গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন এর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বরিশাল গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়। একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি এমনকি সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে বহাল তবিয়তে থাকা সুবিধাবাদী দলের এই কর্মকর্তার লাগাম টেনে ধরতে পারছে না কেউ। ফলে উপর মহলকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর টিকে থাকার পাশাপাশি সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে নিজের পকেট ভারি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয় নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে থাকা ছদ্মবেশি ঠিকাদার জাকির হোসেনের যোগ সাজসে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে অনেক ক্ষুদে সন্ত্রাসীরা।
তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন ফরিদপুরের বাসিন্দা জাকির হোসেন। উপরস্থ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বরিশালে বদলি হয়ে আসার পর পরই অস্বস্তি দেখা দেয় সাধারন ঠিকাদারদের মাঝে। কোন প্রকার বিজ্ঞপ্তি বা টেন্ডার ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কাজ দিয়ে দিয়েছেন তার পছন্দের ঠিকাদারদের। এতে সাধারন ঠিকাদাররা বঞ্চিত হলেও পকেট ভারি হয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেনের। শুধু তাই নয়, ঠিকাদারদের কাজ দেয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত এমনকি তাদের কাজের বিল আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমন একটি অভিযোগে দুর্নীতিবাজ নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন একজন ঠিকাদার।
গণপূর্ত বিভাগের বেশ কয়েকজন ঠিকাদার জানায়, জাকির হোসেন একজন নির্বাহী প্রকৌশলী হলেও তিনি ছদ্মবেশে একজন ঠিকাদার। গণপূর্ত বিভাগের অধিকাংশ কাজই তার অর্থে হয়ে থাকে। নিজে থেকে কাজ না করলেও তার ভাড়া করা ঠিকাদার দিয়ে সকল কাজ পরিচালনা করেন তিনি।
ঠিকাদাররা তথ্য প্রকাশ করে বলেন, জাকির হোসেন বরিশালে এসে শুধুমাত্র গণপূর্ত দপ্তর দুর্নীতির আখড়া খানায়ই পরিণত করেন নি, তার নেতৃত্বে রয়েছে একটি সন্ত্রাসী বাহিনীও। কোন ঠিকাদার তার অনিয়ম এবং দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে ঐ সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সায়েস্তা করা হয় তাদের। বিনিময় সন্ত্রাসী বাহিনী পাচ্ছে মোটা অংকের টাকার কাজ।
এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বেশ কয়েকজন ঠিকাদার জানান, কিছু দিন পূর্বে চুন্নু নামের এক ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে তাকে কাজ কিংবা উৎকোচের টাকা ফেরত দেয়া হয়নি। টাকা চাওয়ায় চুন্নু নামের ঐ ঠিকাদারের পূর্বে করা কাজের পাওনা টাকাও আটকে দেয়। এর প্রতিবাদ করায় নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন তার পোষা সন্ত্রাসীদের দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায় ঠিকাদার চুন্নুর উপর। জাকির হোসেনের সন্ত্রাসীদের কোপে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছাড়াও এই ঘটনায় জাকির হোসেন এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ঠিকাদার চুন্নু। কিন্তু জাকির হোসেনের অর্থের দাপটে এখন পর্যন্ত দায়েরকৃত ঐ মামলার চার্জশিট আদালত পর্যন্ত গিয়ে পৌছায়নি বলে অভিযোগ করেছেন চুন্নু নামের ঐ ঠিকাদার।
ঠিকাদাররা আরো জানায়, নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন নিজেই ছদ্মবেশে থেকে ঠিকাদারী করছেন। মেসার্স এআইপি ট্রেডার্স, মেসার্স বিদ্যুৎ প্রবাহ, মেসার্স ডি প্যারামাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও জিলানি এন্টার প্রাইজ নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ করছেন। নিজে সরকারী কর্মকর্তা হওয়ায় নগরীর এক সময়ের ভবঘুরে এবং বর্তমানে জাকির হোসেনের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য জিলানী, মিন্টু মৃধা, টুকু, আফজাল ও অপুকে দিয়ে তার কাজের দেখা শুনা করাচ্ছে। তবে এদের পূর্বে নগরীর কাশিপুর এলাকার টেন্ডারবাজ মিজানকে দিয়ে সব কাজ পরিচালনা করতো জাকির হোসেন।
গণপূর্ত বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে জানায়, সর্বশেষ তার দুর্নীতির প্রভাব পড়েছে স্বয়ং গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের গেটের উপর। এ গেটটি ক্ষতিগ্রস্ত দাবী করে কোন প্রকার দরপত্র আহবানের আগেই গেটটি ভেঙ্গেচুড়ে আবার নির্মাণ কাজ শুরুও করে দিয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী। আর এ কাজটি তার পোষা সন্ত্রাসীদের মাসিক বেতন হিসেবে উপহার দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তারা। কিন্তু উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ার তার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না কেউ। প্রতিবাদ করলে তাকে সাইজ করে রাখেন নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন। ইতোপূর্বে তার অপকর্মের প্রতিবাদ করায় বদলি হতে হয়েছে গণপূর্তের বেশ কয়েকজন কর্মচারীকে। এর প্রতিবাদে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে সাধারন কর্মচারী এবং ট্রেড ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা। যা ইতোপূর্বে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে।
ঠিকাদাররা অভিযোগ করে বলেন, জাকির হোসেন এর পূর্বে যে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলো তার সময়ে ১২/১৫ ভাগ কম দরে প্রতিটি কাজ বৈধ প্রক্রিয়ায় ঠিকাদাররা পেতো। কিন্তু জাকির হোসেনের গত দু’বছরে এক প্রকার সব কাজই সমহারে প্রদান করা হচ্ছে। তার একক সিদ্ধান্তে টেন্ডার ছাড়াই পিপিআর আমান্য করে নিজস্ব এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ ভাগ বাটোয়ারা করে দিচ্ছে। তবে প্রতিটি কাজ থেকেই ১২ পার্সেন্ট করে উৎকোচ আদায় করে নিচ্ছেন জাকির হোসেন। এতে করে গত দুই বছরে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব লোকসানে পড়লেও পকেট ভারি হয়েছে জাকির হোসেনের। এসব ছাড়াও জাকির হোসেন এর বিরুদ্ধে রয়েছে আরো বহু অভিযোগ রয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে পাঠকদের সামনে নিয়ে আসা হবে।