জেলে পল্লীতে হাহাকার, বাজারে মাছ সংকট

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ তাপমাত্রার পারদ স্মরণকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হবার পাশাপাশি লাগাতার বৃষ্টির অভাবে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীগুলো অনেকটাই ইলিশ শূন্য হয়ে পড়েছে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, এবার চাঁদপুরের উজানÑভাটিতে মেঘনা এবং উকূলীয় ভাটি মেঘনা মুখ ছাড়াও বুড়িশ্বর, বলেশ্বর, তেতুলিয়া সহ সবগুলো শাখা নদ-নদীর পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪Ñ৫ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি। উপরন্তু বৃষ্টির আকালে স্বাদু ও স্বচ্ছ পানির অভাবেও দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ইলিশের বিচরণ আশংকাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।
ফলে চাঁদপুরের ভাটি থেকে সাগর মোহনার বিভিন্ন অভয়াশ্রমগুলোর নদ-নদীতে ইলিশের বিচরণ নেই বললেই চলে। এসব অভয়াশ্রমগুলোতে গত কয়েক মাসের নিষেধাজ্ঞার পরে জেলেরা নদীতে নাও ভাসালেও জালে মাছের দেখা নেই। বেশিরভাগ জেলেই সকাল থেকে জাল ফেলেও সন্ধ্যায় ফিরছে শূন্য নাও নিয়ে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের জেলে পল্লীগুলোতে এখন চরম হাহাকার। দেশের ৬টি বিভাগের মধ্যে শুধুমাত্র বরিশাল বিভাগেই প্রায় দেড় লাখ জেলে এ পেশার সাথে জড়িত বলে মৎস্য অধিদফতর জানিয়েছে। যার ৬৫%সার্বক্ষনিকভাবে ইলিশ আহরণে জড়িত বলে এক জরিপে বলা হয়েছে। বর্তমানে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ইলিশের একক অবদান ১%-এরও বেশি। দেশের মোট মৎস্য সম্পদে একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১২Ñ১৩%।
এবার অভ্যন্তরীণ নদী-নদীর পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩-৫ ডিগ্রী পর্যন্ত বেশি থাকায় এখনো ইলিশ সাগর উপকূল থেকে গভীর সমুদ্রে বিচরণ করছে। চলতি বছর বরিশাল অঞ্চলে তাপমাত্রার পারদ সাম্প্রতিককালের সর্বোচ্চ ৩৭.৫ডিগ্রী সেলসিয়াসে উঠে যায় গত ২৪এপ্রিল। গত ১১এপ্রিল তাপমাত্রা পুনরায় ৩৭.১ডিগ্রীতে উন্নীত হয়। অথচ এপ্রিলে বরিশাল অঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৩.২ডিগ্রী এবং চলতিমাসে ৩৩ডিগ্রী সেলসিয়াস থাকার কথা।
অথচ অনেকটা অসময়েই গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত শীতকালীন সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নদ-নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য ছিল লক্ষনীয় মাত্রায় বেশি। মার্চ মাস পর্যন্ত বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় সব নদ-নদীতেই ভাল সাইজের ইলিশের বিচরণ ছিল লক্ষনীয়। মৎস্য অধিদফতরের মতে গত অর্থ বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ও সহনীয় আহরণ ছিল ৩লাখ ৮৫হাজার টনের কিছু বেশি। কিন্তু শুধু সরবরাহ ঘাটতির কারণেই এখন বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের পাইকারী বাজারে এক কেজির ওপরের সাইজের ইলিশ বিক্রী হচ্ছে ৮০-৮৫হাজার টাকা মন দরে। ৫শ গ্রাম থেকে সাড়ে ৭শ গ্রাম সাইজের ইলিশ বিক্রী হচ্ছে ৪৫-৬০ হাজার টাকা মন দরে। ৫শ গ্রামের নিচের সাইজের ইলিশ ২৮-৩৫হাজার টাকা মন।
এদিকে গত ১ নভেম্বর থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশেই ইলিশ পোনাÑজাটকার আহরণ পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ রয়েছে। ইতোপূর্বে এ নিষেধাজ্ঞা ৩০মে পর্যন্ত বলবত থাকলেও এবার তা আরো একমাস সম্প্রসারণ করে ৩০জুন করা হয়েছে। পাশাপাশি জাটকার সংজ্ঞায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইতোপূর্বে ৯ইঞ্চি পর্যন্ত ইলিশ পোনাকে জাটকা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশের আলোকে এখন তা ১০ইঞ্চিতে উন্নীত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশের ৪০টি জেলার ১৪৫টি উপজেলার দেড় হাজার ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৪লাখ জেলে ইলিশ আহরণের সাথে জড়িত। যার ৩২% সার্বক্ষনিক ও ৬৮% খন্ডকালীন এ পেশায় সম্পৃক্ত বলে মৎস্য অধিদফতর জানিয়েছে। এছাড়াও ইলিশ বিপণন, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরন, জাল ও নৌকা তৈরী সহ মেরামত কাজেও আরো প্রায় ২০Ñ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।
তবে জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ-এর উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমানে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন নেই। এলক্ষ্যে উচ্চাভিলাসী একটি ‘প্রকল্প প্রস্তাব’ তৈরীর কাজ চলছে বলে মৎস্য অধিদফতরের দায়িত্বশীল মহল জানিয়েছেন। দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৪সাল থেকে সর্বপ্রথম ৭কোটি টাকা ব্যয়ে “জাটকা আহরণকারী মৎস্যজীবীদের পুনর্বাসন/বিকল্প কর্মসংস্থান বিষয়ক উন্নয়ন কর্মসূচী” বাস্তবায়ন শুরু হয়। ২০০৭Ñ২০১০সাল পর্যন্ত এ কর্মসূচীর দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো কিছু জেলেকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ৬কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি কর্মসূচী বাস্তবায়িত হয়। একই সাথে ২০০৮Ñ০৯ থেকে ২০১২Ñ১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত প্রায় ৪০কোটি টাকা ব্যয়ে “জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও গবেষণা প্রকল্প” নামে অপর একটি কর্মসূচী বাস্তবায়নকাল ধরা হলেও প্রকল্প মেয়াদ দু দফায় বাড়িয়ে ২০১৪-এর ৩০জুন তা সমাপ্ত হয়।
এরপর থেকে নতুন কোন প্রকল্প প্রণয়ন বা অনুমোদন লাভ করেনি। তবে জাটকা সংরক্ষণ ও জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে একটি ‘কর্মসূচী’ চলছে বলে মৎস্য অধিদফতরের দায়িত্বশীল মহল জানালেও এলক্ষ্যে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা-ডিপিপি প্রণয়ন ও তার চূড়ান্ত অনুমোদন কবে হবে তা বলতে পারছে না কেউ।
অপরদিকে জাতীয় মাছ ইলিশ নিয়ে অনেক বড় বড় কথা দায়িত্বশীল মহল সহ সরকারে উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হলেও আজ পর্যন্ত এ মাছের উন্নয়নে কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি দেশে। নতুন প্রকল্পের আওতায় এ ধরনের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও সে প্রকল্প আর কতদূর তা জানে না কেউ।