কোতোয়াল কাহিনী নপুংসকের নগরী কি তবে বরিশাল?

॥ শওকত মিলটন ॥ বরিশাল। আমার এবং আমাদেরও প্রিয় বরিশাল। এই বরিশাল হাজার হাজার মাইল দুর থেকে মেঘনার বয়ে আনা পলি দিয়ে সৃষ্ট। এ কারনে এখানে যা কিছু লাগানো হয় দ্রুত বেড়ে ওঠে। এই মাটির এমন টানÑএখানে যিনি আসেন, তিনি আর ফিরে যেতে চান না। তবে আসার আগে সবাই এমনটাই ভেবে থাকেন, নদী-নালা, খাল-বিলের শ্বাাপদ সংকুল এক জঙ্গলে দিন কয়েক কাটিয়েই ফিরবেন। তবে আসার পরে বরিশালের পানি পেটে পড়লে কেউ আর ফিরে যেতে চান না।
স্মরন করা যেতে পারে প্রায় দেড় দশক আগে ঝালকাঠির পুলিশ প্রধান তার গাড়ী পাঠিয়ে বরিশাল সার্কিট হাউজ থেকে ড্রাম ভরে খাবার পানি নিতেন। কেন নিতেন? কারন ওনার পেটে বরিশালের পানি পড়ার পর ঝালকাঠির পানি মুখে রুচতো না। এ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ অনেকেরই ভুলে যাবার কথা নয়। তো এই হচ্ছে বরিশাল। ইতিহাসÑঐতিহ্যে-শৌর্যে-বীর্যে এই প্রাচীন নগরীর ব্যাপ্তি ধারন করার মতো মেধা-মনণ খুব কম মানুষেরই আছে।
বরিশাল বিভাগ হয়েছে, মেট্রোপলিটন নগরী হয়েছেÑপরিবর্তনের ধারায় ভাসছে। তবে নগরের যিনি কোতোয়ালÑতাঁর খেয়াল খুশীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে এই নগরীর মানুষ। তাঁর আতংকে মুখে কুলুপ আঁটা মানুষেরা আমাকে বারবার ইশারায় ঈঙ্গিতে বলার চেষ্টা করেছেন, বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এই কোতোয়ালের কীর্তি কান্ডের কথা। তিনি এক তুঘলকী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চান। কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে তাঁকেই তিনি চৌদ্দ শিকের রূপকথা শোনাতে চান। তিনি ভুলে যান বরিশাল তাঁর নিজের বা পূর্ব পুরুষের জমিদারী নয়, তিনি ভুলে যান যাদের করের টাকায় তিনি নানান আরাম আয়েশ করেনÑতাদের কাছে জবাবদিহিতে তিনি বাধ্য। বরিশালের এই নগর কোতোয়ালের অধঃস্তনদের অনেকেই নানা অপকর্মে জড়িতÑকিন্তু কোতোয়াল তা দেখতে পাননা। আমাকে এক নগর বরকন্দাজ কোতোয়ালের ভুয়সী প্রশংসা করে বলছিলেন, জনাব বড়ই সহৃদয়বান পুরুষ। কর্মের সাথে কেউ অপ যুক্ত করিলেও তিনি পিচুটি পড়া চোখে কিছুই দেখেন না। তবে তাহার জন্য তনখার বিশেষ বরাদ্দ রাখিতে হয়।
বরিশালে দাগী আসামী-সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে বরকন্দাজদের আগ্রহ বড়ই কম। তারা সন্দেহভাজন  দেখিয়ে গ্রেপ্তার বানিজ্যে আগ্রহ বেশী। এই নগরীতে পবিত্র রমজান মাসেও চলেছে যাত্রার নামে দেহ বল্লরীর প্রদর্শনী। রমজানের পবিত্রতার কথা কোতোয়ালকে স্মরন করিয়ে দিয়েছিলেন ত্রিশ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শাহীন। এই স্মরন করিয়ে দেবার কয়েক দিন পরই মাদকসহ পুলিশ গ্রেপ্তার করে এই কাউন্সিলরকে। বোঝার আর কিছু কি বাকী থাকে? নগরীর উপকণ্ঠে এই যাত্রাÑজুয়া-দেহবল্লীর প্রদর্শনীর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন কেউ কেউ। যদিও তা বিশ্বাস করতে রুচিতে বাধে।
ইতিহাসে ইতোপূর্বে বরিশালে যতো কোতোয়াল এসেছেন তাদের খুব কম সংখ্যকের সাথেই এই নগরীর সামাজিক শক্তিগুলোর সাথে খারাপ সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে। কোতোয়াল বিতর্ক এমনই তৈরী করেছেন যে, বরিশালের সাংবাদিকদের অন্যতম প্রধান সংগঠন বরিশাল প্রেসক্লাব তাকে বয়কট করে চলেছে। এমনকি রমজানে তাঁর ইফতার পার্টিও সংবাদটিও প্রায় কেউ ছাপেনি। কেন সংবাদ কর্মীদের সাথে তাঁর এই বৈরীতা? কেননা তিনি কাউকে তোয়াক্কা করেন না। এক বেয়াদব বরকন্দাজের বিরুদ্ধে তাঁর কাছে বিচার চেয়েও বিমূখ হতে হয়েছে সংবাদ কর্মীদের।
আগে যে শহর তৃতীয় শ্রেনীর কোতোয়াল চালাতেনÑনগরীতে প্রস্তাবিত হওয়ায় এখন বিশেষ জাতীয় কোতোয়াল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বরিশালবাসী যে সেবা পাওয়ার কথা তার চেয়ে যাতনা বোধকরি বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে। কোতোয়াল যন্ত্রনা করতে, যাতনা দিতে বড়ই পারঙ্গম।
তিনি বরিশালের আইন শৃংখলার রক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশী ব্যাস্ত। তিনি নগরীর অভিজাত বরিশাল ক্লাবকে তাঁর ইচ্ছের গুটিতে পরিনত করতে চান। ইউরোপীয়ান ক্লাব নামে এ ক্লাবের সুচনা হয়েছিলো বরিশালে বসবাসকারী ইউরোপীয়ান জমিদার, কর্মকর্তা মিঃ ব্রাউন, মিঃ লুকাস, মিঃ প্যারারার মতো ব্যক্তিরা। পাকিস্তান আমলে এই ক্লাবের নাম বরিশাল ক্লাব করা হয়। ঢাকা ক্লাবের চেয়েও প্রাচীন এই বরিশাল ক্লাব। এই ক্লাবটি আরো সম্প্রসারিত হয় অকাল প্রয়াত বরিশালের সাবেক মেয়র, সংসদ সদস্য শওকত হোসেন হিরনের হাত ধরে। তিনি এই ক্লাবটিকে তার সেকেন্ড হোম বলে অভিহিত করতেন। আর দশটি সোস্যাল ক্লাবের মতো এই ক্লাবে রেস্তরা, রেস্ট হাউজ, কার্ড রুম, বার, বিলিয়ার্ড, অডিটোরিয়াম রয়েছে। ক্লাবের নিয়ামানুযায়ী নগর কোতোয়াল ছিলেন ইউজ মেম্বার। তিনি গায়ের জোরে কয়েকশো বছরের ইতিহাসে যা ঘটেনি ক্লাবে তাই করেছেন। ক্লাবকে জিম্মি করে তিনি সদস্যপদ নিয়েছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের অনেকেরই অভিযোগ। এখন তিনি এই ক্লাবের সভাপতি হতে চান। তাই তিনি কি করছেন? ক্লাবের সামনে একটি পুলিশী চৌকি বসিয়েছেন, কøাব থেকে কেউ বের হলে তাকে হেনস্থা করে বরকন্দাজরা। বরিশালে অন্তত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে কেউ ক্লাব রোডের মুখে কখনো পুলিশী চৌকি দেখেনি। বরিশাল নগরীতে প্রবেশÑবাহির, নদীপথে কোন চেক পোস্ট নেই। নগরীতে ধুমসে বিক্রি হয় মরণ নেশা ইয়াবা, হোরোইন, ফেন্সিডিল। তা বন্ধ করার বিষয়ে তার উৎসাহ কম। কোতোয়াল তাঁর বরকন্দাজদের নির্দেশনা দিয়েছেন বরিশাল ক্লাবের সদস্য ও তাঁদের পরিবারবর্গকে হযরানি করার। যদিও প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি টেনিস খেলেন, ইয়ার বন্ধুদের সাথে নিভৃতে সময় কাটান বরিশাল ক্লাবে।
লোকে বলে নগরীর দুষ্ট লোকদের সাথে তাঁর হৃদ্যতা বেশী। নলছিটির এক বিতর্কিত ব্যক্তি, যিনি নদী দখল করে বাড়ী নির্মান করেছেনÑথাকেন ঢাকায়। তিনি যেদিন বরিশালে পা  রাখেন, সেদিন কোতোয়ালের গাড়িটি তাঁর ব্যক্তিগত রক্ষীসহ উপস্থিত থাকে সাত সকালেÑবরিশাল লঞ্চঘাটে। ঐ গাড়ীতে চড়েই ব্যক্তিটি যান নলছিটি। এই ব্যক্তিকে এবং তার বরকন্দাজদের মালামাল সরবরাহকারী আরেক জনকে বরিশাল ক্লাবের সদস্য করতে চাপ সৃষ্টি করেছেন ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের ওপর।
শুরুতে ঝালকাঠির এক কোতোয়ালের কথা বলেছিলাম। যিনি বরিশাল থেকে পানি নিয়ে খেতেন। তো আমাদের এই নগর কোতোয়ালও তার এই পদ ও পদোন্নতির আগে ঐ জেলারই জেলা কোতোয়াল ছিলেন। দেশবাসীর মতো বরিশালবাসীও ভুলে যাননি নিরীহ কলেজ ছাত্র লিমনের কাহিনী। এই কোতোয়াল ঐ ঘটনা প্রবাহের সাথে জড়িত ছিলেন ভালভাবেই। সরকার এবং পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য তাঁর মতো কয়েক কোতোয়ালই যথেষ্ট। এমনকি বরিশালের প্রবীন রাজনৈতিক নেতা এবং ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম আমির হোসেন আমুকে যে ভাবে কোতোয়াল সাহেব হেনস্থা করেছেন তা আমির হোসেন আমু ভুলেছেন বলে মনে হয় না। এমনকি বরিশাল সদন আসনের সংসদ সদস্য প্রয়াত শওকত হোসেন হিরনের স্ত্রী জেবুন্নেছা আফরোজকে নিয়ে তাঁর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য অনেকেরই চোখ এড়ায় না।
সাহসী মানুষের শহর এই বরিশাল। বরিশালের প্রতীক মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত, চারন কবি মুকুন্দ দাস, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বরিশাল কি এভাবেই চলবে!