চরফ্যাশনে দুই মাদরাসা শিক্ষকের অন্যের ইনডেস্ক ব্যবহার করে ১৬ বছর ধরে বেতন উত্তোলন !

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ মোহাম্মদপুর দাখিল মাদরাসার কথিত সুপার মোঃ ইউনুছ ও সহকারি শিক্ষক মোঃ হাবিবুল্লাহ নামের মিল থাকায় অন্যের ইনডেক্স ব্যবহার করে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর যাবত সরকারের বেতন ভাতা উত্তোলন করে আত্মসাত করছেন। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে তাদের এই ভয়াবহ দুর্নীতির প্রমান সহ আবেদনের পর বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। এই দুর্নীতির তদন্তের জন্য পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন হলেও তদন্ত কর্মকর্তারা গুছ হয়ে যাওয়ায় দুর্নীতির আসল চিত্র এখনো প্রকাশিত হয়নি।
প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করে জানা যায়, চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ মোহাম্মদপুর দাখিল মাদরাসাটি ১৯৯৪ সালে এমপিও ভুক্ত হয়। তখন এই মাদরাসার দাখিল শাখায় মোঃ ইউনুছ নামে একজন সহকারি শিক্ষক ছিলেন যার ইনডেস্ক নম্বর ৩৬৪৯৭২ আর ইবতেদায়ী শাখায় ছিলেন মোঃ হাবিবুল্লাহ নামে অপর একজন জুনিয়র শিক্ষক। যার ইনডেস্ক নম্বর ইবি ৩৬৪৯৭৪। এই দুজন শিক্ষক ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে এই মাদরাসা থেকে চাকুরি ছেড়ে চলে যান। এর কিছুদিন পর মারা যান প্রকৃত ইনডেক্সধারী শিক্ষক মোঃ ইউনুছ।
এরপর একই উপজেলার মিয়াজানপুর রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মোঃ ইউনুছ নামের মিল থাকার সুযোগ নিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সহায়তায় সাবেক শিক্ষক মোঃ ইউনুছের ইনডেক্সটি নিজের বলে দাবী করে ১৯৯৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর একই পদে যোগদান করেন।
একইভাবে নামের মিল রেখে ইউনুছের শ্যালক হাবিবুল্লাহও জুনিয়র শিক্ষক হাবিবুল্লাহর ইনডেক্সটি নিজের দাবী করে ১৯৯৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সহকারি মৌলভী পদে যোগ দেন। তিনি ইবতেদায়ীর ইনডেক্স ব্যবহার করলেও এখন চাকুরি করছেন দাখিল কোঠায়। অভিযুক্ত দুজন শিক্ষকই ১৯৯৯ সালে এই মাদরাসায় যোগ দিলেও তাদের ইনডেস্ক ১৯৯৪ সালের।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, সহকারি মৌলভী হাবিবুল্লাহর ইনডেক্স (ইবি ৩৬৪৯৭৪) ১৯৯৪ সালের হলেও তিনি আলিম পাশ করেছেন ১৯৯৫ সালে। যার প্রমান সংরক্ষিত রয়েছে।
এসব বিষয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বরিশাল শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অভিযোগ পেয়ে ভোলা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা ভোলা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক জাকিরুল হক ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্নীতিবাজ এই দুই শিক্ষকের নানা কূটকৌশলে গুছ হয়ে প্রকৃত চিত্র আড়াল করে সাদামাটা ও দায়সারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা জাকিরুল হক জানান, তদন্ত প্রতিবেদন আমি কয়েকমাস আগেই ডিডি স্যারের কাছে জমা দিয়েছি। আপনি সেখান থেকে তথ্য জেনে নিন।
অপরদিকে ভোলা জেলা শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় চরফ্যাশন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সামালগীর হোসেনকে। তিনিও প্রকৃত চিত্র আড়াল করে তদন্ত প্রতিবেদন দেয় বলে অভিযোগ করেছেন ওই মাদরাসায় কর্মরত একাধিক শিক্ষক।
তদন্ত কর্মকর্তা সামালগীর হোসেন বলেন, মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটিকে ম্যানেজ করে তারা এ ধরনের কাজ করেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি বলেন, ফাইল না দেখে এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।
অভিযুক্ত শিক্ষক মোঃ ইউনুস জানান, তিনি ১৯৯৬ সালে ওই মাদরাসায় যোগ দিয়েছেন, তবে ১৯৯৪ সালের ইনডেক্স ব্যবহার করছেন কিভাবে ? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
একইভাবে অপর অভিযুক্ত শিক্ষক মোঃ হাবিবুল্লাহর কাছে জানতে চাওয়া হয় আপনি ১৯৯৫ সালে আলিম পাশ করে ১৯৯৪ সালের ইনডেস্ক ব্যবহার করছেন কিভাবে? এমন প্রশ্নেরও কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। হাবিবুল্লাহ বলেন, ম্যানেজিং কমিটি আমাদেরকে কিভাবে নিয়োগ দিয়েছে বিষয়টি তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন।
দক্ষিণ মোহাম্মদপুর দাখিল মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোঃ আবদুল খালেক জানান, আমি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হয়েছি মাত্র এক বছর। এর আগে কারা কিভাবে এই মাদরাসায় যোগ দিয়েছে কিংবা কে কার ইনডেক্স ব্যবহার করছে এ বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এসব বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মাদরাসা) মোঃ আবুল হোসেনের বক্তব্য জানার জন্য তার মোবাইল ফোন নম্বরে একাধীকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেন নি।