জেলহাজতে থাকা বিএনপির নেতা-কর্মীদের পরিবারে আতঙ্ক

এনটিভি অনলাইন ॥ পুলিশ প্রহরায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে। গত ৩১ জানুয়ারি রাজধানীর একটি বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ‘নাসির উদ্দিন পিন্টু মারা যাওয়ার পর আমার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে, তিনি বেশ ভেঙে পড়েছেন। এমনিতেই তিনি অনেক সমস্যায় আক্রান্ত। তাঁর হার্টে দুটি রিং পরানো আছে। বাকি ব্লকগুলোর কী অবস্থা জানি না।’ –বললেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ মান্নানের স্ত্রী সাজেদা মান্নান। সাজেদা এনটিভি অনলাইনকে আরো বলেন, ‘এম এ মান্নান ডায়াবেটিস ও কিডনির সমস্যায়ও আক্রান্ত। পিন্টু মারা যাওয়ার পর ওনার মন একেবারেই ভেঙে গেছে। ওনার শরীরটা বেশি ভালো না তাই আজ (মঙ্গলবার) আবার তাঁকে দেখার জন্য লোক পাঠিয়েছি।’ শুধু সাজেদা মান্নান নন, গত রোববার বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ পিন্টুর মৃত্যুর পর থেকে আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন জেলহাজতে থাকা বিএনপি নেতা-কর্মীদের স্বজনরা। অভিযোগের সুরে সাজেদা মান্নান বলেন, ‘তাঁর (মান্নান) শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা বেশ চিন্তায় আছি। তাঁকে বারডেমের ডাক্তার দেখানো হতো। কিন্তু কোনো কিছু হলে কারাগার থেকে পিজিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা বারডেমে ডাক্তার দেখানোর কোনো সুযোগ দেয় না।’ গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরে যাত্রীবাহীবাসে পেট্রলবোমা হামলার মামলায় মান্নানকে গ্রেপ্তার করা হয়, গত ১১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকার বারিধারার বাসা থেকে। বর্তমানে তিনি কাশিমপুর পার্ট- ২ কারাগারে রয়েছেন। কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর। স্ত্রী দুই ছেলে ও দুই মেয়ের কেউ দেশে নেই। তাঁর খোঁজখবর রাখেন সাবেক এপিএস হায়দার আলী। তিনি এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘তিনি খুব বেশি সুস্থ নেই। গত দেড় মাস পিজিতে ছিলেন। এখন সাময়িক সুস্থ বলা যেতে পারে। হাসপাতাল থেকে কারাগারে যাওয়ার পরও তাঁর হাই-পাওয়ারের অ্যান্টিবায়োটিক চলছে।’ বাবর হাঁপানি, ঘাড়ে পিঠে ব্যথা, নাক দিয়ে রক্ত পড়াসহ প্রায় ১৩-১৪টি সমস্যায় ভুগছেন। এ ছাড়া তাঁর দাঁতে ক্যানসারের মতো সমস্যায় ভুগছেন বলেও এনটিভি অনলাইনকে জানান হায়দার আলী। বর্তমান শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে হায়দার আলী বলেন, ‘আমার সঙ্গে সর্বশেষ গত ১ মে দেখা হয়েছিল। আমি প্রতি মাসেই একবার গিয়ে দেখা করে আসি। তাঁর শরীরটা খুব ভালো না। তিনি কারা চিকিৎসকের অবজারবেশনে আছেন।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে আছেন বাবর। তাঁর বাসা থেকে অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় যাবজ্জীবন এবং আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মালায় ফাঁসির দ-াদেশ দেওয়া হয় তাঁকে। এ ছাড়া অন্য মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন আছে। বর্তমানে তাঁকে কশিমপুর কারাগারের পার্ট ১-এ রাখা হয়েছে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শমসের মোবিন চৌধুরীও রয়েছেন কারাগারে। কাশিমপুর কারাগারে পার্ট ২-এ রাখা হয়েছে এ বিএনপি নেতাকে। উৎকণ্ঠার ভেতর আছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। তাঁর স্ত্রী শাহেদা ইয়াসমিন এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘এ সপ্তাহের শুরুতেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমরা প্রতি সপ্তাহে একবার দেখা করার সুযোগ পাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পায়ে গুলি লেগেছিল। সেই পায়ে এখন খুব একটা জোর পান না, অবশই বলা চলে। সে বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে বলা আছে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগছেন বলে এনিটিভি অনলাইনকে তাঁর ছেলে খন্দকার মারুফ হোসেন। গত বছর ৬ ফেব্রুয়ারি রমনা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ মামলায় গত বছর ১২ মার্চ গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। এরপর থেকে জেলে আছেন তিনি। জেলে থাকা অবস্থায় অসুস্থও হয়ে পড়েন এ বিএনপি নেতা। গত বছরই এপ্রিলে বুকে ব্যথাজনিত কারণে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল তাঁকে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। কারা চিকিৎসকদের পরামর্শেই তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) পাঠানো হয়েছে। গত ৪ জানুয়ারি ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে পল্টন থানায় মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। এর পর ৬ জানুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘তাঁর অবস্থা এখন কিছুটা ভালো। আজ সকালে হাসপাতালে আনার পর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। এখন দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।’ এ ছাড়া কারাগারে রয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সিলেটের মেয়র আরিফুল হক, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদের মতো শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। তাঁদের কারোরই শারীরিক অবস্থা ভালো নয় বলে তাঁদের স্বজনরা জানিয়েছেন। বিএনপির গণমাধ্যম শাখার কর্মকর্তা শায়রুল কবীর এনটিভি অনলাইনকে বলেন, বিভিন্ন মামলায় ২০-৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের প্রায় সবাই নানা জটিল রোগে ভুগছেন। এ ছাড়া সারা দেশে নয় হাজার মামলায় দুই লাখেরও বেশি নেতা-কর্মীকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। সেসব মামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ছয় হাজার নেতা-কর্মী জেলে আছেন। গত রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে রাজশাহীতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান পিন্টু। তিনি রাজশাহী কারাগারে ছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা জানান, আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পিন্টুর পরিবারের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকেও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে।