চরবাড়িয়া ইউপির গুরুত্বপূর্ন সড়ক কীর্তনখোলায় বিলীন

সাইদ মেমন ॥ কীর্তনখোলা নদীর ভাঙ্গনের কারনে বাড়ি-ঘরের পর কর্মের জন্য নগরীর সাথে যোগাযোগের একমাত্র রাস্তাও হারিয়েছে চরবাড়িয়া ইউপি’র তিন ওয়ার্ডের প্রায় ১৫ হাজার বাসিন্দা। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষনে কীর্তনখোলা নদীর পানি বৃদ্ধি ও ¯্রােতের কারনে ভেঙ্গে গেছে চরবাড়িয়া ইউপির মধ্য চরবাড়িয়া, উত্তর লামছড়ি ও দক্ষিন লামছড়ি গ্রামের বাসিন্দাদের একমাত্র ভেড়িবাঁধ সড়ক। এটি ভেঙ্গে যাওয়ায় সংযোগ হয়ে গেছে কীর্তনখোলা ও আড়িয়াল খা নদী।
এই ভাঙ্গনে কীর্তনখোলা নদীর তীরের ৮ পরিবার হুমকির মুখে থাকায় গতকাল শনিবার তাদের ঘর সরিয়ে নিয়েছে। এতে ঘর ছাড়া হয়ে পড়েছে ওই পরিবার। এছাড়াও সড়কটি ভেঙ্গে যাওয়ায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা দুইটি ইটভাটা ও একটি বড় ধরনের পোল্টি ফার্মসহ এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছে। সকলের মুখে হাহাকার। সড়কের অভাবে তারা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়বেন চারন দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের লাইব্রেরী ও কবর স্থানে দূরদুরান্ত থেকে শিক্ষা সফরে আসা শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা। এই সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার জন্য সকলে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দায়ী করেছেন। তাদের দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙ্গন থেকে সড়ক রক্ষায় অর্থ বরাদ্ধের পর কাজ শুরু করেনি।
স্থানীয় ইউপি বাসিন্দা জালাল হোসেন জানান, আড়িয়াল খা নদীর পানি প্রবেশ রুখতে দেয়া বাঁধ সড়কটি শুক্রবার দিনগত গভীর রাতে সরদার বাড়ির পশ্চিম অংশ দিয়ে ৬০ ফুটের মতো ভেঙ্গে গেছে। কীর্তনখোলা নদীর ভাঙ্গনে ওই তিন গ্রামের চলাচলের প্রধান সড়কটি বেশ কয়েক বছর পূর্বে ভেঙ্গে যাওয়ায় বাধ সড়কটি নগরীতে সড়ক পথে আসা যাওয়ার এক মাত্র পথ ছিলো। ওই সড়ক ছাড়াও ভেঙ্গে যাওয়া অংশের আশে পাশে হুমকিতে থাকা তার (জালাল) নিজেরসহ শাহিন হাওলাদার, দুলাল হাওলাদার, বাবুল হাওলাদার, হারুন হাওলাদার, রশিদ তালুকদার ও আনিচ বেপারীর ঘর ভেঙ্গে সরিয়ে নিয়েছেন। এসব কৃষিজীবী পরিবার কীর্তনখোলার ভাঙ্গনে পড়ে একাধিকবার ঘর ভেঙ্গে সরিয়ে এনেছিলো। নদীতে শুধু জমি বিলীন হয়নি। ঘর সরিয়ে নিয়ে নতুন করে উত্তোলনে আর্থিক ব্যয়ে সকলেই প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। আবার নতুন করে জমি ক্রয় এবং ঘর উত্তোলন সকলের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য সেবাদানকারী মো. মুনী জানান, ওই সড়ক দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন শতাধিক কলেজ শিক্ষার্থী, অর্ধশত স্কুলগামী শিশু, দেড় শতাধিক সরকারী-বেসরকারী চাকুরিজীবী, শতাধিক শ্রমিক যাতায়াত করেন। এছাড়া দেশের চারন দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের নির্মিত লাইব্রেরী ও তার কবর পরিদর্শনে প্রায় প্রতিদিন দূর-দুরান্ত থেকে শিক্ষা সফরে আসে। রয়েছে দুইটি জিগজ্যাগ ইটভাটা, একটি বড়সহ বেশ কয়েকটি পোল্টি ফার্ম। এরা সকলেই বিপাকে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ রাসেল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংবাদ প্রকাশ করে কোন লাভ কি হয়েছে। গত ভাঙ্গনের পর নদী অবরোধ করছে গ্রামের লোকজন, অনেকে এসে অনেক কিছু বলে গেছে। রাস্তাটা যাতে নদীগর্ভে বিলীন না হয় সেজন্য ইটবাটা ওয়ালার নিজের প্রয়োজেন সেটাকে রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু গ্রামের কৃষকের ফসলি জমি, হতদরিদ্রের বসতিঘর রক্ষা করবে কে ?
ভাঙ্গন কবলিত এলাকার বাসিন্দা তোফাজ্জল মীর জানান, ভাঙনের ভয়ে বর্ষা শুরু হতে না হতেই রাতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একত্রে ঘুমাতে পারিনা। এ শুধু আমার জন্য নয়, এ গ্রামের বহু মানুষ রাত যেগে তাদের স্বজনদের পাহাড়া দেয়।
গত বছরের আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে নদী ভাঙন রোধে বাধ নির্মানের দাবীতে ওইসব এলাকায় দফায় দফায় মানববন্ধন, নদী অবরোধ, বিভিন্ন দফতরে স্মারকলিপি প্রদানও করা হয়। বহু অফিসের কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানসহ বহু নেতা এসেছিলো, তারা বলেছিলো নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা হবে, হবে এর প্রতিকার, তবে আর কবে হবে সে প্রতিকার।
ইটভাটা ব্যবসায়ী মো. ইউনুস মিয়া সড়কটি ভেঙ্গে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তার ইমা ও পাশের গোল্ড নামে দুইটি জিগজ্যাগ ইটভাটা রয়েছে। ওই দুই ভাটায় ৫ কোটি টাকা করে ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। দুই ইটভাটার ক্রেতা নগরীর হওয়ায় তারা সড়ক নির্ভর। তাই সড়কটি ভেঙ্গে যাওয়ায় মহা বিপদে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তাদের সাথে সাথে কোটি টাকা ব্যয়ে নিশা পোল্টি ফিড কর্তৃপক্ষ মারাত্মক সমস্যায় পড়েছে।
চরবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম সাবু বলেন, গুরুত্বপূর্ন সড়কটি রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফলতি রয়েছে। তিনি জানান, এর আগে সেখানে মাত্র ৪ লাখ টাকার বালুভর্তি ব্যাগ ফেলে ১০ লাখ টাকা লুট করেছে। আরো তিন কোটি টাকা বরাদ্ধ ও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্নের পরে কাজ শুরু করা হয়নি। এই কারনে জনগন ভোগান্তিতে পড়েছে।
কীর্তনখোলার ভাঙ্গনে শহর ঘেষা বেলতলা ফেরির গ্যাংওয়ে দেবে যাওয়ায় পরিবর্তন করতে হয়েছে জায়গা এবং বন্ধ রাখা হয়েছে ফেরি চলাচল। পাশাপাশি ধংসের মুখে রয়েছে দুটি শিপইয়ার্ড। এ বিষয়ে সদর উপজেলার চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু জানান, চরবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামসহ বেলতলা ফেরিঘাট, সুন্দরবন ডকইয়ার্ড, সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের নদীসংলগ্ন গাইড ওয়াল হুমকির মধ্যে রয়েছে। প্রতিরাতেই এসব এলাকার বিভিন্ন স্থান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে ইতিমধ্যে তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তপক্ষের সাথে কথা বলেছেন, তারা মন্ত্রনালয়কে বিষয়টি নতুন করে অবহিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন আহম্মেদ জানান, কীর্তনখোলা নদীর ভাঙন থেকে বেলতলা এলাকার ২৩ শত মিটার এবং চরবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানের ২৩ শত মিটার এলাকা রক্ষার জন্য ২৩ কোটি টাকা করে ৪৬ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের জন্য জলবায়ু ট্রাষ্ট্রের গত বছর মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে চরবাড়িয়া প্রকল্পে ৩ কোটি টাকার একটি বরাদ্দ পেয়েছেন তারা। যা দিয়ে চরবাড়িয়া এলাকায় নদী ভাঙন কবলিত এলাকায় ৯৪ মিটার কাজ করা হবে। তিনি জানান, এছাড়া জরুরী ভাঙন রোধে ২৩ লাখ টাকার বরাদ্ধ পাওয়া গেছে, যা দিয়ে ভাঙন এলাকায় জিওব্যাগ ফেলা হবে।