ঘন কুয়াশায় সড়ক ও নৌ যোগাযোগ বিপর্যস্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ গতকাল শেষ রাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় সড়ক ও নৌ-যোগাযোগে বিপর্যয়ের পাশাপাশি সমগ্র দক্ষিনাঞ্চলের জনজীবনে চরম দূর্ভোগ নেমে আসে। মধ্যরাতের পর থেকে গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত দেশের দুটি প্রধান ফেরি সেক্টর সহ ৩টি ফেরি পথে যানবাহন পারাপার বন্ধ থাকায় দেড় সহ¯্রাধিক যানবাহন আটকা পরে পদ্মা ও তেঁতুলিয়ার পাড়ে। হাজার হাজার যাত্রীর দূর্ভোগ ছিল সব বর্ণনার বাইরে। রাজধানীর সাথে দক্ষিনাঞ্চলের যাত্রীবাহী নৌযোগাযোগও ব্যাহত হয়। পাশাপাশি লাগাতার শৈত্য প্রবাহের সাথে গতকাল পুনরায় মাঝারী থেকে ঘন কুয়াশায় বোরো বীজতলা সহ শীতকালীন শাক-সবজীর ক্ষতির আশংকা আরো একদফা বৃদ্ধি করল। আবহাওয়া বিভাগ থেকে দক্ষিনাঞ্চল সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারী কুয়াশা অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রা কিছুটা বৃদ্ধির সুসংবাদও দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
বুধবার সারা দেশের সাথে দক্ষিনাঞ্চলেও সাম্প্রতিককালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ঐদিন সকালে বরিশালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৬.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস। যা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ৫.২ ডিগ্রী কম। বুধবার তাপমাত্রা কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়ে পারদ ৮.৩ ডিগ্রীতের উন্নীত হয়। কিন্তু গতকাল তা পুনরায় ৭.৬ ডিগ্রীতে নেমে আসে। সাথে শেষ রাতের ঘন কুয়াশার চাঁদরে সকাল প্রায় ১০টা পর্যন্ত দিগন্ত ঢেকে থাকায় জনজীবনে আরো দূর্ভোগ নেমে আসে। হিম ঠান্ডার সাথে ঘন কুয়াশায় বোরো বীজতলা সহ রবি ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি আরো বেড়ে গেল। গত কয়েকদিন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের ৪-৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস নিচে থাকলেও কুয়াশা না থাকায় ফসলের ঝুকি তুলনামূলক কম ছিল।
কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার রাতের প্রথম প্রহর থেকে ঘন কুয়াশা শীতের দূর্ভোগকে আরো এক দফা বৃদ্ধি করে। বুধবার মধ্যরাতের পর থেকে গতকাল সকাল প্রায় ১০টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় সড়ক ও নৌযোগাযোগে নতুন বিপর্যয় সৃষ্টি হয় দক্ষিনাঞ্চলে। ঘন কুয়াশায় পদ্মার বুক ঢেকে যাওয়ায় রাজধানীর সাথে বরিশাল ও খুলনা বিভাগ সহ ফরিদপুর অঞ্চলের ২১টি জেলার সংক্ষিপ্ত সড়ক পথের মাওয়া সেক্টরের শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী রুটে রাত আড়াইটার দিকেই ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল সকাল সোয়া ৯টায় যানবাহন পারাপার শুরু হলেও ঐ সেক্টরে পদ্মার দুপাড়ে প্রায় ৭শ’ যানবাহন আটকা পরে।
অপরদিকে দেশের প্রধান ফেরি সেক্টর আরিচা সেক্টরের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে গতকাল সকাল ৪টা ১০ মিনিটে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায় ঘন কুয়াশার কারনে। গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত ঐ সেক্টরের ১৬টি ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয় ঘন কুয়াশা পদ্মার বুক দখল করায়। এসময়কালে পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাটে প্রায় সাড়ে ৭শ যানবাহন আটকা পরে। একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় চট্টগ্রাম-বরিশাল-মোংলা-খুলনা মহাসড়কের ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী ভেদুরিয়া-লাহারহাট ফেরি রুটেও। গতকাল সকাল ৪টা থেকে ৮টা পর্যন্ত ঐ রুটের ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয় তেতুলিয়া নদী বুক ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাবার কারনে। সকাল ৮টার পরে ফেরি রুটটির দুপাড়ে প্রায় দেড়শ যানবাহন অপেক্ষমান থাকার মধ্যেই বিআইডব্লিউটসির দুটি ইউটিলিটি ফেরি যানবাহন পারাপার শুরু করে।
বুধবার মধ্যরাত থেকে গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত দেশের ৩টি ফেরি সেক্টরে যানবাহন পারাপার বন্ধ থাকায় দেশের দক্ষিনাঞ্চলের ২১টি জেলার সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় চরম বিপর্যয় নেমে আসে। ঐসব সেক্টরগুলোতে বিপুল সংখ্যক যানবাহন ৫-৭ঘন্টা পর্যন্ত আটকে থাকায় চরম দূর্ভোগে পরেন হাজার-হাজার যাত্রী সহ যানবাহনের চালকগন। বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু সহ অনেক বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দূর্ভোগ লাঘবের কিছুই ছিলনা। ফেরি ঘাটগুলোতে স্বাস্থ্য সম্মত প্রয়োজনীয় শৌচাগার না থাকায় বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ও চালকদের দূর্ভোগ সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। পচনশীল পণ্যবাহী বিপুল সংখ্যক ট্রাক আটকা পড়ায় সময়মত তা গন্তব্যে পৌছতে পারেনি।
এদিকে ঘন কুয়াশায় অর্ধ লক্ষাধিক যাত্রী নিয়ে বরিশাল সহ দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ায় প্রায় ১শ যাত্রীবাহী নৌযান গতকাল শেষ রাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকার অদুরে আটকা পরে। বাগেরহাট-পিরোজপুর-ঝালকাঠী-বরিশাল-চাঁদপুর হয়ে ঢাকামুখি বিআইডব্লিউটিসি’র রকেট স্টিমার ‘এমভি বাঙালী’ গতকাল সকাল সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ঢাকার অদূরে ফতুল্লার কাছে আটকে ছিল। নৌযানটি নির্ধারিত সময়ের ৪ ঘন্টা পরে গতকাল সকাল ১০টায় ঢাকায় পৌছে। অপরদিকে ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল হয়ে খুলনামুখী রকেট স্টিমার ‘পিএস মাহসুদ’ গতকাল সকাল ৬টায় বরিশাল থেকে যাত্রা করার আধ ঘন্টার মাথায় দপদপিয়ার কাছে কির্তনখোলা নদীতে নোঙর ফেলে ঘন কুয়াশার কারনে। প্রায় দু’ঘন্টা আটকে থাকার পরে নৌযানটি গন্তব্যে যাত্রা করেছে।
আবহাওয়া বিভাগের বুলেটিনে উপমহাদেশের উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানের কথা জানিয়ে মৌসুমী লঘুচাপ দক্ষিন বঙ্গোপসাগরে অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। অস্থায়ী মেঘলা আকাশ সহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকার কথা জানিয়ে আজ সকালের পরবর্তী ৪৮ ঘন্টায় আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনের কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় যশোরে ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস।