ক্ষতিকর ঘন চিনিতে বাজার সয়লাব

রুবেল খান॥ মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর ঘন চিনিতে ছেয়ে গেছে বরিশালের হাট বাজার। বিষাক্ত সার ম্যাগনেসিয়াম সালফেট মিশ্রিত এই চিনি দিয়ে অবাধে উৎপাদন হচ্ছে শিশু খাদ্য ও সেমাই সহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও প্রতিরোধে দেখা যাচ্ছে না প্রশাসনিক কোন পদক্ষেপ। ফলে মারাক্তক স্বাস্থ্য ঝুকিতে পড়তে হচ্ছে বরিশালবাসীকে।
তথ্যানুসন্ধ্যানে জানাগেছে, মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর সোডিয়াম সাইক্লোমেট। বহু মূল্যবান সডিয়াম সাইক্লোমেট এর মূল্য কমাতে এর সাথে মেশানো হয় বিষাক্ত সার ম্যাগনেসিয়াম সালফেট। এভাবে বিষের সাথে বিষ মিশিয়ে বানানো হয় বিকল্প চিনি। আর বাজারে এর নাম দেয়া হয়েছে ঘন চিনি। গুনের দিক থেকেও অনেক আগানো মানবদেহের জন্য ভয়াবহ এই বিষাক্ত চিনি। বিশেষজ্ঞদের দেয়া মতামত অনুযায়ী ক্যামিকাল মিশ্রিত এক কেজি ঘন চিনি দিয়ে ৫০ কেজি আসল চিনির কাজ হয়ে থাকে। ফলে মিল কারখানা এবং খাদ্য সামগ্রী উৎপাদন কেন্দ্র গুলোতে এর প্রচলন বেশি বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ দিয়ে তৈরী হচ্ছে মিষ্টি ও মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য, চকোলেট, আইসক্রিম, কনডেন্সড মিল্ক, বেকারি ও বেভারেজ দ্রব্য। সম্প্রতি একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী ১৯৬০ সালে যুক্তরাজ্য এবং ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ঘন চিনির ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশেও এ রাসায়নিক আমদানি নিষিদ্ধ।
কিন্তু দেখতে একই রকম হওয়ায় ২০০৭ সাল থেকে একটি প্রভাবশালী চক্র সাইট্রি এসিড, সোডিয়াম সাইট্রেট ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেট নাম দিয়ে বাংলাদেশে হাজার হাজার টন এই রাসায়নিক সার আমদানি শুরু করে। আর এগুলো বাজারজাত করছে ঢাকার মিটফোর্ড ও চট্রগ্রাম শহ আমানত মাজার গেটের কিছু অসাধু পাকাইরী ব্যবসায়ীরা।
টেলিভিশনটিতে আরো প্রচার করা হয়, প্রায় মাস খানেক পূর্বে চট্টগ্রাম বিনিয়োগ বোর্ডের পরিচালক (যুগ্ম-সচিব) মো. মাহবুব কবীর ভেজাল ঘন চিনির সন্ধ্যান পান। পরে তিনি বাজার থেকে ঘন চিনি সংগ্রহ করে রাজধানীর খামারবাড়ীতে মৃত্তিকা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণাগারে পরীক্ষা করে তাতে সোডিয়াম সাইক্লামেটের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে তা জানিয়ে দেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে কড়া নজরদারী বৃদ্ধির ফলে ঘন চিনি আমদানী কমে যায়। তবে বাজারে ছড়িয়ে থাকা এসব ঘন চিনি বিনষ্ট করতে মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না তেমন কোন তৎপরতা। যে কারনে এখনো দেদারছে বিক্রি হচ্ছে মানব দেহের জন্য মারাক্তক ক্ষতিকর এসব ঘন চিনি। গতকাল রবিবার নগরীর ফরিয়াপট্টি এলাকায় বিভিন্ন পাইকারী বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখাগেছে ঘন চিনি বিকি কিনির চিত্র। এই চিনি মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর জানা সত্যেও তারা মন হিসেবে বিক্রি করছে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে। তবে প্রকাশ্যে তা সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে ঘন চিনি খুচরা বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। খুচরা বিক্রেতাদের থেকে নগরীর বিভিন্ন শিশু খাদ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠান, সেমাই কারখানা এবং আসক্রিম কারখানাগুলোতেই মন হিসেবে এসব ঘন চিনি বেশি বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আড়ৎ এর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে এ ক্ষেত্রে পরিচিত লোক ছাড়া ঘন চিনির বিষয়টি আড়ৎদাররা অন্য কারো কাছে প্রকাশ করছে না। এমনটিই প্রত্যক্ষ করা গেছে সরেজামিন পরিদর্শণ কালে।
এদিকে সোডিয়াম সাইক্লামেট ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেট মানব দেহের জন্য মারাক্তক ক্ষতিকর উল্লেখ করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, এসব ক্যামিকাল যুক্ত খাবার খেলে ক্যান্সার, কিডনি বিকল, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে মানুষ। এমনকি এতে মানুষের মৃত্যুও অবধারীত। তাই এসব বিষাক্ত এবং মরনঘাতক ঘন চিনি ব্যবহার না করাটাই শ্রেয় বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। পাশাপাশি বাজারে এমন চিনি বিক্রি হলে সেটা মানুষের জন্য আরো ভয়াবহ। কেননা না জেনে মানুষ তা কিনে নিয়ে খাচ্ছে। তাই বাজারে এমন বিষ বিক্রি বন্ধে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিশেষ গুরুত্বব দেয়া উচিৎ বলেও মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান।