গলাচিপায় ট্রিপল মার্ডার ॥ খুনের আগেই খুনের আশঙ্কায় ছিলেন নিহতরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ প্রকাশ্যে মা-বাবা আর মেয়েকে খুনের হুমকি দেয়া হয়েছিল। তাই খুনের আশঙ্কায় ছিলেন তারা। সেই আশঙ্কা থেকে মুক্তি পেতে আদালতেও গিয়েছিলেন। মামলাও দায়ের করেছিলেন। আদেশের অপেক্ষায় ছিল মামলাটি। কিন্তু আদেশ পৌছানের আগেই খুনের আশঙ্কা সত্যি হল।
দুবৃত্তদের হাতে নির্মম ভাবে খুন হলেন তারা। এরা হলেন- পটুয়াখালীর গলাচিপার দেলোয়ার হোসেন মোল্লা (৬৫), তার স্ত্রী পারভীন বেগম (৫৫) এবং তাদের মেয়ে কাজলি আক্তার (১৫)। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ছৈলাবুনিয়া গ্রামে গত বুধবার রাতে পরিবারের তিন সদস্য হত্যার ঘটনা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে। নির্মম এ হত্যাকা-ের নেপথ্যের কারণ নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। তবে এ ঘটনার মাত্র ৬ মাস আগে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একই পরিবারের আরেক সদস্য খুন হয়েছিলো। সেই খুনের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বার পরিবারের তিন সদস্যকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। ধারাবাহিক খুনের ধারণার ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
দুটি মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী শামীম মিয়া। তিনি বলেন, চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পারভীন বেগমের ভাসুর ছেলে শফি ওরফে মাহিনের ওপর তার ফুফাতো ভাইয়েরা হামলা চালায়। গুরুতর অবস্থায় তা উদ্ধার করে প্রথমে পটুয়াখালী পরে ঢাকায় ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। ওই ঘটনায় নিহতের বাবা ইদ্রিস মোল্লা বাদী হয়ে যে মামলাটি দায়ের করেন ওই মামলার স্বাক্ষী ছিলেন দেলোয়ার দম্পতি।
হত্যা মামলার আসামিদের আত্মীয়রা ওই বছরের ৩০ মার্চ একইভাবে দেলোয়ার দম্পতির ওপর হামলার চেষ্টা করে। আত্মরক্ষার জন্য তারা ঘরে আশ্রয় নেয়। তখন আসামিরা তাদেরকে খুনের হুমকি দেয়। ওই ঘটনায় পারভীন বেগম ১২ এপ্রিল গলাচিপা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৩২ জনের বিরুদ্ধে ১০৭ ধারার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। দেলোয়ার সেই মামলার স্বাক্ষী ছিলেন। যার মামলা নং এমপি ১৫৮/১৭। মামলায় খুনের হুমকি দেয়ার বিষয়টি রয়েছে। কিন্তু আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি আমলে নিলেও এখন পর্যন্ত কোন আদেশ দেননি বলে আইনজীবী শামীম মিয়া এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
এদিকে তিন খুনের ব্যাপারে পুলিশ বলছে, মঙ্গলবার রাতের কোন এক সময় দুবৃত্তদের হাতে বাবা-মা আর মেয়ে খুন হয়েছেন। বুধবার বিকেলে খুনের বিষয়টি প্রথম নজরে আসে। প্রতিবেশী হনুফা বেগম তার হাস খুজতে গিয়ে খুনের ঘটনা জানতে পান।
হনুফা বেগম বলেন, বিকেলে হাস খুজতেই তিনি ইদ্রিসের ঘর লাগোয়া পুকুর পাড়ে গিয়ে ছিলেন। তখন ঘরের ভেতর ছাগল আর মুরগির ডাকাডাকি শুনে পেয়ে কাছে যান। ঘরের ভেতরে কেউ আছেন কিনা তিনি জানতে চান। কিন্তু তার ডাকাডাকিতে কেউ সায় না দেয়ায় দরজার ফাঁক গলে চোখ ভেতরে চেতেই তিনি চমকে যান। দেখেন মশারির ভেতরে জড়িয়ে থাকাবস্থায় রক্তমাখা লাশ পড়ে আছে। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসন অবহিত হয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। উদ্ধারকৃত কাজলি বেগমের মাথা ছিল দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে দেলোয়ার হোসেন ও পারভিন বেগমের শরীরে অসংখ্য কোপের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ রাতেই লাশ দুটো উদ্ধার শেষে তা ময়না তদন্তের জন্য পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। পুলিশও বলছে, শফিক খুনের ঘটনার ধারাবাহিকতায় মা-বাবা আর মেয়েকে খুন করা হয়েছে। তবে শফিকের মতো এবারও খুনের ঘটনার নেপথ্যে পারিবারিক বিরোধ কাজ করেছে। এ ঘটনায় ইদ্রিস মোল্লা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছে।
ইদ্রিস মোল্লা বলেন, তার চাচাতো ভাই বজলু মোল্লা। তার আপন বেন রোকেয়া বেগমের সাথে বজলু মোল্লার বিয়ে হয়। জমিজমা নিয়ে তার চাচাতো ভাই বজু মোল্লার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের বিরোধ। তিনি বেঁচে নেই কিন্তু তার সাত ছেলের সঙ্গে সেই বিরোধ রয়েই গেছে। সেই বিরোধের জের ধরে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি তার স্কুল পড়ুয়া ছেলে শফি (১৬) মোল্লার ওপর হামলা চালায়। এক পর্যায়ে তারা শফিকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে।
ইদ্রিস মোল্লা আরো বলেন, মুমূর্ষ অবস্থায় শফিককে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে বজলু মোল্লার ছেলেদেরকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই শফিক হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষী ছিলেন তার ভাই দেলোয়ার মোল্লা ও তার ভাবী পারভীন বেগম।
তিনি বলেন, ছেলে হত্যার পর নিজের নিরাপত্তার জন্য বাড়ি থেকে পটুয়াখালীর শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছেন। তার অবর্তমানে ঘরে ভাই-ভাবী তাদের মেয়ে নিয়ে থাকতেন। মূলত হত্যা মামলা থেকে রেহাই পেতেই আসামিরা তিনজনকে খুন করেছেন।
শফি হত্যা মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ বিভাগের (সিআইডি) অধীনে তদন্ত চলছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির উপ-পরিদর্শক (এসআই ) সেলিম সরদার বলেন, ঘটনার পর থেকেই হত্যার মামলার আসামিরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। একাধিকবার অভিযান চালিয়েও তাদেরকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরো বলেন, হত্যা মামলার দুই স্বাক্ষী দেলোয়ার ও তার স্ত্রী পারভীন বেগম সম্প্রতি স্বাক্ষী দিয়েছেন। ওই ঘটনার পর দেলোয়ার দম্পতি খুন হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখেইে শফি হত্যা মামলার তদন্ত এগিয়ে নেয়া হবে।
পুলিশ সুপারেরর দায়িত্বে থানা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, শফিক হত্যা মামলার আসামিরা ঘটনার পর থেকেই পলাতক। নিহত দম্পতি ওই মামলার স্বাক্ষী। তাদের সঙ্গে পারিবারিক ভাবেই আসামিদের বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জের ধরেই খুনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে। স্বাক্ষীদের খুনের সময় তাদের পালিত মেয়ে দেখে ফেলায় তাকের গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে তদন্তেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে করা এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত।