চোখের পানিতে সাবেক রাষ্ট্রপতিকে বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ দক্ষিণাঞ্চলবাসী তাদের একজন উপকারী স্বজনকে হারালো। বরিশাল জিলা স্কুল মাঠে সাবেক আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রথম নামাজে জানাজায় গতকাল শনিবার সব দলমতের মানুষের এটিই ছিল মূল কথা। এ জানাজায় আমজনতার ঢল নামে। চোখের পানিতে বরিশালবাসী তাদের অতি আপনজনকে বিদায় জানায়। শুক্রবার রাতেই বিভিন্ন গনমাধ্যমে সাবেক রাষ্ট্রপতির মৃত্যু সংবাদে মহানগরী সহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাতেই বিভিন্ন মসজিদের মাইকযোগে আবদুর রহমান বিশ্বাসের মৃত্যু সংবাদ প্রচার শুরু হয়। শনিবার সকালে বরিশাল নগরীতে জিলা স্কুল মাঠে সকাল সাড়ে ৯টায় নামাজে জানাজার কথা জানান দিতে মাইকিং করে বিভিন্ন সংগঠন। ৯টার আগেই হাজার হাজার মানুষ জেলা স্কুলে সমবেত হন। কিন্তু তার মরদেহ যখন জেলা স্কুলে পৌছে তখন বেলা প্রায় সাড়ে ১১টা। সকাল সাড়ে ১০টার কিছু পরে একটি বিশেষ ফ্লাইটে সাবেক রাষ্ট্রপতি-এর কফিন বরিশাল বিমান বন্দরে পৌছে। সেখান থেকে ১৬ কিলোমিটার দুরে নগরীর জিলা স্কুলে পৌছে সাড়ে ১১টার দিকে। তার মরদেহ নিয়ে বিএনপি কেন্দ্রীয় যুগ্ন মহাসচিব এ্যাড.মজিবর রহমান সরোয়ারের নেতৃত্বে দলীয় নেতা-কর্মীরা নগরীর জিলা স্কুল মাঠে নিয়ে আসেন। এরআগে বিমানবন্দরে সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের লাশ গ্রহণ করেন মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান খসরু ও শ্রমিক লীগ সভাপতি আফতাব আহমেদ। লাশের সাথে আসেন তার পুত্র শিবলী বিশ্বাস ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার।
প্রখর রোদের মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ সেখানে অপেক্ষা করছিলেন নামাজে জানাজার মাধ্যমে তাদের প্রিয় মানুষটিকে বিদায় জানাতে। নামাজে জানাজার আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সাবেক রাষ্ট্রপতি’র কফিনে পুস্পস্তবক অর্পন করেন। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক ছাড়াও পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকেও সাবেক রাষ্ট্রপতি’র কফিনে পুস্পস্তবক অর্পণ করা হয়। মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল, সম্পাদক এ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর ছাড়াও যুগ্ম সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্ল¬াহ দলের পক্ষ থেকে পুস্পস্তবক অর্পন করেন। জানাজা নামাজে উপস্থিত ছিলেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মোঃ শহিদুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আবুল কালাম আজাদ, জেলা প্রশাসক মোঃ হাবিবুর রহমান, পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডঃ মজিবর রহমান সরোয়ার, জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র কে এম শহিদুল্লাহ, বরিশাল জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক খান আলতাফ হোসেন ভুলু, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাডঃ গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাডঃ এ কে এম জাহাঙ্গির, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, বরিশাল সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদুর রহমান রিন্টু, জেলা দক্ষিণ বিএনপির সাধারন সম্পাদক এ্যাড আবুল কালাম শাহীন, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আনিসুর রহমান, মোঃ হোসেন চৌধুরী, মহানগর আ’লীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক এ্যাড. আফজালুল করিম, মহানগর জামায়েতের আমীর এ্যাড. মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম খসরু, ২১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলতাফ মাহমুদ সিকদার, দৈনিক আজকের পরিবর্তন পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক কাজী মিরাজ মাহমুদ, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান খসরু, মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি এ্যাড. মরতুজা আবেদিন, বরিশাল আইনজীবী সমিতির সিনিয়র নেতা এ্যাড. নুরুর উদ্দিন আহমেদ, মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক জিয়াউদ্দিন সিকদার, সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ফরিদ, রফিকুল ইসলাম রুনু সরদার, মহানগর বিএনপির সিনিয়র নেতা এ্যাড.আলী হায়দার বাবুল, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আকবর, জেলা আইনজীবি সমিতির সাবেক সম্পাদক এ্যাড. নাজিমউদ্দিন আহমেদ পান্না, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এ্যাড. কাজী এনায়েত হোসেন বাচ্চু, এ্যাড. আবুল কালাম আজাদ ইমন, মহানগর শ্রমিক লীগের সভাপতি আফতাব আহমেদ, জামে এবায়দুল্লাহ মসজিদের খতিব মাওঃ মির্জা নুরুর রহমান বেগ, মুক্তিযোদ্ধা এ এমজি কবির ভুলু, সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নুরুল আমিন, যুবদল মহানগর সভাপতি এ্যাড. আখতারুজ্জামান শামিম, সাধারন সম্পাদক মাসুদ হাসান মামুন, ছাত্রদল মহানগর আহবায়ক খন্দকার আবুল হাসান লিমনসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক মেয়র এ্যাড. মজিবর রহমান সারোয়ার ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি সভাপতি এবায়দুল হক চান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বক্তব্য রাখেন। এ সময় রহমান বিশ্বাসের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
তারা বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস একজন ভালো মানুষ ছিলেন। দলমত নির্বিশেষে সবার পাশে থেকে কাজ করেছেন। তাছাড়াও শায়েস্তাবাদ হাই স্কুলের শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনীতি দিয়ে তার শুরু হয়ে যুক্তফ্রন্টের রাজনীতি করেছেন। তিনি বরিশাল পৌরসভার সদস্য থেকে শুরু করে পরবর্তীতে পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য থেকে স্পীকার ও রাষ্ট্রপতির পদে আসীন ছিলেন। বরিশালের যে কোন সমস্যা সমাধানে ও উন্নয়নে তারা অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়াও বরিশালে বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। তার মৃত্যুতে বরিশালের সাধারন জনগনের অপূরনীয় ক্ষতি হলো। এসময় সকলেই তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক স্পীকার আবদুর রহমান বিশ্বাস ছিলেন দক্ষিণাঞ্চলবাসীর অত্যন্ত কাছের মানুষ। ১৯৯১-এর অক্টোবর থেকে ’৯৬-এর অক্টোবর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় তিনি বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। এমনকি ব্যক্তিগতভাবেও তিনি বহু মানুষের উপকার করেছেন। বরিশাল প্রশাসনিক বিভাগ প্রতিষ্ঠা তার অসামান্য অবদান। এছাড়াও বরিশাল বিমান বন্দর নির্মান ও জাতীয় পতাকাবাহী ফ্লাইট চালু, বরিশাল বেতার কেন্দ্র, বরিশালে ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর আধুনিকায়ন সহ নতুন অপারেশন থিয়েটার নির্মান এবং পটুয়াখালী টিভি রিলে স্টেশন নির্মান তার অনবদ্য অবদানের অন্যতম। এছাড়াও তিনি বরিশাল পৌরসভা এবং বরিশালে প্রেস ক্লাব সহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন।
আবদুর রহমান বিশ্বাস শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় পাট মন্ত্রী এবং বিচারপতি সাত্তারের মন্ত্রী সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বরিশাল সদর আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হবার পরে ১৯৯২ সালে তিনি স্পীকার নির্বাচিত হন। পরে ঐ বছরই অক্টোবরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
স্বাধীনতার পরে আবদুর রহমান বিশ্বাস কোন নির্বাচনে কখনো পরাজিত হননি। তিনি ১৯৬২ ও ’৬৫ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইন সভার সদস্য এবং ১৯৬৫ থেকে ’৬৯ সাল পর্যন্ত পার্লামেন্টারি কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯৬৭ সালে জাতিসংঘের ২২তম সাধারন অধিবেশনে যোগদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (সম্মান) এবং ইতিহাস ও আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভের পরে তিনি কিছুদিন বরিশালের অদূরে বাবুগঞ্জ পাইলট স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পরে আইন পেশায় যোগদেন। রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস ১৯৭৪ ও ১৯৭৬ সালে বরিশাল আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ১৯৭৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনের এমপি নির্বাচিত হন।
১৯২৬ সালে বরিশালের শায়েস্তাবাদে জন্মগ্রহনকারী আবদুর রহমান বিশ্বাস তার জীবদ্দশায় বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের উপকার করে গেছেন। গত কয়েক বছর ধরেই বার্ধক্যজনিত কারণে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। মাস কয়েক আগে স্ত্রী বিয়োগের পরে তিনি মানসিকভাবে আরো ভেঙে পড়েন। শুক্রবার তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে দ্রুত রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতাল ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রাত ৮টা ৪০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন।
এদিকে জিলা স্কুল মাঠে নামাজে জানাজা শেষে কিছু সময়ের জন্য তার মরদেহ নগরীর গোড়াচাঁদ দাস রোডের নিজ বাসভবন ‘বিশ্বাস ভবন’র সামনে নিয়ে রাখা হয়। পরে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে একটি বিশেষ চার্টার বিমানযোগে তার মরহেদ ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাদ আছর গুলশান আজাদ মসজিদ চত্ত্বরে নামাজে জানাজা শেষে তার মরদেহ বনানী গোরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে ঢাকার পুরানা পল্টনের বিএনপি দলীয় কার্যালয়ের সামনে এবং হাইকোর্ট চত্ত্বরে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মৃত্যুকালে রহমান বিশ্বাস ৫ ছেলে ও ২ মেয়ে, নাতি-নাতনী সহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।