মালিক সুমন।
এদিকে ঝালকাঠির বেশ কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার চোরাই পথে পাচার হওয়া মেয়াদ উত্তীর্ণ তেল ভালো তেলের সাথে মিশিয়ে খুচরা ও পাইকারী বাজারে বিক্রি শুরু করেছে চোরাকারবারী সুমন।