গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন ॥ রেজা হত্যাকারীরা ধরা ছোয়ার বাইরে ॥ সন্দেহের তীর এক শীর্ষ ছাত্র নেতার দিকে

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিম রেজাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। গতকাল শনিবার নিহত রেজার ভাই রিয়াজ উদ্দিন বাদী হয়ে কোতয়ালী মডেল থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন। এখন শুধু মামলাটি পুলিশের গ্রহণ করার অপেক্ষায়। দাখিলকৃত এজাহারে ৯ জনের নাম উল্লেখ করা ছাড়াও অজ্ঞাত আরো ৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা আসামিরা হলো- হরিজন কলোনীর ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী জাহিদ, পলাশ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র সাইদুল ইসলাম, ক্যাম্পাস সংলগ্নের বাসিন্দা যুবলীগ সদস্য মেহেদী হাসান, রিয়াজ, বেল্লাল, মাসুম সহ আরো দু’জনের নাম উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত দু’জনকে ঢাকায় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে মেহেদী হাসান এর অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি। তার চোখে একটি অস্ত্রপচার হলেও ২৪ ঘন্টা না পার হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকগণ। অবশ্য অপরজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত আসাদুজ্জামান ফাহিম শংকামুক্ত বলে তার স্বজনরা জানিয়েছে।
এদিকে গতকাল শনিবার নিহত রেজার লাশের ময়ন্ত তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। পরবর্তীতে তার চির চেনা পলিটেকনিক ক্যাম্পাসে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার প্রথম নামাজে জানাযা শেষে লাশ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার গড়িপাশা গ্রামের নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিম রেজাকে।
দুপুর ১টার দিকে পলিটেকনিক ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত নামাজে জানাযায় অংশগ্রহণ করেন বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, যুবলীগ নেতা এ্যাড. রফিকুল ইসলাম খোকন, ছাত্রলীগ বরিশাল জেলার সভাপতি হেমায়েত উদ্দিন সুমন সেরনিয়াবাত, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। জানাযা নামাজের পূর্বে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নিহত রেজার রাজনৈতিক গুরু আব্দুর রাজ্জাক। তার কান্নার শব্দে স্তব্দ হয়ে যায় গোটা ক্যাম্পাস এলাকা। এসময় মহানগর আওয়ামীলীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ তাকে শান্তনা দেন।
অপরদিকে ঘটনার প্রায় ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গেলেও পুলিশ আটক করতে পারেনি রেজা হত্যার কিলিং মিশনে অংশ নেয়া সন্ত্রাসীদের। ফলে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যে কোন সময় সন্ত্রাসীদের আটক দাবীর ইস্যুতে পলিটেকনিক ক্যাম্পাস অচল করে দিতে পারে তারা।
শুক্রবার রাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ের ঢিল ছোড়া দূরত্বে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিউটের মূল ফটকে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে যখম করে পলিটেকনিক ছাত্রলীগ নেতা রেজা সহ তার চার অনুসারীকে। আতহ অবস্থায় তাদের বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাতে অপারেশন টেবিলেই মৃত্যু হয় রেজার। তাছাড়া গুরুতর আহত ফাহিম ও মেহেদীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে।
নিহত রেজা বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পাস করে রাজধানীতে অতীশ দীপংকর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সফটওয়ার বিষয়ের বিএসসি শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলো বলে তার ভাই জানিয়েছেন।
কোতয়ালী মডেল থানার এসআই আসাদুজ্জামান জানান, কয়েকদিন পূর্বে নগরীর আমির কুটির এলাকার হরিজন কলোনীর বাসিন্দা সন্ত্রাসী জাহিদ ধারালো অস্ত্র সহ ক্যাম্পাসে এসে সিভিল ২য় বর্ষের ছাত্র মোর্শেদের কাছে চাঁদা দাবী করে। এসময় রেজা অনুসারীরা তাকে গণধোলাই দিয়ে ধারালো রাম দা সহ পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এই কারণেই সে ক্ষিপ্ত হয়। সেই সুযোগকে কাজে লাগান ছাত্রলীগের সুযোগ সন্ধানি মহল। মহলটির ইন্দোনেই শুক্রবার রাতে ক্যাম্পাসের প্রবেশ দ্বারে রেজা সহ তার সহযোগিদের উপর স্বশস্ত্র হামলা চালায়।
কলেজ সূত্র থেকে জানা গেছে, নিহত রেজাউল ইসলাম রেজা পটুয়াখালীর বাউফলের গরিপাশা গ্রামের মৃত. আব্দুল ছত্তারের ছেলে। সে বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ২০০৬ সাল ব্যাচের ছাত্র ছিল। ২০১১ সালে পাস করার পরই ঢাকার অতীশ দীপংকর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি’তে ভর্তি হয়। ওই সময় সে পলিটেকনিক ছাত্রলীগের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করতো। এর পাশাপাশি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকের অনুসারী হিসেবে পরিচিত রেজা ছাত্রলীগের মহানগর কেন্দ্রিক রাজনীতি করতো। মহানগর ছাত্রলীগের আসন্ন কমিটির সম্ভাব্য সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন রেজা। এ প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও তার জন্য কাল হয়েছে। রেজা হত্যাকান্ডে মহানগর ছাত্রলীগের এক শীর্ষ নেতার প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছেন। রেজা ক্যাম্পাসে অতি পরিচিত ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে বিরোধী পক্ষ ক্যাম্পাস দখলে ব্যর্থ হয়। এ কারণে প্রতিপক্ষরা সব সময় রেজার সকল কর্মকান্ডের উপর নজর রাখতো। সুযোগ পেলেই তার অনুসারীদের উপর হামলা চালাতো। পলিটেকনিক থেকে রেজার আধিপত্য খর্ব করাই ছিল প্রতিপক্ষের প্রধান টার্গেট। সেই টার্গেটে প্রাণ হারাতে হলো রেজাকে। ২০১০ সালে রেজা বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক থাকাকালে ক্যাম্পাসে ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রকাশ্যে দলীয় প্রতিপক্ষকে কোপানের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ওই কোপানোর স্থির ও ভিডিও চিত্র তখন দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। তখন কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি ইকবাল বাহার চৌধুরীকে ঘটনার জন্য দায়ি করে ক্লোজ করা হয়েছিল। অথচ ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও রেজার হত্যাকারীদের আটক দূরের কথা তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোন অভিযান চোখে পড়েনি নগরবাসীর। আর এ কারণে রেজা হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। আর কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশের বিরুদ্ধেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এদিকে গতকাল সকালে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়না তদন্ত শেষে বাদ জোহর পলিটেকনিক কলেজ মাঠে হত্যাকান্ডের শিকার রেজার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা, মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ এবং সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মী, কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। সেখানের সামনের কাতারে রেজার ঘাতকদের ইন্ধনদাতাদের দেখা গেছে। অথচ জানাযায় অংশ নিতে পারেনি রেজার অনুসারীরা। পরে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় পটুয়াখালীর বাউফলের গরিপাশা গ্রামের বাড়িতে। লাশ পৌছানোর সাথে সাথে আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে গ্রামবাসীরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তাদের কান্না কাঁদিয়েছে সকলকে। পরিবারের কেউ মানতেই পারছিল না রেজা পৃথিবীতে নেই। সেখানে বাদ আছর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে তার মরদেহ পরিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম শুভ। এ ঘটনায় রেজার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়ের করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। আলোচিত ওই ঘটনার ২৪ ঘন্টা অতিবাহিত হলেও জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এতে নিহত ও আহতদের পরিবারের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি আতাউর রহমান জানান, মর্গে ময়না তদন্ত শেষে রেজার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। হতাহতের ঘটনায় গতকাল বিকেল পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন ওসি। তবে ফের যে কোন অনাকাঙ্খীত পরিস্থিতি মোকাবেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত শুক্রবার বিকেলে সাইদুলকে কলেজ ক্যাম্পাসে আটক করে রেজার অনুসারীরা। মোবাইলে রেজা তাকে ছেড়ে দিতে বললে তারা সাইদুলকে ছেড়ে দেয়। এরপর রেজা ক্যাম্পাসে গিয়ে তার অনুসারীদের শান্ত করেন। আর সাইদুল রেজাসহ তার অনুসারীদের উপর হামলা চালাতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসের বাহিরে অবস্থান নেয়। রাতে রেজা, ফাহিম, নিপুন ও মেহেদী ২টি মোটর সাইকেলযোগে কলেজের গেট অতিক্রমকালে রড দিয়ে পিটিয়ে তাদেরকে মোটর সাইকেল থেকে ফেলে দেয়া হয়। এরপর চলে চারজনের উপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপ। তাদের ডাক-চিৎকারে আবাসিক হলের ছাত্র ও স্থানীরা এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। চারজনকে উদ্ধার করে মেডিকেলে নেয়া হলে রেজা মারা যায়।