চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে বরিশাল সহ ২১ জেলার সাড়ে ৩ কোটি মানুষ চরম দূর্ভোগে

অতিথি প্রতিবেদক ॥ চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহে দেশের পশ্চিম জোনের ২১টি জেলার প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষের জীবনে চরম দূর্ভোগ নেমে আসছে। পশ্চিম জোনে সান্ধ পিক আওয়ারে সাড়ে ১২শ’ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৭শ’ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় দেড়শ মেগাওয়াট চাহিদার স্থলে বৃহস্পতিবার সরবরাহ ৭০-৭৫ মেগাওয়াটে হৃাস করা হয়। ফলে সীমিত এ বিদ্যুৎ দিয়ে শহর এলাকায় সরবরাহে প্রাধান্য দেয়ায় গ্রামে পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের দুর্ভোগ আরো চরম আকার ধারন করেছে। হাসপাতাল থেকে পানি সরবরাহের মত জরুরী গনপরিষেবা গুলো পর্যন্ত চরম বিপর্যয়ের কবলে। দিনের বেলাতেও বিদ্যুৎ ঘাটতি একই ধরনের। প্রতি ঘন্টাতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। খোদ নগরীতে গভীর রাতেও লোড শেডিং হচ্ছে। প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ মানুষ ঘুম থেকে জেগে উঠে রাতের বেলা রাস্তায় হাটাহাটি করছে। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, লোড শেডিং এর পাশাপাশি প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ নগরবাসী দিনভর আতঙ্কে থাকে কখন বিদ্যুৎ চলে যায়। পশ্চিম জোনে ভয়াবহ এ বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলে বিতরন ও সরবরাহ ব্যবস্থা আরো নাজুক আকার ধারন করায় গনদূর্ভোগ চরম পর্যায়ে। খোদ বরিশাল মহানগরীতে ‘আকাশে মেঘ জমলেই বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়’ প্রবাদের সাথে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলেও এখন বিভ্রাট আরো বাড়ছে। চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে বরিশাল মহানগরীতে অন্তত ৩০টি বিতরন ট্রান্সফর্মার পুড়ে গেছে। গত বছরও এ নগরীতে প্রায় ২শ’ বিতরন ট্রান্সফর্মার পুড়ে গিয়েছিল। গত দিন পনের যাবতই বরিশাল ও খুলনা বিভাগ সহ ফরিদপুর অঞ্চলের ২১ জেলার পিডিবি’র পশ্চিম জোনে বিদ্যুৎ সংকট ক্রমশ বাড়ছে। প্রথমে চাহিদার ২০-২৫% ঘাটতি শুরু হলেও বৃহস্পতিবার তা পঞ্চাশভাগে উন্নীত হয়েছে। ভোলায় পিডিবি’র ২২৫ মেগাওয়াটের কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার স্টেশনটি সহ পশ্চিম জোনের একাধিক উৎপাদন ইউনিটের উৎপাদন ব্যাহত হবার পাশাপাশি পূর্বজোন থেকে সরবরাহ হৃাস করায় এ অঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সাম্প্রতিককালের ভয়াবাহ আকার ধারন করেছে।
পিডিবি সহ পশ্চিম জোনের বিদ্যুৎ বিতরন কোম্পানীর দায়িত্বশীল মহল পরিস্থিতি উত্তোরনের বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলছেন না। তবে আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে উৎপাদন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আভাস দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি দায়িত্বশীল সূত্র। একাধিক চেম্বার নেতৃবৃন্দের মতে, বিদ্যুতের অভাবে পশ্চিম জোনের ২১ জেলার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন প্রতিদিন উৎপাদন ঘাটতি হচ্ছে প্রায় ৫০ কোটি টাকার। চিকিৎসা পরিষেবার অবস্থা আরো ভয়াবহ। সরকারী-বেসরকারী সব হাসপাতালেই অনেক মুমূর্ষ রোগীর জীবন অনেকটাই বিপন্ন বিদ্যুতের অভাবে। এমনকি অনেক জরুরী অস্ত্রপচার পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে একই কারনে। মহানগরগুলোতে পানি সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ থাকছে ঘন্টার পর ঘন্টা। তবে বিদ্যুৎ ঘাটতির সাথে বিতরন ব্যবস্থার ত্রুটি চরম ভোগান্তিতে ফেলছে দক্ষিণাঞ্চলের সাধারন মানুষকে। খোদ বরিশাল মহানগরীতেই দিনরাত লোডশেডিং-এর সাথে একাধিক ফিডারে ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে বিতরন ব্যবস্থার ত্রুটির কারনে। একের পর এক ট্রান্সফর্মার পুড়ে যাচ্ছে। আর একটি ট্রান্সফর্মার পুড়ে গেলে তা পরিবর্তন বা মেরামত শেষে পুনর্বাসন করতে কত ঘন্টা বা দিন লাগবে তা বলতে পারেন না ওজোপাডিকো’র দায়িত্বশীল মহলও। নগরীর হাতেম আলী কলেজ ফিডারে গত এক সপ্তাহে নিকট দুরের দুটি ট্রান্সফর্মার পুড়ে গেছে। ঐ এলাকাবাসীর দূর্ভোগ ছিল বর্ণনার বাইরে।
অভিযোগ রয়েছে, শুধুমাত্র বরিশাল মহানগরীতে যে প্রায় ৫শ’ বিতরন টান্সফর্মার রয়েছে তার ৮০ ভাগেরও বেশী পূর্ণ লোড সীমায় চলছে। অবশিষ্ট ২০ ভাগ ওভারলোডেড। নিয়মিতভাবে ট্রান্সফর্মার অয়েল পরিক্ষা না করা সহ রক্ষনাবেক্ষনের অভাবেও তা পুড়ে যাচ্ছে। নি¤œমানের ট্রান্সফর্মার কেনার কারনেও নানা ত্রুটি অব্যাহত থাকছে। এমনকি বৃষ্টির সময় অনেক ট্রান্সফর্মারের অভ্যন্তরে পানি প্রবেশ করেও তা বিনষ্ট হচ্ছে।
একদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতি, অপরদিকে বিতরন ব্যবস্থায় লাগাতার ত্রুটির কারনে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষের দুর্ভোগ ধীরে ধীরে ক্ষোভেও পরিনত হচ্ছে।
এসব ব্যাপারে গতকাল ওজোপাডিকো’র প্রধান প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (কারিগরি) এর সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, বরিশাল মহানগরী সহ পশ্চিম জোনের বিতরন ব্যবস্থা উন্নয়নে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সহ পশ্চিম জোনে ন্যায্য হিস্যা মাফিক সরবরাহ অব্যাহত রাখার বিষয়েও পিডিবি’র সংশ্লিষ্ট মহলে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি।