গোপন রাজনীতিতে ব্যস্ত মহানগর আ’লীগের সুবিধাবাদী নেতারা

রুবেল খান॥ বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে চলছে গোপন রাজনীতি। এ কমিটির সভাপতি শওকত হোসেন হিরন’র মৃত্যুর পরে তার অনুসারী অনেক নেতাকর্মি গোপনে ও প্রকাশ্যে পক্ষ ত্যাগ করেছেন। ভবিষ্যত নেতৃত্বের ভাবনায় সিংহভাহ অনুসারীরা গোপন রাজনীতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেক নেতা-কর্মীরা আবার নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে উভয় পক্ষের সাথে সম্পর্ক রাখার রাজনীতি করছে।
২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর বরিশাল নগরীসহ জেলায় আ’লীগের নেতা-কর্মীরা এক রকম আত্মগোপনে চলে যায়। যারাও ছিলো তারা কোণঠাসা অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। এই সময় নেতা-কর্মীদের হাল ধরেন জাতীয় পার্টি থেকে সাবেক চীফহুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর হাত ধরে আ’লীগে আসা এ্যাড. শওকত হোসেন হিরন। আ’লীগের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে রাজনীতিবিদদের দুর্যোগকাল হিসেবে অভিহিত ওয়ান ইলেভেনের সময় বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে শওকত হোসেন হিরন নেতা-কর্মিদের মাঝে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। শুধু নেতা-কর্মী নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং কেন্দ্রের প্রভাবশালী নেতাদের  সাথে সু-সম্পর্ক তৈরি করেন। এর মাধ্যমে প্রকাশ্যে নয়, কিন্তু গোপনে আ’লীগের নগরীর রাজনীতিতে নিজের একটি বলয় তৈরি করেন প্রয়াত সাবেক এই মেয়র। এতে কোণঠাসা হয়ে পরে তার নেতৃত্ব মেনে না নেয়া আ’লীগের জেলা ও মহানগরের অনেক নেতা-কর্মী। সিটি মেয়র হিসেবে ৪ বছর ৭ মাসে শুধু নিজ দলের বিরোধী নেতাকর্মী নয়, অন্য দলের নেতাকর্মীদের গণ জোয়ারের মতো নিজ বলয়ে নিয়ে আসেন বরিশাল সদর আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হওয়া প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন। এতে নিজ দলের জেলা ও মহানগরের বিরোধী পক্ষ প্রায় শূন্যের কাছে চলে যায়।
বরিশাল মহানগরের আ’লীগের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে হিরন সভাপতি হয়। একান্ত বিশ্বাসী হিসেবে এ্যাড. আফজালুল করিমকে সাধারন সম্পাদক হিসেবে বেছে নেন তিনি। এছাড়াও সহযোগি সংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগে আধিপত্য বিস্তার করতে নিজের বিশ্বাসীদের পদ-পদবিতে নিয়ে আসেন। প্রয়াত হিরনের অনুসারী হিসেবে এসব নেতাকর্মীরা শুধু পদ-পদবি পায়নি, নিজেদের পকেট ভারী করেছেন। শওকত হোসেন হিরন মারা যাওয়ার পর তার অনুসারীরা রাজনীতিতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চিন্তিত হয়ে পড়েন।
সাবেক চীফহুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপির বড় ছেলে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা নগরীর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠলে তাদের চিন্তা দুঃচিন্তায় পরিনত হয়। প্রয়াত হিরনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত অনেক নেতা-কর্মী তাদের মতাদর্শের জলাঞ্জলি দিয়ে নেতৃত্বের আশায় কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র আশে পাশে ঘোরা শুরু করে।  এতে মহানগরীর রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে সাদিক আব্দুল্লাহর। বিশেষ করে তরুন নেতৃত্বের প্রতি  মহানগর আ’লীগের অনেকেই আস্থা প্রকাশ করেছেন। দলীয় কর্মসূচী ছাড়াও সামাজিক কর্মকান্ডে ব্যাপক অংশ গ্রহনের কারনে ইতিমধ্যেই সাদেক আব্দুল্লাহ নিজ বলয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
শওকত হোসেন হিরনের শূণ্যতা পূরনে মহানগর আ’লীগের হাল ধরতে রাজনীতিতে সক্রিয় হন তার সহধর্মীনি ও বরিশাল সদর আসনের এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ। মহানগর আ’লীগের সভাপতি হিসেবে একাংশের সমর্থন পাচ্ছেন তিনি। এতে দলীয় হাই কমান্ডের সমর্থন রয়েছে বলে গুঞ্জন রটেছে।
আর জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় মহানগর আ’লীগের সাধারন সম্পাদক হিসেবে তার নাম উঠে আসে নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে। এতে সাধারন সম্পাদক এ্যাড. আফজালুল করিম স্ব-পদ বহাল রাখতে কেন্দ্রে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থায় পড়া এই এ্যাড আফজাল হিরন অনুসারী নেতা-কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বরাবরই এ্যাডঃ আফজাল বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তার দাবী তিনি ভোটের মাধ্যমে সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। জনপ্রিয়তা না থাকলে এটি হতো না।
এদিকে সভাপতি পদের জন্য জেবুন্নেছা ছাড়াও রয়েছেন রাজনীতিক ও নির্বাচনী হিসাব নিকাশে দক্ষ প্রার্থী কর্নেল (অবঃ) জাহিদ ফারুক শামীম ও মহানগর আ’লীগের সাবেক সভাপতি এ্যাড. গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল। এদের মধ্যে রজনৈতিক কর্মস্পৃহা বেশ ভালো থাকায় আ’লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাদের মধ্যে একজনকে নগর আ’লীগের সভাপতি করতে পারেন বলেও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কে হচ্ছেন মহানগর আওয়ামীলীগের কান্ডারী তা এখনো নিশ্চিত নন নেতা-কর্মীরা।
ফলে পূর্বের নীতির অবক্ষয় ঘটিয়ে নেতৃত্ব ও রাজনেতিক অস্তিত্ব ধরে রাখতে হিরন অনুসারীরা গোপন রাজনীতিতে ডুব দিয়েছেন।  তাই সভাপতি ও সম্পাদক যেই হোক না কেনো নিজেদের অবস্থান ঠিক রেখেই চলেছেন তারা। সুযোগবাদী নেতারা প্রকাশ্যে কাউকে একক ভাবে সমর্থন করছেন না। সুযোগবাদীরা নিজেদের বর্তমান ও ভবিষ্যত অবস্থান টিকিয়ে রাখতে সদর আসনের এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ, কর্নেল (অবঃ) জাহিদ ফারুক শামীম ও গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল এবং কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র সাথে কৌশলে যোগাযোগ এবং সখ্য বজায় রেখে চলেছেন। তারা ওই নেতাদের সাথে রাজনৈতিক কোন কর্মসুচিতে অংশগ্রহণ করে নয়, বাসায় ও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রাখছে।