ঘুষ তহবিল ॥ ইমেজ সংকটে বিএমপি ॥॥ ৩ এএসআইসহ ১০ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত ॥ ঘুষ আদায় হয়েছে ৭৭ লাখ টাকা, ব্যাংকে আছে ১৭ লাখ ॥ ঘুষের ৬০ লাখ টাকা নিয়ে গপ্প ॥॥

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ঘুষ ফান্ড এই নগরীর শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার কাছে এ সংস্থাটির ইমেজকে সংকটে ফেলেছে। প্রশ্ন উঠেছে কাদেরকে দেয়ার জন্য পুলিশের ১০ সদস্য ৭৭ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেছিল। কেন পুলিশ হেডকোয়ার্টারকে তদন্ত করে এই কেলেংকারী ধরতে হলো। কি দায়িত্ব পালন করেছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনেক কথা মুখ থেকে মুখে চষে বেড়াচ্ছে। অনেক আগে থেকেই বিএমপির ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে কথা উঠেছে। এই নগরীতে একের পর এক জুয়ার আড্ডা চলেছে পুলিশের সামনেই, চলেছে নগ্ন নৃত্য, এমন কি এই নগরীতে যা কোনদিন ঘটেনি সেই ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লটারীর নামে জুয়ার ফলাফল অশ্রাব্য অশ্লীল ভাষায় প্রকাশ্যে সম্প্রচার করা হয়েছে। পুলিশ এর একটিরও দায় অস্বীকার করতে পারে না। এতো সবের পরও পুলিশের ঘুষ নিয়ে কথা উঠলেও প্রমাণ করা যায়নি। এবারে ফেঁসেছে পুলিশ। পদোন্নতি পেতে ঘুষের তহবিল গঠন করায় বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ৩ এএসআইসহ ১০ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘুষের

তহবিল গঠনের অভিযোগ প্রাপ্তির পর পুলিশ সদর দপ্তরের প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা প্রমানিত হওয়ায় গত সোমবার রাতে তাদের বরখাস্তের আদেশ দেয়া হয়। বরখাস্তকৃতরা ৭৭ লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করলেও ঘুষ রাখার ব্যাংক হিসাব নম্বরে পাওয়া গেছে ১৭ লাখ টাকা। বাকী ৬০ লাখ নিয়েও গুজব রয়েছে। এদিকে ঘটনা অধিকতর তদন্তে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কার্যালয় সূত্র জানায়, গত বছরের নভেম্বর মাসে মেট্রোপলিটনে কর্মরত কনস্টেবল থেকে এএসআই পর্যন্ত প্রায় ৮শ’পুলিশ সদস্য পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এদের মধ্যে ৩৩২ জন পদোন্নতি পায়। যার মধ্যেই ২৩০ জনই কনস্টেবল পদোন্নতি পেলেও তাদের পদায়নের কোন জায়গা ছিল না। তাই পুলিশ সদর দপ্তরে প্রস্তাব আকারে পড়ে থাকা বরিশাল মেট্রোপলিটনের জনবল কাঠামো পাশের লক্ষ্যে মন্ত্রনালয়ে তদবির করার জন্য বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্যরা ঘুষের তহবিল গঠনে বরিশাল নগরীর সদর রোডস্থ ডাচ বাংলা ব্যাংকে একটি হিসাব নম্বর খোলেন। এরপর আদায়কৃত ঘুষের টাকা ওই হিসাব নম্বরে জমা রাখে। বিষয়টি জানাজানি হলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। এরপর বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরে অবিহিত করা হলে সেখান থেকে প্রাথমিক তদন্তে ৩ এএসআইসহ ১০ পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্তার প্রমাণ পাওয়ার পর তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
বরখাস্তকৃতরা হলো এএসআই মো. আনিসুজ্জমান, মনির হোসেন ও আবু হানিফ, নায়েক কবির হোসেন, কনস্টেবল শহীদুল ইসলাম, বাবুল হালদার, আব্বাস উদ্দিন, আরিফুর রহমান, তাপস কুমার মন্ডল ও দোলন বড়াল। এদের মধ্যে এএসআই আনিসুজ্জামান, নায়েক কবির হোসেন ও কনস্টেবল বাবুল হালদারের নামে ডাচবাংলা ব্যাংকের বরিশাল শাখার হিসাব নম্বরে ঘুষের ১৭ লাখ টাকা জমা রয়েছে। পদোন্নতিতে আগ্রহী ২৩০ সদস্যের মধ্যে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে ইতিমধ্যে ৭৭ লাখ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযুক্তরা পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত কমিটির কাছে স্বীকার করেছে। বাকী ৬০ লাখ টাকা নিয়ে যে কথা শোনা যাচ্ছে তা হলো বিএমপির একজন পদস্থ কর্মকর্তার কাছে এটা রাখা হয়েছিল। ঢাকার তদন্তের পর তিনি তা স্বীকারও করেছেন এই বলে যে ‘ওরা রেখে গেছে, কেন রেখেছে তিনি জানেন না’। পুলিশ সদর দপ্তর এ বিষয়টি সাধারণ ভাবে নেয়নি। যে কোন মুহূর্তে আসতে পারে আরো কঠোর নির্দেশনা। বলা হচ্ছে যার কাছে ৬০ লাখ টাকা রাখা হয় তিনি যেমন এই ঘটনায় ফেঁসে যাচ্ছেন ঠিক তেমনি কার নির্দেশে তিনি এই টাকা রেখেছিলেন তারাও পার পাচ্ছেন না।
এদিকে এ ঘটনার অধিকতর তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ। এই তদন্তে আর কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান মেট্রো পুলিশের উপ-কমিশনার (সদর) শোয়েব আহাম্মদ। তিনি জানান, এই বিষয় তাদের জিরো টলারেন্স। পুলিশ সদর দপ্তর আদায় করা টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শৈবালকান্তি জানান, সাময়িক বরখাস্তকৃতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাছাড়া এ ঘটনার সাথে পুলিশের অন্য কোন সদস্য জড়িত আছে কিনা তা বের করতে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সর্বপরি যে সত্য আজ বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তা দীর্ঘ দিনের এলোমেলো অবস্থার ফল। এমনটা দাবি করে সচেতন মহল থেকে বলা হয়েছে যাদের নির্দেশে এএসআই, নায়েক ও কনেস্টেবলরা এ টাকা দীর্ঘদিন বসে সংগ্রহ করেছে, তাদের চেনাটা পুলিশের মান সম্মানের জন্য এখন সবার আগে প্রয়োজন। তাদের মতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসন কতটা বেখেয়ালি ও উদাসীন কিংবা নড়বড়ে হলে এমন ঘুষ ফান্ড সাধারণ পুলিশ সদস্যরা গঠন করতে পারে তা আজ বিবেচ্য বিষয়। ১০ জনকে বহিষ্কারের মধ্যে এ ঘটনা ধামাচাপা না দিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের উচিত হবে এ ঘটনার মূল উৎপাটন করা। তা হলে অনেকের মুখোশ উন্মোচিত হবে। সম্মান ফিরে পাবে বিএমপি।