চিংড়ি রেনু নিধনের মহোৎসব ॥ চুনোপুটি ধরা পড়লেও বহাল তবিয়তে রাঘব বোয়াল

রুবেল খান ॥ মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও কালাবদর নদীতে হরদম চলছে বাগদা চিংড়ি রেনুপোনা নিধনের মহোৎসব। নৌ বাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ এবং মৎস্য বিভাগের নিয়মিত টহল কার্যক্রমের মধ্যেই অবাধে শিকার হচ্ছে কোটি কোটি রেনু পোনা। যা রাতের আধারে পাঁচার হচ্ছে যশোর, খুলনা এবং সাতক্ষীরা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু পাচারকারী চক্রকে ধরতে পারছেন না প্রশাসন। কোন কোন সময় বিপুল পরিমান রেনু পোনা সহ পাঁচারকারী চুনোপুটিদের আটক করলেও ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে রাঘব বোয়ালরা। তবে অভিযোগ উঠেছে প্রশাসন এবং মৎস্য বিভাগকে ম্যানেজ করে রেনু পোনা শিকার করা হচ্ছে। এসব কারনে ক্ষমতাসীন রাঘব বোয়ালেরা ধরা ছোয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এতে করে নদীতে মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হলেও আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন রেনু পোনা পাচারকারী চক্রটি। এ চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে নগরীর হারুন ওরফে পাতিল হারুন, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের জসিম সরদার, খায়ের মৃধা, মিজান পালোয়ান, ফারুক ও সামসুর নাম শোনা যাচ্ছে।
জানা গেছে, বরিশাল এবং ভোলা জেলা ঘিরে আছে মেঘনা, তেতুলিয়া, কালাবদর এবং কীর্তনখোলা নদী। এসব নদীতে প্রতিনিয়তই বাগদা রেনু পোনা নিধন কার্যক্রম চালাচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ী ও দালাল চক্র। নিষিদ্ধ মশারি, বিহিন্দী ও কারেন্ট জাল ব্যবহারের মাধ্যমে নিধন করা হচ্ছে রেনু পোনা। অবৈধ জাল ব্যবহারে শুধুমাত্র চিংড়ি রেনু পোনাই নয়, সাথে ধ্বংস হচ্ছে টেংরা, পোয়া, তপসি সহ ৯ থেকে ১২ প্রজাজির মাছের রেনু পোনা। পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রানী। অথচ জলজ প্রাণী রক্ষায় নদীতে গলদা ও বাগদা রেনু পোনা নিধন সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু সরকারের সেই ঘোষনা বাস্তবায়নে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এবং দালাল চক্র। এমনকি চক্রটিকে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে খোদ মৎস্য বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিরুদ্ধেও।
বরিশালের হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকজন জেলেদের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা, তেতুলিয়া এবং কালাবদর নদীতে যারা চিংড়ি রেনু পোনা নিধন এবং পাচারের সাথে জড়িত তারা সবাই স্থানীয় বাসিন্দা এবং ক্ষমতাসীন দলের লোক হিসেবে পরিচিত। তারাই রেনু পোনা নিধন এবং পাচারের জন্য দালাল হিসেবে যশোর, খুলনা এবং সাতক্ষীরা থেকে জেলেদের নিয়ে এসে রেনু পোনা শিকার করাচ্ছে। তবে এদের সাথে পাচারকারী এবং দালাল চক্রের দু’একজন সদস্য সহযোগি হিসেবে থাকছে। তাছাড়া রেনু শিকারে বাহন হিসেবে ব্যবহৃত নৌকা এবং ট্রলার থেকে শুরু করে জালও সরবরাহ করছে স্থানীয় দালাল চক্রটি। রেনু পোনা নিধন কালে কোস্টগার্ড, নৌ-বাহিনীর জাহাজ, নৌ পুলিশ এবং থানা পুলিশ টহল দিলেও তাদের চোখে পড়ছে না নিধনের চিত্র। তবে এর পেছনে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারন রয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন রেনু পোনা ব্যবসায়ী জানায়, হিজলার মেঘনা নদীর পুরাতন হিজলা থেকে শুরু করে আবুপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে নদীতে রেনু পোনা নিধন করা হচ্ছে। গভীর রাত থেকে শুরু করে দিন ভর রেনু পোনা নিধন শেষে ভোর রাতে অর্থাৎ ফজরের আজান দেয়ার আগ মূহুর্তে পাতিল এবং ড্রামে ভর্তি করে পাচার হচ্ছে লাখ লাখ রেনু পোনা। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন হিজলা উপজেলার বাসিন্দা জসিম সরদার, খায়ের মৃধা, মেহেন্দিগঞ্জের মিজান পালোয়ান, ফারুক এবং সামসু সহ বেশ কয়েকজন রাঘব বোয়াল। এর মধ্যে জসিম, খায়ের, মিজান রেনু পোনা ধরিয়ে তা বিক্রি করছে ফারুক এবং সামসুর নিকট। এরা দু’জন সহ অন্যান্য সহযোগিরা তা বিক্রি এবং পাচার করছে সাতক্ষীরা, খুলনা এবং যশোর সহ বিভিন্ন স্থানে। তাছাড়া রেনু পোনা নিধনের সুবিধার্থে পাচারকারীরা ম্যানেজ করে রেখেছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দ এবং পুলিশ প্রশাসনকে।
এদিকে বাকেরগঞ্জ উপজেলার নেহালগঞ্জ, লাহারহাট ও গোমা ফেরিঘাটসহ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী দালাল চক্রের মাধ্যমে জেলেদের কাছ থেকে রেনু পোনা ক্রয় করে তা বড় ড্রামে করে প্রতিদিন ১৮টি ট্রাকে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরায় চালান করছেন। পাচারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী টুলু ও নগরীর হারুন ওরফে পাতিল হারুন। তারা মৎস্য বিভাগ থেকে শুরু করে সর্বমহলকে ম্যানেজ করছে। এর মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা পাচ্ছেন প্রায় এক লাখ টাকা। এক লাখ টাকা দেয়া হচ্ছে মৎস্য বিভাগকে। রেনু পোনা নিধন ও পাচার পক্রিয়া সফল করতে প্রায় ১৫ লাখ টাকায় ম্যানেজ করা হচ্ছে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনকে। যে কারনে বরিশাল, হিজলা, বাকেরগঞ্জ উপজেলাধীন মেঘনা, তেঁতুলিয়া এবং কালাবদর নদীতে নিয়মিত টহল ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রেনু পোনা নিধনকারীরা আটক হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে মাসোহারা দিতে বিলম্ব হলে অভিযানে নেমে রেনু পোনা সহ পাচারকারী চুনোপুটিদের আটক করছে মৎস্য বিভাগ সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু আটক হচ্ছে না এ নেপথ্যের রাঘব বোয়াল।
অবশ্য প্রশাসন এবং মৎস্য বিভাগের দাবী ভিন্নটা। মেঘনা এবং তেঁতুলিয়ার একাংশের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ কোস্টগার্ড এর কালিগঞ্জ স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার মো. ইমরান হোসেন বলেন, আমরা নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এর মধ্যে নেহালগঞ্জ থেকে ৩০ ব্যারেল রেনু পোনা সহ পাচারকারীদের আটকও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া অভিযান চালিয়ে পাচারকারীদের আটক করা সম্ভব নয়। তাছাড়া মেঘনা নদীতে পৃথক স্টেশন থাকায় সব খানে আমরা যেতে পারিনা। তার পরেও রেনু পোনা নিধনের পয়েন্টগুলোতে নজরদারী বৃদ্ধি করা হবে জানিয়ে কন্টিনজেন্ট কমান্ডার ইমরান হোসেন বলেন, যাদের আটক করা হয় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তারা কার লোক তা কেউ বলতে চাচ্ছে না। শুধুমাত্র বলেন যশোর, সাতক্ষীরা এবং খুলনা অঞ্চল সহ বিভিন্ন স্থান হতে তাদের মালিক পাঠিয়েছে রেনু পোনা শিকার করার জন্য। এর বাইরে তারা আর কোন তথ্য দিতে পারছে না। যে কারনে এর সাথে অন্য কেউ জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে হিজলা থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মাসুদুজ্জামান এর সাথে সরকারি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ এর চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।