ছাত্রলীগ ও যুবলীগের টেন্ডারবাজীতে জনসমর্থন কমছে

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বরিশাল সহ দক্ষিনাঞ্চলে ক্ষমতাসীন মহাজোটের মূল শরীক আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা-কর্মীর ক্ষমতার পূর্ণ স্বাদ ভোগ করার কারনে দলের সাংগঠনিক অবস্থা ক্রমশ দূর্বল হচ্ছে। জনসমর্থনে ভাটির টান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে প্রতিটি জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ক্রমশঃ আমজনতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি শওকত হোসেন হিরন ১৫ মাস আগে ইন্তেকালের পরে আজ পর্যন্ত সে পদ পূরন হয়নি। ২০১২ সালে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সভাপতি ও সম্পাদক মনোনীত হবার পরে আজ পর্যন্ত কোন পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। জেলা সভাপতি আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ-এমপি নানা মান-অভিমান ও হতাশায় ঢাকা প্রবাসী হয়েছেন। মাঝে মধ্যে বরিশালে এলেও নিজ নির্বাচনী এলাকা ও পৈত্রিক ভিটা আগৈলঝাড়া’র সেরল গ্রামে অবস্থানেই তিনি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। জেলা সম্পাদক তালুকদার মোঃ ইউনুস-এমপি এক দুর্ঘটনায় অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন ঢাকায়।
সভাপতি বিহীন মহানগর আওয়ামী লীগে প্রয়াত হিরনের স্থান পূরন করতে তার অনুসারীরা জেবুন্নেছা আফরোজকে প্রতিষ্ঠিত করার আপ্রান চেষ্টা করছেন। তাকে বরিশাল সদরের শূন্য আসনে মনোনয়ন দিয়ে উপ-নির্বাচনে বিজয়ীও করা হয়েছে। কিন্তু সাংগঠনিক কর্মকান্ড শুধু নগরী জুড়ে নানা ধরনের পোষ্টার, ফেষ্টুন ও বিলবোর্ডেই সীমাবদ্ধ। এর উপর মহানগর ছাত্র লীগের কতিপয় নেতা বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের অন্যতম চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে এ নগরীতে টেন্ডারবাজী সহ নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ সম্বলিত সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গনমাধ্যমে নিয়মিতভাবে। তবে মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ মিডিয়ার এসব প্রচারকে কোন রকম তোয়াক্কা না করেই অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অবৈধ কর্মকান্ড। বিশেষ করে টেন্ডারবাজীর বদনাম থেকে কোন ক্রমেই মুক্ত হতে পারছে না মহানগর ছাত্রলীগ। “যেখানেই টেন্ডার সেখানেই ছাত্রলীগ” এটি এখন নগরীর আলোচিত উক্তি। সাংগঠনিক কর্মকান্ডে ছাত্রলীগ পিছিয়ে থাকলেও টেন্ডারবাজীতে তারা সারাদেশে ইতিমধ্যেই রেকর্ড করেছেন।
তবে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির শূন্য আসন পূরন সহ পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার লক্ষ্যে কেন্দ্রে কয়েকটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে বর্তমান সম্পাদক নির্ভর মহানগর কমিটির পক্ষ থেকে জেবুন্নেছা আফরোজকে সভাপতি করে একটি কমিটির প্রস্তাব ছাড়াও জেলা সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ’র জেষ্ঠ পুত্র এবং বরিশালের রাজনীতিতে অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে পরিচিত সাদেক আবদুল্লাহ’র নাম প্রস্তাব করে অপর একটি কমিটির প্রস্তাবনাও কেন্দ্রে পৌছান হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু কবে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মনোনয়ন বা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে তা সবার কাছেই অজ্ঞাত। এমনকি দুটি প্রস্তাবনার পক্ষে-বিপক্ষেই নানা বক্তব্য ও যুক্তি রয়েছে। যে জেবুন্নেছা আফরোজকে সভাপতি করার প্রস্তাব করা হয়েছে, তিনি কবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন নিজ দলেই তার প্রতিপক্ষরা। তাছাড়া শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পরে তার ঘনিষ্ট অনুসারীরা বিশেষ করে ৩০ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকরা ইতিমধ্যেই সাদেক আবদুল্লাহর নেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন। যার কারনে মহানগরে দিন দিন সাদেক আবদুল্লাহর পাল্লা ভারি হচ্ছে।
অপরদিকে ২০১২ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনোনীত হবার পরেও তিনি তার ঢাকার অবস্থান ঠিক রেখেছেন। তালুকদার মোঃ ইউনুসকে প্রচার সম্পাদক থেকে সম্পাদক করার পরে তিনি প্রথম দিকে স্থানীয় সাংগঠনিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত থাকলেও পরে নানা ব্যস্ততায় বেশির ভাগ সময়ই ঢাকায় থাকছেন। সাম্প্রতিক অসুস্থতায় গত কয়েক মাস তিনি ঢাকায়। ফলে স্থানীয় মধ্যম সারির কতিপয় নেতা শুধুমাত্র নানা দিবস পালনের মধ্যে দিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের কর্মকান্ডকে জানান, দিচ্ছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সব কর্মকান্ডই এখনো আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ’র নিবিড় তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবী সংগঠনটির স্থানীয় দায়িত্বশীলদের।
এমনকি আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কান্ডারী আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ দক্ষিনাঞ্চলের অন্য সব জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের মুরুব্বী হিসেবেও পরিচিত। তবে ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে তার তেমন কোন মূল্যায়ন হয়নি। এমনকি তার হাত ধরে যারা বরিশাল আওয়ামী লীগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কেন্দ্রের প্রচ্ছন্ন আশির্বাদে তাদেরকেই পরবর্তীকালে হাসানাতের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাড় করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ২০১৩ এর বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন পরাজয়ের পরে মহানগর আওয়ামী লীগের ব্যানারে এ নগরীতে হাসানাত বিরোধী মিছিলও হয়েছে। এর সাথে দু’দফায় দল ক্ষমতায় আসার পরেও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর মন্ত্রী পরিষদে কোন স্থান না পাওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোস দেখা দিয়েছে। ফলে বরিশালের সাথে তার বাস্তব যোগাযোগ কিছুটা হালকা হয়ে আছে। এতে করে সাংগঠনিক কর্মকান্ড কিছুটা হলেও ব্যাহত হচ্ছে।
এর সাথে মহানগর আওয়ামী লীগের সঙ্গে চাপা ¯œায়ু দ্বন্দ্ব রয়েছে। এ বিভাগীয় সদরে ক্ষমতাসীন জোটের মূল শরিক দলের সাংগঠনিক কর্মকান্ডে স্থবিরতা অব্যাহত রয়েছে। অপরদিকে বরিশাল মহানগরী সহ সমগ্র দক্ষিনাঞ্চল জুড়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কতিপয় নেতা-কর্মীও টেন্ডারবাজী সহ নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে আমজনতা ত্যাক্ত-বিরক্ত। ফলে সাংগঠনিক দুর্বলতা সহ এসব অনৈতিক কর্মকান্ডে সমগ্র দক্ষিনাঞ্চলেই মহাজোটের মূল শরিক দলের জন সমর্থনে ভাটির টান অব্যাহত রয়েছে বলে দাবী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের।