খননকাজে যান্ত্রিক ত্রুটি ও ফাঁকি নাব্যতা সংকটে বন্ধ হয়ে যেতে পারে ঢাকা-বরিশাল নৌ রুট

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ব্যক্তি মালিকানাধীন ড্রেজার দিয়ে ডুবোচর অপসারণ করার জন্য ভোগান্তিতে রয়েছে বরিশাল-ঢাকা রুটের লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে ড্রেজিং বন্ধ থাকায় নাব্যতা সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘাট ত্যাগ করতে পারছে না বরিশাল-ঢাকা রুটের লঞ্চগুলো। আসন্ন শীত মৌসুমে এই সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে। রোববার নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক থেকে দেড় ঘন্টা পর ৪টি লঞ্চ ঘাট ত্যাগ করলেও গতকাল সোমবার ওই সমস্যায় পড়েছে আরো একটি লঞ্চ।
বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের উপ-পরিচালক আবুল বাশার মজুমদার বলেন, সোমবার পূর্ব থেকে সকল লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে নাব্যতা সংকটের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। এই কারনে তারা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে জোয়ারের সময় ঘাট ত্যাগ করেছিল। কিন্তু কালাম খান -১ লঞ্চ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘাট ত্যাগ করতে পারেনি। আধা ঘন্টা পরে ঘাট ত্যাগ করেছে। তবে বিআইডব্লিউটিএ’র নিয়মানুসারে লঞ্চ চালাতে গেলে যাত্রীদের রোষানলে পড়তে পারে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ এমন আভাস দিয়েছেন লঞ্চ মালিকরা। এদিকে লঞ্চঘাট এলাকার একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাইভেট কোম্পানীকে নদী খননের কাজ দেয়া হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে খনন কাজ বন্ধ থাকায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া খনন কাজ কখন হচ্ছে এবং কি পরিমাণ হচ্ছে তার কোন মনিটরিংও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
লঞ্চ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের খনন কাজে বড় ধরনের ফাঁকি থাকে। যার কারনে নাব্যতা সংকট দূর হচ্ছে না। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে লঞ্চ ছাড়া হচ্ছে।
প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএ কয়েকদিন পূর্বে পন্টুন ও ডুবোচর এলাকা খনন করে। নামে মাত্র খনন করার ফলে কোন কাজ হচ্ছে না। ওই সকল স্থানে লঞ্চগুলো আটকা পড়ছে।
শীত মৌসুমের পূর্বে খনন কাজ সম্পন্ন না হলে ডুবোচর কুয়াশার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। এতে করে বরিশাল-ঢাকা নৌরুটে বড় ধরণের দুর্ঘটনার শংকায় পড়তে হবে বলে জানান নৌ বন্দর সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
শুকনো মৌসুম আসতে না আসতেই ঢাকা-বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ১২টি নৌরুটে নাব্যতা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এরমধ্যে কয়েকটি পয়েন্ট বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে লঞ্চ ছাড়তে এবং যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নৌ-যানগুলোও তাদের নির্ধারিত সিডিউল রক্ষা করতে পারছে না।
তবে বড় শংকার কথা জানিয়েছেন সুন্দরবন লঞ্চের মালিক ও উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু। তিনি বলেন, শীত মৌসুমের পূর্বে খনন করা না হলে লঞ্চ বন্ধ করে দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। কারন ডুবোচরের কারনে লঞ্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। একটি পাখা ভেঙ্গে গেলে তো ৫ লাখ টাকার ক্ষতিতে পড়তে হয়। তাই খনন করা না হলে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখতে হবে।
কীর্তনখোলা লঞ্চের মালিক মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস বলেন, রোববার তার লঞ্চ আটকে পড়ে ৪৫ মিনিট পরে ঘাট ত্যাগ করেছে। এতে যাত্রীরা উত্তেজিত হয়। এছাড়াও ঘাট ত্যাগের চেষ্টা করতে গিয়ে বাড়তি দুই ব্যারেল তেল পুড়তে হয়েছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিআইডব্লিউটিএর উদাসীনতার কারনে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।
সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খনন কাজ হচ্ছে। কিন্তু কোন কাজে আসছে না।
তিনি বলেন, নদী কোথায় খনন করতে হবে তা লঞ্চের মাষ্টার ভালো জানে। নদী খননের পূর্বে তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে করতে হবে। এই জন্য তো মালিক সমিতি রয়েছে। তাদের সাথে যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে। তা না করে ইচ্ছেমতো যেখানে খুশি সেখানে খনন করা হয়। যা কাজে আসে না। তাই বার বার খনন করা হয়।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে খনন কাজ কিভাবে হচ্ছে তার কোন তদারকি নেই। কতক্ষণ খনন করা হয় তার হিসেব কেউ রাখে না। সকলে যোগ সাজসে নামে মাত্র কাজ করে সিংহভাগ টাকা আত্মসাত করা হচ্ছে।
সুরভী লঞ্চের পরিচালক রেজিন-উল কবির বলেন, শনিবার রাতে তাদের এবং সুন্দরবন নেভিগেশনের দুটি লঞ্চ মিয়ারচরে একঘন্টা আটকে ছিল। রোববার নির্ধারিত সময়ের আগে পন্টুন এলাকায় পানি কমে যাত্রী বোঝাই লঞ্চগুলো আটকে পড়ে। তাই সঠিক সময়ে লঞ্চগুলো গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে পারেনি।
ঢাকা-বরিশাল নৌ-রুটে প্রতিদিন দক্ষিণাঞ্চল থেকে হাজার হাজার যাত্রী এবং মালামাল পরিবহন করা হলেও এই রুটটি অজ্ঞাত কারণে অবহেলিতই রয়ে গেছে।