চরিত্র খারাপ, তাই লঞ্চের কেবিনে স্ত্রীকে হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশালগামী এমভি পারাবত-১০ লঞ্চে স্টাফ কেবিনে স্ত্রী মিনাকে হত্যার ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে স্বামী আনিস ও তার দুই সহযোগি।
গতকাল বুধবার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক অমিত কুমার দে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিভূক্ত করেন। এসময় জবানবন্দিতে স্ত্রী মিনা আক্তারের চরিত্র খারাপ ছিলো বলে উল্লেখ করে স্বামী আনিস। জবানবন্দীতে আরও স্বীকার করে বার বার সংশোধনের চেষ্টার পরও মিনা না শোধরানোয় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করি। স্ত্রীকে হত্যার জন্য চাচাতো ভাই কামাল এবং তাদের বন্ধু তুষারের সাথে ২০ হাজার টাকা চুক্তি হয়। চুক্তির অর্ধেক টাকা আগেই পরিশোধ করেছিলাম। বাকী টাকা হত্যার পর শোধ করার কথা। লঞ্চের কেবিনে মিনা ঘুমিয়ে পড়লে রাত ২ টার দিকে কক্ষ থেকে বের হয়ে যাই। কালাম ও তুষারকে কেবিনে ঢুকিয়ে দেই। তারা দুইজন মাংস কাটার কাজে ব্যবহৃত একটি ছুরি দিয়ে ঘুমন্ত মিনার গলায় উপর্যপুরি আঘাত করে হত্যা করে।
বিচারকের কাছে এভাবেই লোমহর্ষক এই হত্যাকান্ডের বর্ণনা করে আনিস। সে ছাড়া তার চাচাতো ভাই মো. কামাল ও তাদের বন্ধু তুষারও আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে তারা প্রত্যেকেই নিহত মিনা আক্তারের চরিত্র খারাপ ছিলো বলে উল্লেখ করেন। এছাড়াও ঈদের পর আনিস দেখা করতে গেলে স্থানীয়রা আনিসের অনিচ্ছা সত্বেও মিনার সাথে বিয়ে দিয়ে দেয় বলেও স্বীকার করে।
আদালতসূত্র জানায়, আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়ার পরে সন্ধ্যায় ৩ আসামিকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতয়ালী মডেল থানার এসআই আবু তাহের জানান, নিহত মিনার বাড়ি কুমিল্লার হোমনায়। মিনা ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করত। ঈদ-উল-ফিতরের ৭ দিন আগে তার সাথে মুঠোফোনে পরিচয় হয় সাভারের জুতার দোকানের কর্মচারী আনিসের। পরিচয় এবং প্রেমের সূত্র ধরে গত ঈদ-উল-ফিতরের পর আনিস মিনার সাথে দেখা করতে যায়। এসময় মিনার ইচ্ছেমত স্থানীয়রা জোর করে ধরে আনিসের সাথে বিয়ে দেয়। পরে মিনার সাথে একমাস সংসার করে আনিস। এছাড়াও মিনার চারিত্রিক ত্রুটি চোখে পড়ে আনিসের। এর পরেই মোহ ভঙ্গ হয় আনিসের। তাই মিনাকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে সে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কুয়াকাটা বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে মিনাকে নিয়ে গত সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকার সদরঘাট থেকে বরিশালগামী এমভি পারাবত-১০ লঞ্চের তৃতীয় তলার একটি স্টাফ কেবিন ভাড়া নেয় আনিস। ওই লঞ্চেই যাত্রী ছিলো কামাল ও তার বন্ধু তুষার। রাত দুইটার দিকে মিনা ঘুমিয়ে পড়লে আনিস কক্ষ থেকে বের হয়ে কালাম ও তুষারকে কেবিনে ঢুকিয়ে দেয়। তারা ঘুমন্ত মিনার গলায় উপর্যপুরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এ সময় তার ধস্তাধস্তি ও গোঙ্গানির শব্দ পেয়ে পাশের লোকজন টের পেয়ে ওই কেবিনে ঢুকতে গেলে তাদেরও ছুরি নিয়ে কোপাতে তেড়ে যায় সহযোগী কামাল ও তুষার। লঞ্চের কর্মচারী এবং যাত্রীরা বাইরে থেকে ওই কেবিনের কক্ষের দরজা আটকে দেয়। অপরদিকে লঞ্চের ছাদ থেকে নিহতের স্বামী আনিসকে আটক করে তারা।
মঙ্গলবার ভোরে লঞ্চটি বরিশাল নদী বন্দরে পৌঁছালে আটক ৩ জনকে হেফাজতে নেয় কোতয়ালী পুলিশ। তাদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটিও জব্দ করে তারা।
পরে মঙ্গলবার রাতেই নিহত মিনার ছোট ভাই নাসির উদ্দিন বাদী হয়ে ঘাতক স্বামী আনিস, তার চাচাতো ভাই কালাম ও তাদের বন্ধু তুষারকে অভিযুক্ত করে কোতয়ালী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আসামিদের মধ্যে আনিস ও কালামের বাড়ি শরীয়তপুরের গোশাইর হাটে এবং তুষারের বাড়ি নওগাঁ জেলায়।