জাতীয় পতাকাবাহী বিমানের সময়সূচী নিয়ে যাত্রীদের মাঝে ক্ষোভ, বিক্রয় অফিস চালু হয়নি

অতিথি প্রতিবেদক॥ দক্ষিনাঞ্চলের আকাশে দীর্ঘ প্রতিক্ষিত জাতীয় পতাকাবাহী বিমান পাখা মেলার পূর্বে স্থায়িত্ব ও গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি হতে শুরু করেছে সাধারন যাত্রী সহ পর্যকেক্ষক মহলে। আগামী ৪ এপ্রিল থেকে ভাড়া করা ৭২ আসনের দুটি টার্বো প্রপ ‘ড্যাস-৮ কিউ-৪০০’ উড়জাহাজ দিয়ে রাষ্ট্রীয় আকাশ পরিবহন সংস্থা ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’ অভ্যন্তরীন সেক্টরের ৭টি রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করতে যাচ্ছে। ১/১১-এর কথিত তত্ববধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পরে বরিশাল সহ পদ্মা-মেঘনার পশ্চিম পাড়ের সবগুলো সেক্টরের সাথে আকাশ পরিসেবা বন্ধ করে দিয়েছিল। পরবর্তির্তে কক্সবাজার সেক্টরেও রাষ্ট্রীয় উড়ান বন্ধ করে দেয়া হয়। অথচ ২০০৬Ñ০৭অর্থ বছরের প্রথম ৬মাসেই শুধু বরিশাল সেক্টরে বিমান-এর রাজস্ব আয় ছিল লক্ষমাত্রার ২২৩%। সেসময় ঢাকাÑবরিশালÑযশোরÑঢাকা এবং ঢাকাÑযশোরÑবরিশালÑঢাকা রুটে বিমান-এর ফ্লাইট ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। উপরন্তু ২০০৫ ও ২০০৬সালে বরিশাল থেকে ঢাকায় ট্রানজিটের মাধ্যমে দুটি হজ কাফেলাও জেদ্দা গমন কেের।
বিগত মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পরে বরিশাল সহ সবগুলো অভ্যন্তরীন সেক্টরে পুনরায় জাতীয় পতাকাবাহী বিমান-এর ফ্লাইট চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহন করে সেলক্ষে ব্যাবস্থা গ্রহনে মন্ত্রনালয়কে নির্দেশও প্রদান করে। কিন্তু বিমান পরিচালনাকারী অদৃশ্য শক্তির কারসাজিতে উড়জাহাজ ভড়া করতেই ৩বছর কেটে যায়। দরপ্রস্তাব আহবান করা হয় মোট ৮বার। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পরে বিমান মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই বিমানকে তাগিদ দিতে থাকেন। খোদ প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ঠ আগ্রহী বলে জানা গেছে। মন্ত্রী সর্বশেষ গতবছরের জুলাই-আগস্ট মাসকে সময় বেঁধে দেন ফ্লাইট চালু করতে। কিন্তু তাও সম্ভব হয়নি উড়জাহাজ ভাড়া করা নিয়ে নানা জটিলতায়। সর্বশেষ গত মাসে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের পরে বিষয়টি আলোর মুখ দেখতে শুরু করে। তবে এখনো উড়জাহাজ দেশে এসে না পৌছলেও আগামীকাল (সোমবার) নাগাদ ভাড়াকরা উড়জাহাজ দুটি ঢাকায় পৌছবে বলে আশা করছেন দায়িত্বশীল মহল।
কিন্তু ৪এপ্রিল থেকে যে সিডিউল নিয়ে বিমান অভ্যন্তরীন রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করছে, তাতে বরিশালে দক্ষিনাঞ্চলের একমাত্র বিমান বন্দরের সাথে প্রতিসপ্তাহে ফ্লাইট রাখা হয়েছে মাত্র দুটি। তাও যাত্রীবন্ধব সময়ে নয় বলে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। অথচ ৪এপ্রিল থেকে সৈয়দপুর ও রাজশাহী সেক্টরে সপ্তাহে ৩টি করে, যশোর সেক্টরে সপ্তাহে ৫টি, সিলেট ও চট্টগ্রাম সেক্টরে দৈনিক গড়ে ৪টি করে অভ্যন্তরীন ফ্লাইট চলবে। এছাড়াও ঐ দুটি সেক্টরে আন্তর্জাতিক রুটের একাধীক সংযোগ ফ্লাইটও ঢাকায় যাত্রী পরিবহন করবে বলে ঘোষনা করা হয়েছে।
সে নিরিখে বরিশালে দক্ষিনাঞ্চলের একমাত্র বিমান বন্দরটির সাথে সপ্তাহে মাত্র দুটি ফ্লাইট কোনমতেই যাত্রীদের কাছে গ্রহনযোগ্যত পাবেনা বলে শংকিত ওয়াকিবাহাল মহল। উপরন্তু বৃহস্পতিবার বিকেলের পরিবর্তে বুধবার বিকেলে এবং রবিবার সকালের পরিবর্তে বিকেলে ফ্লাইট সময়সূচী নির্ধারন করায় তা যাত্রীদের কোন উপকারে আসবে কিনা সে বিষয়েও সন্দিহান মহলটি। বিষয়টি নিয়ে গতকাল বরিশাল আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট গনমাধ্যম কর্মী এ্যডভোকেট ইসমাইল হোসেন নেগাবান পুনরায় তার ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রীয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘একটি দুষ্ট চক্র সবসময়ই বরিশালে ফ্লাইট পরিচালনার বিরোধী। তাই এবারো এমনভাবে সময়সূচী নির্ধারন করা হয়েছে, যা যাত্রীদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা পাবেনা।’ তিনি বলেন, ‘কতৃপক্ষকে বুঝতে হবে, কেউ বিমান-এ ভ্রমনের জন্য ঢাকায় যাবেনা, ঢাকা যাবার জন্যই বিমান’কে ব্যবহার করবে।’ তিনি পূর্বের ন্যায় বৃহস্পতিবার বিকেলে এবং রবিবার সকালে বরিশালÑঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি সপ্তাহে অন্ত্যত একদিন ঢাকা-বরিশালÑযশোরÑঢাকা ফ্লাইট পরিচালনার দাবী জানান। এতে করে দেশের প্রধান স্থল বন্দর বেনাপোল ছাড়াও খুলনা বিভাগীয় সদর ও যশোরের সাথে দক্ষিনাঞ্চলের একটি সহজ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে করেন তিনি। একই দাবী করেছেন বরিশাল বার-এর আরেক সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এ্যাডভোকেট মানবেন্দ্র বটব্যলও।
এদিকে বরিশালে বিমান-এর সেলস অফিসের জন্য শহরের সদর রোডে একটি বাড়ীর ৪র্থ তলায় যে স্থান ভাড়া নেয়া হয়েছে, গতকাল সরেজমিনে পরিদর্শন করে সেখানে বিমান-এর কাউকে খুজে পাওয়া যায়নি। এমনকি অফিসের জন্য সে ফ্লোরটি এখনো প্রস্তুতই হয়নি। গতকালও সেখানে কাজ চলছিল। এমনকি বিমান-এর জেলা ব্যাবস্থাপক সহ যেসব কর্মকর্তাকে এখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তারা এখনো অফিসে বসার সুযোগও পাননি। ফলে বিক্রয় ও বিপনন সম্প্রসারন কার্যক্রমও শুরু হয়নি এখনো।
এসব বিষয়ে গতকাল বিমান-এর বিসক্রয়য় ও বিপনন বিভাগের দায়িত্বশীর মহলে যোগাযোগ করা হলে, তারাও বরিশাল সেক্টরে ফ্লাইট সময়সূচী নিয়ে তাদের দ্বিমতের কথা জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধীক কর্মকর্তা ‘বরিশালে সেক্টরে বৃহস্পতিবার বিকেলে ও রবিবার সকালে ফ্লাইট সময়সূচী নির্ধারন সহ মঙ্গলবারে যশোর হয়ে তৃতীয় ফ্লাইট পরিচালনা করা উচিত’ বলে মন্তব্য করে এলক্ষে তারা চেষ্টা করছেন বলেও জানান।
উল্লেখ্য, প্রায় ৪০কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মান শেষে ১৯৯৫-এর ৩ডিসেম্বর বরিশাল বিমান বন্দর ও জাতীয় পতাকাবাহী বিমান পরিসেবা উদ্বোধন করা হয়েছিল। পরবর্তির্তে ১৯৯৮-এর ২১আগস্ট বরিশাল সেক্টরে বিমান তার ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় নানা অজুহাতে। পুনরায় ২০০৩-এর ২৪এপ্রিল এ সেক্টরে বিমান ফ্লাইট চালু হলেও ১/১১সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পরে ২০০৭-এর জানুয়রীতে তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ৬হাজার ফুট রানওয়ে বিশিষ্ট বরিশাল বিমান বন্দর থেকে মাঝারী মাপের জেট এয়ারক্রাফটও পরিচালনা করা সম্ভব। এখানে ভিআইপি ও ভিভিআইপি লাউঞ্জ সহ বিশাল টার্মিনাল ভবন এবং আধুনিক সরঞ্জামাদী সমৃদ্ধ কন্ট্রোল টাওয়ার ছাড়াও অভ্যন্তরিন ও আঞ্চলিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সব সুবিধাদী রয়েছে।